kalerkantho


এগিয়ে যাও বাংলাদেশ

ওরা আর বনের গাছ কাটে না

আগে কাঠ কেটে বন উজাড় করত, প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন তারা স্বাবলম্বী। কক্সবাজারের মেদাকচ্ছপিয়ার সেসব মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন ছোটনকান্তি নাথ

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ওরা আর বনের গাছ কাটে না

জয়গুন নাহার, লায়লা বেগম, ওমর আলী, জামাল হোসেন, হোছাইন মামুনসহ আরো অনেকে কয়েক বছর আগেও জীবিকা নির্বাহ করত বনের গাছ কেটে, লাকড়ি সংগ্রহ করে। বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পেটের দায়ে এগুলো করতে হতো।

এ নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে হামলা-মামলায় জড়িয়ে অনেক হয়রানিও হতে হয়েছে। আর দিন দিন বৃক্ষশূন্য হয়ে যাচ্ছিল কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের মেদাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের সংরক্ষিত বন।

এখন সেই দৃশ্য বদলেছে। জয়গুনদের অনেকেই অনিশ্চিত সেই পেশা ছেড়ে হস্তশিল্পের কাজ করছেন। খেলনা পুতুল, টুপি, কাপড় সেলাই, ঝুড়ি তৈরি, সবজি চাষ, স্ট্রবেরী ও ড্রাগন ফল, ক্যাপসিকাম চাষ, হাস-মুরগি পালন, উন্নত চুলা তৈরি, কম্পোস্ট সার তৈরি, নার্সারি, ফলের বাগান করে এখন স্বাবলম্বী।

জয়গুন নাহার বলেন, ‘২০ বছর আগে আমার স্বামী মারা যান। ঘরে ছিল তিন ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামী মারা যাওয়ার পর পরিবার চালানোর জন্য ন্যাশনাল পার্ক ও আশপাশের বনের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এভাবে ১৮ বছর ধরে বনের গাছ কেটে ও লাকড়ি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহী করে আসছিলাম।

বন বিভাগের হামলা ও মামলার ভয়ে প্রতিনিয়ত দৌড়ের ওপর থাকতে হতো। তবে আমার মতো বনের ওপর নির্ভরশীলদের সে অবস্থা পাল্টে গেছে। দুই বছর আগে থেকে ক্রেলের (ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেম অ্যান্ড লাইভিহুড) কাছ থেকে নানা ধরনের সহায়তা, প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন নিজের হস্তশিল্পের কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। সন্তানদেরও যতটুকু পারছি পড়ালেখা করাচ্ছি। মাসে আয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। এতেই ভালো আছি। এখন আর হামলা-মামলার টেনশন আমাকে তাড়া করে না। ’

মেদাকচ্ছপিয়ার লায়লা বেগম শোনালেন একই কাহিনী—‘দুই ছেলে এক মেয়েকে ফেলে আমার স্বামী আক্তার হোসেন আরেকটি বিয়ে করে চট্টগ্রাম শহরে চলে যান। এর পর বনের গাছ কেটে সংসার চালাতে হতো। তবে এখন আর বনের গাছ কাটতে হচ্ছে না। ক্রেল প্রকল্পের মাধ্যমে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন ঘরে বসেই প্রতি সপ্তাহে আয় করছি ৮০০ থেকে ১২৭০ টাকা। ’

ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হাসেরদিঘি দক্ষিণ সাইরাখালীর হোছাইন মামুন বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন কম্পোস্ট সার উৎপাদন করছি। প্রতি কেজি ৩০ টাকা। প্রতিদিন পাঁচ-ছয় কেজি ক্রেতারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন সবজি, ফলদ ও বনের গাছের গোড়ায় ব্যবহারের জন্য। পাশাপাশি বিভিন্ন সবজিরও আবাদ করছি আমি। বনের দিকে আর তাকাতে হয়নি। ’

লামার ফাঁসিয়াখালীর এলাকার বাসিন্দা ওমর আলী এখন ড্রাগন ফলের চাষ করেন। গত দুই বছর এই ফল চাষ করে লাভবান হয়েছেন। জানালেন বাগান থেকে ফল তোলার আগেই অনেকে অর্ডার দিয়ে রাখে। গত দুই বছরে কম করে হলেও দুই লাখ টাকা আয় করেছেন এই ফল চাষ করে। তাই আগের মতো বনের গাছ কেটে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে না।

ক্রেল প্রকল্পের চকরিয়ার সাইট অফিসার আবদুল কাইয়ুম জানালেন, ‘কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী ও খুটাখালীর মেদাকচ্ছপিয়ার পৃথক জাতীয় উদ্যান এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ কেটে কয়েক হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত। প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন তারা স্বাবলম্বী। প্রায় তিন হাজার ৫০০ পরিবার এখন বনের গাছ কাটা তো দূরের কথা, তারাই এখন বন রক্ষায় কাজ করছে। ’


মন্তব্য