kalerkantho


জয় বাংলা

জল্লাদখানা পাহাড়ের খোঁজে

জল্লাদখানা পাহাড়ের নাম শুনলেই আঁতকে ওঠে চট্টগ্রামের মানুষ। একাত্তরে সেখানে ১০ হাজারের বেশি বাঙালিকে জবাই করে হত্যা করা হয়। সেই পাহাড়ের খোঁজে বেরিয়েছিলেন বিদ্যুৎ দেব

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জল্লাদখানা পাহাড়ের খোঁজে

জল্লাদখানায় গড়ে উঠেছে স্মৃতিস্তম্ভ। ছবি: জামাল জাফরান

জিইসি মোড় হয়ে পশ্চিমে এ কে খানের দিকে পিচঢালা আঁকাবাঁকা পথ। টেম্পুর যাতায়াত বেশি।

যাওয়া-আসায় পথে গাড়ি থেকেই নজর পড়ে। রাস্তার উত্তর ঘেঁষা স্মৃতিস্তম্ভ। চারদিকে ঘের দেওয়া লাল রং দেয়ালের গায়ে সাদা রঙে লেখা ‘বধভূমি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম। ’ এটাই কি সেই বধ্যভূমি? কিন্তু পাহাড় কোথায়? জেনেছিলাম এখানে পাহাড় ছিল। এখন পুরোপুরি লোকালয় হয়ে গেছে। আশপাশে দালান। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, এটাই সেই জবাইখানা বা জল্লাদখানা। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানি সেনা এবং বিহারিরা মিলে ১০ হাজারের বেশি বাঙালিকে জবাই করে হত্যা করেছে। হত্যার আগে তাদের দিয়েই কবর খোঁড়ানো হতো। মৃত বা অর্ধমৃত সবাইকে মাটিচাপা দেওয়া হতো। হত্যার বিভিন্ন ধরন ছিল। গুলি করে, ছুরি দিয়ে কেটে লবণ-মরিচ ছিটিয়ে নির্যাতন করে মারা হতো। যারা হত্যার কাজ করত তাদের বিভিন্ন রকমের পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। জবাই করে হত্যার জন্য ২০ টাকা, গুলি করে হত্যায় ১০ টাকা ও লবণ-মরিচ ছিটানো ২৫ টাকা হারে দেওয়া হতো।

স্বাধীনতার পর পাহাড়তলীর এই বধ্যভূমির শুধু একটি গর্তেই পাওয়া যায় এগারো শর বেশি খুলি। ডা. মাহফুজুর রহমান ‘বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ বইটিতে ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর চট্টগ্রাম পাহাড়তলী এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল গোফরানের সাক্ষ্য নেন, ‘দেখলাম অগণিত মৃতদেহ। চক্ষুস্থির হয়ে গেল। সংযত হলাম, ভালো করে দেখলাম এবার। দেখলাম সব লাশ মেয়েদের। উলঙ্গ। অধিকাংশ যুবতী এবং দুই-তিন দিন আগের মৃত দেহ মনে হলো। নজর করে দেখলাম যে অধিকাংশ মৃত নারীর পেটে সন্তান। মৃতদেহগুলো একেক স্তূপে ১০-১৫ জন করে রাখা হয়েছে। এভাবে পাহাড়ের ওপর বিভিন্নভাবে অনেক স্তূপ করে রাখা হয়েছে। আমার সঙ্গী একজন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। আমি কোনো রকমে সংজ্ঞা রেখে একে একে সব মৃতদেহ গুনে দেখলাম এক হাজার বিরাশিটি হতভাগ্য যুবতীর মৃতদেহ। এ অর্ধগলিত লাশগুলো দেখে মনে হলো অধিকাংশের পেটে ছুরি দ্বারা আড়াআড়িভাবে আঘাত করে বধ করা হয়েছে। ’ 

আবদুল গোফরানের ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও প্রজম্ম ৭১-এর সভাপতি ড. গাজী সালেহ উদ্দিন বলেন, ‘হ্যাঁ, গোফরান নিজের চোখে সব কিছু দেখেন। সে সময় তার গায়ে ছিল হলুদ জামা। ’

শুধু চট্টগ্রামেই ৬১টি বধ্যভূমি শনাক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও করুণ ঘটনাবহুল ফয়’স লেকের পাহাড়তলী বধ্যভূমি। এখানে কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল তা নিয়ে ভিন্ন মত আছে। ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, গণহত্যার সঠিক হিসাব দেওয়া অনেক জটিল। তবে পাহাড়তলী বধ্যভূমিতে ৯ মাসই বাঙালিদের হত্যা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান মাকসুদের মতে, ১৯৭১-এর এপ্রিল হতে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বধ্যভূমিতে হত্যার সংখ্যা ২০ হাজারের মতো। প্রতক্ষ্যদর্শীদের মতে ১০ হাজারের মতো। ড. গাজী সালেহ উদ্দিন তো বলেছেন শুধু ১০ নভেম্বরই হত্যা করা হয় অন্তত ৫ হাজার বাঙালি।


মন্তব্য