kalerkantho

পা-মানুষ

স্বাভাবিক মানুষের শরীর সে পায়নি। হাত দুটি নেই বললেই চলে। লম্বায় তিন ফুটের বেশি হবে না। কিন্তু কী পারে না সে? কাটা-বাছা, রান্নাবান্না, ঝাড়া-মোছা, সেলাই, এমনকি লেখা-পড়াও। বেশ স্বচ্ছন্দ দুটি পা দিয়েই। বানু আক্তারকে দেখে এসেছেন মাসুম সায়ীদ

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পা-মানুষ

জন্মকথা

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছতনাই বালাপাড়া গ্রাম। আবদুল ছাত্তার ভিটেবাড়িসর্বস্ব এক দিনমজুর।

আশা আর স্বপ্ন ছিল বুকে। ছেলে হবে। তার মতোই হবে জোয়ান আর কর্মঠ। শক্ত হাতে হাল ধরবে। পাশে দাঁড়াবে বাবার। জন্ম হয়েছিল বানুর। একে তো মেয়ে। তার মধ্যে দুটি  অসম্পূর্ণ হাত। যেন কাঁধের নিচে বাম হাত ছয় ইঞ্চি আর ডান হাত চার ইঞ্চি রেখে কেটে নেওয়া হয়েছে বাকিটা। মেয়েটাকে দেখে দুঃখের অন্ত ছিল না আবদুল ছাত্তার আর মা মহিমা বেগমের। পরপর জন্ম নেয় আরো তিন বোন। বাবার দুঃখ ঘুচিয়ে একসময় ঘরে আসে একটি ভাইও।

 

অনাদরের শৈশব

আর দশটা মানুষের মতো নয় বলে অবজ্ঞা, অবহেলা আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কম সইতে হয়নি তাঁকে। সমবয়সীরা যখন দৌড়ায়, সে তখন দাঁড়াতেই পারে না। জড় পিণ্ডের মতো বসে থাকে এখানে-ওখানে। বয়সে তার চেয়ে ছোট বোনেরা উঠান, বাড়িঘর দাপিয়ে বেড়ায় তারই চোখের সামনে। নীরবে সে চেয়ে চেয়ে দেখে। দুঃখে হোক বা জেদে, একদিন মনের ভেতর জন্ম নেয় প্রবল ইচ্ছা—আমিও পারব।

 

প্রথম জয় উঠে দাঁড়ানো

ওই দুর্মর ইচ্ছাই তাকে এনে দেয় সাফল্য। ১০-১১ বছর বয়সে সে দাঁড়াতে শেখে। প্রথম প্রথম লাঠিতে ভর দিয়ে। তারপর লাঠি ছাড়াই। এরপর শুরু হয় একপা-দুপা করে হাঁটা। আর তাতেই বানু আক্তার যেন পেয়ে যায় গুপ্তধনের চাবি—‘ইচ্ছা থাকলে সব হয়। লাগে শুধু চেষ্টা। ’ আর নিরন্তর চেষ্টার এই শক্তি তাকে জুগিয়েছে মানুষের তাচ্ছিল্য—সে মানুষ নয়, প্রতিবন্ধী। হাঁটতে পারাটা তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। খেয়াল করতে শুরু করে স্বাভাবিক মানুষ কিভাবে সব কাজকর্ম করে। মনে মনে তাদের অনুসরণ করতে থাকে। আর চেষ্টা করতে থাকে পা জোড়া দিয়েই সব কাজ করার। চেয়েচিন্তে চলার মতো ভিখারির জীবন বেছে নেওয়ার চিন্তা মাথায় আনেনি। স্বাভাবিক না হলেও মায়ের প্রথম মেয়ে সে। ঘরের কাজে মায়ের সঙ্গে সঙ্গেই থাকে। একসময় শিখে যায় ঘর ঝাড়ু দেওয়া। শিখে ফেলে নিজের দরকারি কাজ। কাপড় পরা, গোসল, খাওয়াদাওয়া। বাম পায়ের তিন আঙুল দিয়ে ভাত মাছ-রুটি-তুলে নিতে শেখে মুখে। বাঁশের চিকন বেতি তুলে বুনতে পারে হাতপাখা। বিদ্যুৎ চলে গেলে পা দিয়ে ঘোরাতেও পারে। দক্ষতা যত বাড়ে তত বাড়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস। বড় হতে থাকে আশা। স্বপ্নের পরিধিও।

 

প্রথম লেখা নাম

পাড়াপড়শি মেয়েরা স্কুলে যায় দলবেঁধে। মাথায় ঝুঁটি। পরনে ফ্রক। হাতে বই, স্লেট। তাঁর মনেও স্বপ্ন জেগে ওঠে। বাবা বিশ্বাস করে না। মা ভরসা পায় না। এমন সময় পাশের বাড়িতে এক নতুন জামাই এলো বেড়াতে। পড়ালেখার স্বপ্নের কথা শুনে একটা স্লেট আর চক কিনে দিয়ে শর্ত জুড়ে দিল—একদিনে নাম লেখা শিখতে পারলে ভর্তি করিয়ে দেবেন স্কুলে। চ্যালেঞ্জটা খুশি মনেই গ্রহণ করল বানু। শিখে ফেলল নাম লেখা। একদিনেই। কথা রাখলেন নয়া জামাই। বানু পেয়ে গেল নতুন আলোর সন্ধান। স্কুল আঙিনার কাঙ্ক্ষিত পরশ। এই স্কুল আঙিনা তাকে শুধু জ্ঞানের জগতের সন্ধানই দেয়নি, জুটিয়ে দিয়েছে জীবন সঙ্গীও। সে গল্প আরেকটু পরে। স্কুল আর মাদ্রাসা—দুইয়ে মিলে ক্লাস টেন পর্যন্ত গড়িয়েছিল পড়ালেখা। তবে এসএসসি বা দাখিল বোর্ডের কোনো পরীক্ষায়ই আর বসার সুযোগ হয়নি তার।

 

মনের মানুষের সন্ধান

স্কুলে যাওয়া-আসার সময় গাঁয়ের পথে দেখা হতো আনেকের সঙ্গে। সঙ্গীও হতো অনেকে। তার মধ্যে পাশের গ্রামের খোরশেদ যেন একটু বেশি কাছের হয়ে ওঠে। তার শরীরেও একটু সমস্যা আছে। হাঁটুতে জোড় কম। হাঁটার সময় হাঁটু দুটি লেগে যায় একটার সঙ্গে আরেকটা। অন্যদের চেয়ে বানুকে সে একটু বেশিই বোঝে। শারীরিক অপূর্ণতার কারণেই হয়তো। তাই বাড়তে থাকে সহানুভূতি। পরস্পরের এই বোঝাপড়া রূপ নেয় ভালোলাগায়। আর ভালোলাগা থেকে হয়ে যায় ভালোবাসা।

 

টিকে থাকার সংগ্রাম

বাবার একটা শরীরের খাটুনি সংসারের খাইখরচই মেটাতে পারছিল না। বানুর লেখাপড়ার খরচ জোগানোর তো প্রশ্নই উঠছিল না। বানু নিজের লেখাপড়ার চিন্তা নয় ভাবছিল বাবার বড় সন্তান সে। সংসারে তারও একটা কর্তব্য আছে। সংসারের ঘানি টানতে বাবার সঙ্গে কাঁধ লাগানোর ভাবনা তাকে টেনে আনে রাজধানীতে। এসে ওঠে কোনাবাড়ির হরিণচালায়। ঘুরতে থাকে কাজের খোঁজে। কেউ বিশ্বাসই করে না, হাতবিহীন একটা মানুষ সব কাজ করতে পারে। কাজের খোঁজে একদিন এক ঝুট ব্যবসায়ীর গুদামে গিয়ে হাজির হয় সে। মালিক নিজেই ছিলেন গদিতে। বানু আরজি জানায় চাকরির। বানুকে দেখে মায়া হয় লোকটার। একটা ১০০ টাকার নোট বাড়িয়ে দেন। বানু টাকা নিতে অস্বীকার করে। তার স্পষ্ট জবাব—‘এই টাকায় আমি আজ খামু, কাইল খামু, পড়শু দিন কী খামু। আপনে আমারে কাজ দেন। আমি সব করতে পারি। ’  কাজ হয় বানুর এ কথায়।

‘ঠিক আছে, বাছ ঝুট—দেখি কেমন পারো। ’ বানু বসে যায় কাজে। বিশ্বাস হয় ঝুট ব্যবসায়ীর। চাকরি হয়ে যায় তার। কাজ সে অন্যদের চেয়ে কম করে না। তাই হাজিরা অন্যদের চেয়ে পাঁচ টাকা বেশি। চলতে থাকে দিন ভালোই। মালিকের আস্থাভাজন হয়ে যায় বানু কাজে ও কথায়। গুদামের চাবি এখন তার কাছেই থাকে। দুই বছর কেটে যায় চাকরিতে।

 

লুকিয়ে বিয়ে

সম্পর্কের কথা জানাজানি হয়ে যায় দুই পরিবারেই। বানুর মা-বাবা ভরসা পান না এ সম্পর্কে। ভাবাবেগের সম্পর্ক ভাঙতে কতক্ষণ? চান না দুঃখ পাক মেয়েটা মিছে স্বপ্ন দেখে। খোরশেদের পরিবারও আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়। তবু ছেলে বলে কথা। তাও আবার সরকারি কলেজের ছাত্র। মা-বাবার স্বপ্ন অনেক। ছেলে চাকরি করবে। তারপর ফুটফুটে একটি বউ আনবে ঘরে। কিন্তু খোরশেদ ভালোবাসাকে হারাতে দেয়নি। বাড়ি থেকে কাউকে কিছু না বলে সে চলে আসে ঢাকায়—মানে কোনাবাড়ি। তারপর সবার অমতে লুকিয়ে করে ফেলে বিয়ে। সে তখন নীলফামারী সরকারি কলেজের বিবিএর ছাত্র।

 

মা হওয়ার স্বপ্ন

বিয়ের পর বানু প্রায়ই ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখত—মা হবে সে। তার কোল আলো করে ফুটফুটে একটি ছেলে আসবে। সেই ছেলে বড় হয়ে তার সব দুঃখ দূর করে দেবে। সত্যি সত্যি সেই ছেলে একদিন ঘরে আসে, কোনো অসুবিধা আর জটিলতা ছাড়াই। স্বাভাবিক প্রসবে। তার আদরের দুলাল বিল্লাল হোসেনের বয়স এখন দুই বছরের ওপরে। মাদ্রাসায় পড়াবে ছেলেকে। আল্লাহর দান আল্লাহর পথেই থাকুক—এই তার ইচ্ছা।

 

কঠিন বাস্তব

স্বামী-সন্তান নিয়ে তার সুখের সংসার। ভালোবাসায় সুখ আছে। কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে খেতে হয়। তিনটি মুখ। দেশের বাড়িতে মা-বাবা ছাড়াও আছে ছোট দুটি ভাই-বোন। লেখাপড়া করে তারা। তাদেরও কিছু দিতে হয়। এরই মধ্যে ঝুট ব্যবসায় দেখা দেয় মন্দা। মালিক গুটিয়ে নেন ব্যবসা। বানুর চাকরিও চলে যায়। খুঁজতে থাকে নতুন চাকরি। এর মধ্যে সন্ধান মেলে প্রতিবন্ধী নারীদের সহায়তাকারী একটি বিদেশি সংস্থা এলসিডির। মোহাম্মদপুরে অফিস। চাকরির দরখাস্ত করে। তখন তারা তাকে পাঠিয়ে দেয় জিরানিতে। শহীদ শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব মহিলা প্রশিক্ষণ একাডেমিতে। প্রশিক্ষণের পর হবে চাকরি। গার্মেন্টের কাজের ওপর প্রশিক্ষণ। কোর্সের মেয়াদ তিন মাস। কোর্সটা শেষ করতে বানুর লেগে যায় চার মাস সময়। অত্যাধুনিক সেলাই মেশিন চালানো শেখেন বিশেষ ব্যবস্থায়। মেশিন একই। শুধু তার চেয়ারটা দরকার হয় টেবিলের চেয়ে দেড় ফুট উঁচু। হাতের কাজটা সে করে পায়ে। আর পায়ে যে লিভারটা চেপে মেশিন চালাতে হয় সেটা করে তার ছোট হাত দিয়ে। দরকার হয় একটা বড় লাঠির। প্রশিক্ষণের পরও চাকরি  জোটেনি তার। কোনো কম্পানি নিতে চায় না দায়। পায় না আস্থা।

 

রঙিন পুঁতিতে স্বপ্ন বোনা

মন তার অতিক্রম করেছে দেহের বাধা। শুরুতে তার কোনো শিক্ষক ছিল না। ছিল না কেউ প্রেরণা জোগানোরও। চোখের দৃষ্টি তার আসল গুরু। একবার যা দেখে, তা করার চেষ্টা করে যাওয়া তার স্বভাব। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সফল হয়। দর্জির দোকানে কাপড় বানাতে গিয়ে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দোকানি ভাবত কৌতূহল। কিন্তু বানুর জন্য ওটা ছিল প্রশিক্ষণের ক্লাস। এভাবেই শিখে ফেলে কাপড় বানানো, কাটা ও সেলাই। প্রশিক্ষণ একাডেমি থেকে তাকে পুরনো একটি হাতেচালিত সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে। নিজের সব কাপড় এখন নিজেই বানায়। আবার ফরমায়েশও নেয়। পুঁতি দিয়ে মালা, ব্যাগ, পার্স, চুলের ব্যান্ড, শোপিস বানানো শিখেছে দেখে দেখেই। সেটাই তার এখনকার জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। স্বামী এমকম শেষ করেও বেকার। শারীরিক সমস্যার কারণে তারও চাকরি হচ্ছে না কোথাও।

 

হয়েছেন প্রতারিত

 সহানুভূতি যেমন পেয়েছে, তেমনি হয়েছে প্রতারণার শিকারও। হারিয়েছে সর্বস্ব। ২০১০ সালে হানিফ সংকেতের ইত্যাদি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। সেই সুবাদে পেয়েছিল হাজার পঞ্চাশেক টাকা। বিশ্বাস করে এক ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিল টাকাটা। লাভ দূরে থাকুক, পুরো টাকাই আত্মসাৎ করেছে পার্টনার। অনেক চেষ্টা-তদবির করেও ফেরত পায়নি। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে দুটি সংস্থার সহায়তায় জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবসে প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছিল। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে একটি চাকরি দেওয়ার। বানুর ইচ্ছা ছিল নিজ জেলায় ফিরে যাওয়ার। প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশসহ তাকে পাঠানো হয় নীলফামারীর ডিসি বাহাদুর বরাবর। বিভিন্ন নিয়োগে প্রতিবন্ধী কোটা থাকলেও একটি চাকরি তার কাছে এখনো সোনার হরিণ—অধরা।

 

সহায়ও তিনি

স্বামী-সন্তান নিয়ে তাঁর নিজের জীবন-জীবিকা যখন অনিশ্চিত, তখনো ভোলেননি পরিবারের কথা। ছোট বোন অনার্স পড়ে। স্কুলে পড়ে ছোট ভাইটা। তাদের যত দূর পারেন সহায়তা করেন। মেজ বোনের স্বামী মারা গেছে দুর্ঘটনায়। দুর্বিপাকে পড়ে বোনটা চলে এসেছে বাপের বাড়ি একটা ছেলেসহ। বুড়ো বাপের ভার হালকা করতে বোনের ছেলেটাকে এনে রেখেছেন নিজের কাছে। গ্রামের অনেককে শিখিয়েছেন এটা-ওটা নানা কাজ।

 

কোনো আক্ষেপ নেই

মনে না পাওয়ার কষ্ট আছে অনেক, স্বাভাবিক একটা জীবন না পাওয়ার কষ্ট। নিজের ছেলেটাকে প্রাণভরে আদরও করতে পারেন না। পারেন না যত্ন-আদর করতে। বুকে জড়িয়ে ধরতে। তবু কোনো আক্ষেপ নেই তাঁর নিয়তির ওপর। জীবনটাকে তিনি মেনে নিয়েছেন, কিন্তু হার মানেননি।

ছবি: লেখক


মন্তব্য