kalerkantho


আ মরি বাংলা ভাষা

মায়ের ভাষায় মাকে লিখি

এ বছর লক্ষ্মীপুরের ২১টি স্কুলে ‘মায়ের ভাষায় মাকে লিখি’ চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন ফাহাদ বিন বেলায়েত। সবাইকে বাংলা ভাষায় আগ্রহী করে তুলতে গড়েছেন ‘ভাষার প্রদীপ’ সংঠগন। এই স্বপ্নবাজ তরুণের কাজের কথা জানাচ্ছেন সারোয়ার হোসাইন ও কাজল কায়েস

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মায়ের ভাষায় মাকে লিখি

ফাহাদ বিন বেলায়েত

‘প্রিয় মা, তুমি আমাকে বকা দেওয়ার পর আমি খুব মন খারাপ করেছিলাম। কিন্তু যখন আবার জড়িয়ে ধরে আদর করলে, সত্যি মা, তখন আমার সব রাগ ভুলে গেছি। মাগো, আমাকে তুমি মাফ করে দিয়ো। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। ’ চিঠিতে মায়ের প্রতি অনুভূতি প্রকাশ করেছে এক খুদে শিক্ষার্থী, যে চিঠি পড়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি মা। এভাবেই মায়ের প্রতি মায়ের ভাষা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভালোবাসার গল্প। তৈরি হচ্ছে বাংলা ভাষার সঙ্গে ভালোবাসা।

এ বছর লক্ষ্মীপুরের ২১টি বিদ্যালয়ের প্রায় এগারো শ ছাত্র ‘মায়ের ভাষায় মাকে লিখি’ চিঠি লেখা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এ রকম সুযোগ পেয়ে তারা বেশ আনন্দিত। শিক্ষকরাও সাদরে নিচ্ছেন মাতৃভাষা চর্চার এ কৌশল। প্রতিযোগিতার শুরুতে ছাত্রদের তাদের মায়েদের কাছে চিঠি লেখার আহ্বান জানানো হয়।

যে ভালোবাসার কথা সচরাচর মাকে বলা হয় না, তা-ই তারা লিখে প্রকাশ করে বাংলায়। প্রতিটি সন্তানই মাকে ভালোবাসে, কিন্তু মুখে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। বলতে পারে না ‘মা তোমাকে ভালোবাসি’। তাই চিঠিতেই তারা তাদের মনের অনুভূতি প্রকাশ করছে। সেখানে থাকছে মায়ের মমতা, আদর, ভালোবাসা, ভালোলাগার কথা। মায়ের ভাষায় ছোট ছোট শব্দে তারা প্রকাশ করছে অনুভূতি, প্রত্যশা-প্রাপ্তি ছোট ছোট সুখ-দুঃখের কথা।

এই প্রতিযোগিতার আয়োজক লক্ষ্মীপুরের বাঞ্জানগরের ফাহাদ বিন বেলায়েত। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছাত্রদের বিনা মূল্যে কাগজ, কলম, খাম দেওয়া হয়। এ আয়োজনে কোনো পৃষ্ঠপোষক নেই। ২০০৮ সাল থেকে চিঠি লেখা প্রতিযোগিতা শুরু করেন তিনি।

ফাহাদ বলেন, ‘প্রতিটি চিঠি সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে বই প্রকাশ করার ইচ্ছা আছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিঠি তাদের মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। চিঠিতে লেখাগুলো তারা তাদের মাকে কখনো প্রকাশ করতে পারেনি। এ এক অন্য রকম অনুভূতি। ’

পর্যায়ক্রমে সারা দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে চান ফাহাদ। পথশিশুদের নিয়েও কাজ করার ইচ্ছা আছে। তাঁর বিশ্বাস, একদিন এ দেশের সব মানুষ শুদ্ধ বাংলার চর্চা করবে, রক্ষা করবে বাংলার ঐতিহ্য।

২০০৫ সাল থেকে বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করে আসছেন ফাহাদ। সে বছর লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষার পর অবসর সময় যাচ্ছিল। তখন বাড়ির পাশে মেঘনা সড়কে খুলে বসে দেশ টেলিকম। গ্রাহকরা মোবাইল ফোনে রিচার্জ করতে এসে ইংরেজিতে নম্বর বলত। বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। সিদ্ধান্ত নেন, গ্রাহকদের মোবাইল ফোন নম্বর বাংলায় বলতে এবং লিখতে শেখাতে হবে। ‘বাংলা চর্চা করুন আর জিতে নিন নগদ পুরস্কার’ লিখে দোকানে ঝুলিয়ে দেন। ভিজিটিং কার্ডেও যোগ করেন বাক্যটি। মোবাইল ফোন নম্বরটি বাংলায় বললে রিচার্জে এক টাকা অতিরিক্ত পুরস্কার পাবেন গ্রাহক। কৌতূহলী হয়েই অনেকে বাংলায় বলার চেষ্টা চালায়। অল্প সময়ের মধ্যে বাংলা চর্চার সুফলও মেলে।

এরপর বিভিন্ন দোকান, পার্ক ও বিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষা চর্চার প্রতিযোগিতার আয়োজন করছেন ফাহাদ। পুরস্কার দেন বাংলার ঐতিহ্য মাটির বাসন, মাটির তৈরি খেলনা, কলম ও শিক্ষা-উপকরণ। তার চিন্তা, শুধু বাংলা ভাষাই নয়, বাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

বন্ধুদের নিয়ে ‘ভাষার প্রদীপ’ নামে একটি সংগঠন করেছেন। উদ্দেশ্য নিজ এলাকার মানুষকে বাংলা ভাষা চর্চায় আগ্রহী করে তোলা। সংগঠনটি প্রসারের ইচ্ছা আছে তাঁর।


মন্তব্য