kalerkantho


বাঙালির বিশ্বজয়

মিরাজের বেড়ে ওঠা

২০১৬ সালে সেরা অভিষিক্ত ক্রিকেটারের পুরস্কার পেলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। কেমন ছিল এই ক্রিকেটারের জীবনের শুরুটা। মিরাজের প্রথম কোচের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন গৌরাঙ্গ নন্দী

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মিরাজের বেড়ে ওঠা

মিরাজের তখন আট বছর। লিকলিকে গড়ন। পড়ে হাজী শরীয়ত উল্লাহ বিদ্যাপীঠে। পাশেই বি এল কলেজের মাঠ। ছেলেরা ক্রিকেট খেলে। মিরাজ দাঁড়িয়ে থাকে। বল কুড়োয়। একদিন একটি বল উঁচু দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। বাজপাখির মতো ছোঁ দিয়ে এক হাতে বলটিকে তালুবন্দি করে মিরাজ। দেখে সেখানকার কোচ আল মাহমুদের চোখ ছানাবড়া।   জানতে চান, ‘বাড়ি কোথায়?’ ছেলেটি ভয়ে কাঁচুমাচু।

তাকে অভয় দিয়ে বলেন, ‘তুমি প্র্যাকটিস করো। ’ 

কিন্তু কিভাবে প্র্যাকটিস করবে! জুতো নেই, গ্লাভস নেই। তবুও আল মাহমুদের কাছে মিরাজকে নিয়ে যায় তার একাডেমির শিক্ষার্থী রাসেল। মিরাজকে তিনি অনুশীলনে পাঠান। প্রথম দিনেই সে ভিন্ন ধরনের বোলিং-ব্যাটিং করে শিক্ষকের মন জয় করে নেয়। মাহমুদ বলেন, “তার বোলিং, ফিল্ডিং অ্যাকশন ছিল সবার থেকে আলাদা। ওই বয়সেই সে ‘কাঠের’ বল ধরার কৌশল আয়ত্ত করে আমাকে অবাক করে দেয়। প্র্যাকটিসের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ জুতা ও গ্লাভস একজনের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে তাকে দিই। সেই শুরু। ”

২০০৬ সালের দিকে কাশিপুর ক্রিকেট একাডেমিতে এভাবেই কোচ আল মাহমুদের সঙ্গে মিরাজের পরিচয়। সেই বয়সে আগ্রহ থাকলেও টেকনিক জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু মিরাজের টেকনিকটাও ছিল। তার বোলিং, ফিল্ডিং, ব্যাটিং দেখে ভবিষ্যতের এই নায়ককে ঠিকই চিনেছিল প্রশিক্ষকের জহুরি চোখ। যে কারণে আর্থিক সামর্থ্য না থাকার পরও মিরাজকে অনুশীলনের সুযোগ দিয়েছিলেন কাশিপুর ক্রিকেট একাডেমির এই প্রশিক্ষক। ’

কাশিপুর ক্রিকেট একাডেমির নিজস্ব মাঠ নেই। এখন তো একাডেমির ঘরটিও নেই। মালিক আচমকা অনেক অগ্রিম এবং বেশি ভাড়া দাবি করায় ঘরটি ছেড়ে দিতে হয়েছে। এখন আল মাহমুদের একটি দোকানঘরই একাডেমির ঠিকানা। একাডেমির অনুশীলন হয় খুলনা বি এল কলেজ মাঠে। আর ম্যাচ হয় ফুলতলা উপজেলা সদরের ডাবুর মাঠে।

আল মাহমুদ ক্রিকেটার তৈরির স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তোলেন ক্রিকেট একাডেমি। সঙ্গী পান শেখ খালিদ আহমদকে। ২০০৪ সালে গড়ে তোলেন কাশিপুর ক্রিকেট একাডেমি। একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর অনেক কথা শুনেছেন। প্রশ্ন উঠেছে তাঁর ক্যারিয়ার নিয়েও। আল মাহমুদ বলেন, ‘একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর খুব বেশি সাড়া পাইনি। আড়ালে অনেকে টিপ্পনীও কাটত। কিন্তু তাতে দমে যাইনি। ’ এই একাডেমিতে মুস্তাফিজুর রহমানও প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

অভাবের সংসার। মিরাজের বাবা চাইতেন না ছেলে খেলা চালিয়ে যাক। কারণ ক্রিকেট খেলায় পরিশ্রম বেশি। খেলার সরঞ্জামাদির দামও বেশি। এ কারণে মিরাজের অনুশীলন বাধা পড়ে। খেলা প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল। মাহমুদই মিরাজের বাবাকে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছেন।

ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজের বাবা জালাল হোসেন। জালাল হোসেনরা দুই ভাই। জন্ম বরিশালের বাকেরগঞ্জের আউলিয়াপুর গ্রামে। জমিজমা আছে সামান্য। কাজের সন্ধানে জালাল হোসেন চলে আসেন খুলনার খালিশপুর। সময়টি ১৯৮৭-৮৮ সাল হবে। এলাকার পরিচিতজনের সহায়তায় ড্রাইভারি শেখেন। শুরু করেন রেন্ট-এ-কারে মাইক্রোবাস চালনা। দুই হাজার সালের দিকে নিয়ে আসেন স্ত্রী ও তাঁর দুই সন্তান মিরাজ ও মিম্মাকে। জালাল হোসেনের স্বপ্ন ছিল, ছেলে-মেয়ে দুটি বড় হবে, পড়াশোনা করবে, মানুষের মতো মানুষ হবে, দুঃখ ঘুচবে। মিরাজকে ভর্তি করিয়ে দেন কাশিপুর স্কুলে। ওই স্কুলেই বন্ধুদের সঙ্গে বল নিয়ে ছোটাছুটি করে মিরাজ। লেখা-পড়ার চেয়েও ক্রিকেটে আসক্তি বেশি। জালাল হোসেনের মনে দুশ্চিন্তা ভর করতে থাকে। তিনি শুনেছেন, ক্রিকেট খেলায় অনেক টাকা লাগে। আর যদি কোনো সময় হাত-পা ভেঙে যায়, তাহলে তিনি কী করে চিকিৎসা করাবেন! ছেলেকে তিনি ভয়-ভীতি দেখাতে থাকেন, দু-এক দিন হাত-পা বেঁধে মেরেছেনও। মা মিনারা বেগম ছেলেকে আগলে রাখার চেষ্টা করেন।

মাহমুদ মিরাজের মা-বাবাকে বোঝান, ‘ছেলেটি ক্রিকেট বোঝে, খেলেও ভালো। এই ছেলে একদিন নাম করবে। ভালো খেলোয়াড় হবে। আপনারা ওকে বাধা দেবেন না। প্যাড, ব্যাট, গ্লাভস, জুতা—যা লাগে আমরাই দেব। ’ এভাবেই চলে মিরাজের অনুশীলন। নানা জনের প্রশংসা ও আশার বাণীতে জালাল হোসেনেরও মনটা নরম হয়। ছোট বোন মিম্মা তখন ক্রিকেটের খোঁজ-খবর রাখে। সেও মা-বাবাকে বলে, ভাইয়া ক্রিকেট ভালো খেলে, তাকে খেলতে দাও। একসময় জালাল হোসেন ক্রিকেটপাগল ছেলেটিকে আর বাধা দেননি। কাশিপুর ক্রিকেট একাডেমিতে শুরু হয় মিরাজের প্রশিক্ষণ। তারপর বয়সভিত্তিক খেলায় অংশগ্রহণ। বয়সভিত্তিক খেলায় তার মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে সে পৌঁছে যায় অনূর্ধ্ব ১৪ ও ১৯ দলে। এসব দলে তার সাফল্য ঈর্ষণীয়। নেতৃত্বও দেয়। এর পরই সে সুযোগ পায় জাতীয় দলে। তাও টেস্ট ম্যাচে। টেস্টে তার স্বপ্নের মতো অভিষেক। বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজের চট্টগ্রাম টেস্টে ৭ উইকেট আর ঢাকা টেস্টে ১২ উইকেট নিয়ে সিরিজ সেরা। ক্রিকেট দুনিয়ায় নতুন চমক।


মন্তব্য