kalerkantho


অবাক মানুষ

সাইকেল এঞ্জেলো

কানাডার স্টিফেন লান্ড কিন্তু শিল্পী। তবে রংতুলিতে নয়, ছবি আঁকেন সাইকেল দিয়ে। আর তাঁর ক্যানভাস হলো একটা গোটা শহর। মিকেলেঞ্জেলোর সঙ্গে মিলিয়ে তাঁকে ভক্তরা ডাকে সাইকেল-এঞ্জেলো বলে। পাত্তা লাগিয়েছিলেন অন্টারিও প্রবাসী জুবায়ের হোসেন

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সাইকেল এঞ্জেলো

শুরুটা হয়েছিল স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে গিয়ে। নিয়মিত সাইকেল চালাতেন।

স্বাস্থ্যসচেতন স্টিফেন শুধু সাইকেলই চালাতেন না, হিসাব রাখতেন ঠিক কতটা পথ পাড়ি দিলেন, কত গতিতে চালালেন ইত্যাদি। তাই তাঁর সাইকেলের হাতলে লাগানো থাকত একটি জিপিএস যন্ত্র। স্যাটেলাইট থেকে তথ্য নিয়ে স্মার্ট এই যন্ত্র কোথায়, কিভাবে, পাহাড়ে না সমতলে—মানে সাইকেল চালানোর সব বিবরণ পুঙ্খানুপুঙ্খ ধরে রাখত। দিনশেষে যন্ত্রটির ধারণ করা তথ্য তিনি একটি ওয়েবসাইটে আপলোড করতেন। উদ্দেশ্য ছিল নিজের অবস্থান যাচাই করা। আর এই ওয়েবসাইটের একটি অনন্যবৈশিষ্ট্য তাঁর জীবন বদলে দিল। সাইটটি র্যাংকিং যেমন দেখাত, সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট রাস্তার ম্যাপ দাগ দিয়ে টেনে দেখিয়ে দিত। স্টিফেন দারুণ আনন্দ পেতেন ব্যাপারটিতে। ভাবলেন, যদি প্ল্যান করে সাইকেল চালানো যায় তবে ম্যাপের এই আপাত অর্থহীন আঁকিবুঁকি হয়ে উঠতে পারে দারুণ কোনো শিল্পকর্ম! যেই ভাবা সেই কাজ।

চোখের সামনে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার শহর ভিক্টোরিয়ার ম্যাপ খুলে বসলেন। কদিন পরেই ২০১৫ সালের প্রথম দিন। সাইকেলে চড়ে ম্যাপের গায়ে ইংরেজিতে বানান করে লিখলেন ‘শুভ ২০১৫’। কাঁচা হাতের (নাকি পায়ের?) কাজ। কিন্তু সে তো সবে শুরু।

শরীরচর্চার মতো আপাত রসকষবিহীন একটা কাজকে স্টিফেন আনন্দময় করে তুললেন। প্রতিদিন একই রাস্তায় একই রুটিনে সাইকেল চালানো বন্ধ হলো। শুরু করলেন নিত্যনতুন রাস্তা আবিষ্কার। শহরের অলিগলি চিনতে থাকলেন, আর সুন্দর চিত্রকর্ম তৈরি হতে থাকল। শুরুর দিকে তিনি একবার একটি জিরাফের ছবি এঁকে ফেললেন। প্রথম দেখায় সেটি নতুন আঁকতে শেখা কারুর শিশুসুলভ প্রয়াস মনে হবে। কিন্তু কিভাবে এঁকেছেন তা জানলে চরম খুঁতখুঁতে সমালোচকও প্রশংসায় ভাসিয়ে দিতে কার্পণ্য করেন না। জিরাফটার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ১১ কিলোমিটার! জিরাফের একটি চোখের আকার একটি পার্কের সমান। আর এই মাস্টারপিসটি তৈরি করতে স্টিফেনকে ভিক্টোরিয়ার রাস্তায় ১১৫ কিলোমিটার সাইকেল চালাতে হয়েছে। তিনি ছবি আঁকার এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেন জিপিএস ডুডলিং।

২০১৫ সাল শেষ হওয়ার আগেই ৭০টি ‘ডুডল’ এঁকে ফেললেন লান্ড। প্রতিটি ডুডল ওই জিরাফের মতোই, কোনো কোনোটি তার চেয়েও বেশি। তত দিনে তিনি ডুডলিংয়ের নেশায় বুঁদ। সাইকেল চালিয়ে পাড়ি দিয়েছেন ২০ হাজার কিলোমিটারের অবিশ্বাস্য লম্বা পথ। সোজাসুজি এতটা পথ গেলে তিনি যেতে পারতেন ভিক্টোরিয়া থেকে মিয়ামি, মিয়ামি থেকে প্যারিস, প্যারিস থেকে দুবাই ও দুবাই থেকে কাঠমাণ্ডু, অর্থাৎ অর্ধেকটা পৃথিবী! পথটা সব সময় সমতলও ছিল না। আর সময়? সব যোগ করে দেখা গেল প্রায় এক মাস দিন-রাত সাইকেলে প্যাডেল মেরে কাটিয়ে দিয়েছেন। এভাবে পেয়েছেন ৭০টি ডুডল। কিন্তু প্রতিটি যাত্রায় বেরোনোর আগে করে নিতে হতো নিপুণ পরিকল্পনা। চোখের সামনে শহরের একটা ম্যাপ খুলে বসতেন। কখন কোন রাস্তায় সাইকেল চালাবেন সেটা ম্যাপ দেখে টুকে নিতেন। অনেকটা আমরা মেঘ দেখে যেমন হাতি-ঘোড়া, দৈত্যদানোর আকৃতি কল্পনা করে নিই, ভিক্টোরিয়ার ম্যাপ খুলে বসলে ঠিক সে রকমটাই করতেন লান্ড। এভাবে তিনি আঁকলেন—তিমি মাছ, সাগরের দানো এমন আরো কত কী! তাঁর নিজের পছন্দের তালিকার শীর্ষে আছে ১৪ ঘণ্টা ধরে ২১২ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আঁকা জলকন্যা ‘দ্য মারমেইড’। এর একগাছি চুলের প্রতিটি যত্ন করে আঁকা।

লান্ডের নতুন ডুডলের জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকে পৃথিবীর ৬০টি দেশে তাঁর অনুসারীরা। তারা তাঁকে ভালোবেসে নাম দিয়েছে সাইকেলেঞ্জেলো। ভিক্টোরিয়া চষে বেড়িয়ে লান্ড গিয়েছেন অটোয়ায়। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রেরণা প্রতিদিন নতুন নতুন আবিষ্কারে, যাতে ব্যায়ামের মতো রোজকার গত্বাঁধা কাজও আনন্দময় হয়ে ওঠে।


মন্তব্য