kalerkantho


মনে পড়ে

জাদুর বাক্স

দিনবদলে কত কিছুই না গেছে, আর কিছু যাচ্ছে। এর একটি যেমন, বায়স্কোপ। বায়স্কোপ বললেই কত রংবেরঙের ছবি চোখে ভেসে ওঠে। জাদুর বাক্স বলেও ডাকত লোকে। লিখেছেন মাসুম সায়ীদ

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০




জাদুর

বাক্স

তখন মানুষের বিনোদন বলতে ওই যাত্রা-সার্কাস। শীতের সময় দশ গ্রামের মধ্যে একটা কোনো বড় বজারের ধারে প্যান্ডেল পড়ত কয়েক দিনের জন্য।

সবার অবশ্য প্রবেশাধিকার ছিল না। ছোটরা তো নয়ই, বড়দেরও সবার অনুমতি ছিল না যাত্রা দেখার।

একটা জিনিসে সবার অধিকার ছিল। সেটি একটি লাল বাক্স। গামছা মাথায় আর হাতে করতাল নিয়ে অদ্ভুত একটা লোক হাজির হতো। তার গলা ভাঙা, কিন্তু বেশ সুরেলা। এসব মিলিয়ে বায়স্কোপ। বাক্সের সামনেও দুই পাশে চোঙার মতো কয়েকটি মুখ। প্রতিটি মুখে লাগানো থাকে উত্তল লেন্স।

আর বাক্সের ভেতর একপ্রস্ত কাপড়ে লাগানো থাকে ছবি। কাপড়টা পেঁচানো থাকে পাশের দুটি কাঠিতে। কাঠির ওপরের মাথায় বাক্সের বাইরে লাগানো থাকে একটা হ্যান্ডেল। এই হ্যান্ডেল ঘোরালে ছবিসহ কাপড়টা একপাশ থেকে গিয়ে আরেক পাশে পেঁচাতে থাকে। তখন চোঙায় চোখ লাগিয়ে দেখা যায় ছবিগুলো। লেন্সের সুবাদে ছবিগুলো দেখায় স্পষ্ট বড় আর বেশ কাছে। ছবির সঙ্গে সঙ্গে করতাল বাজিয়ে সুরে সুরে দেওয়া হয় ধারাবর্ণনা। এভাবে একবার বাঁ থেকে ডানে, ডান থেকে বাঁয়ে। প্রদর্শনীর পর মুড়ির টিনের মতো মুখা দিয়ে আটকে রাখা হয় মুখ।

 

গোড়ার কথা

অভিধানে বায়স্কোপ শব্দের অর্থ চলচ্চিত্র, ছায়াছবি, সিনেমা বলা হলেও আমাদের দেশে বায়স্কোপ নামে যা প্রচলিত তার যাত্রা শুরু হয়েছিল আধুনিক সিনেমা বা চলচ্চিত্রেরও বেশ আগে। ফটো তোলার জন্য সেলুলয়েড ফিল্ম আবিষ্কারের পর চলমান বস্তু বা ব্যক্তির ছবি হুবহু তোলা সম্ভব হলো। তখন কতগুলো ছবি একটি ড্রামের ভেতর পর পর লাগিয়ে ড্রামটি ঘোরানো হতো আর ড্রামের একদিকে রাখা হতো দেখার ব্যবস্থা। এভাবেই চল হয় বায়স্কোপের। আর এভাবেই ড্রাম থেকে আসে প্রজেক্টর আর পর্দা। ছবিগুলোর স্থান হয় প্রেক্ষাগৃহের বাক্স থেকে রুপালি পর্দায়। তারপর একদিন নির্বাক সবাক হয়। সাদাকালোর যুগ পেরিয়ে আসে রঙিন চলচ্চিত্র। সেদিক থেকে সিনেমা হলো বায়স্কোপের উত্তরসূরি।

 

বাংলাদেশে বায়স্কোপ

বাংলায় বায়স্কোপ দেখানো শুরু হয় ১৮৯৬ সালে। উদ্যোক্তা ছিলেন বিদেশি। নাম স্টিফেন্স। একটি থিয়েটার দলের সঙ্গে এসেছিলেন কলকাতায়। তখন তিনিই কলকাতায় প্রথম দেখিয়ে যান বায়স্কোপ। তাঁর অনুপ্রেরণায় মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন ১৮৯৮ সালে এ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভাবে বায়স্কোপ বা টকি—গাঁয়ের লোকেরা বলত টগি—দেখানো শুরু করেন। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।

 

কাহিনি

প্রথম প্রথম বড় আকারের ফটোগ্রাফ বা হাতে আঁকা ছবি ব্যবহার হতো। আর চলত জারিগানের সুরে সুরে ধারাবিবরণী, সঙ্গে করতালের তাল। আগে থাকত ক্ষুদিরামের ফাঁসি, বেদের মেয়ে জোসনা, আগ্রার তাজমহল, মক্কা-মদিনার ছবি, কারবালাপ্রান্তরের যুদ্ধ, তীরবিদ্ধ রক্তাক্ত দুলদুল ঘোড়া, কাজী নজরুল ইসলাম ইত্যাদি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে ছবির বিষয়ে। এরপর যোগ হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী, জিয়াউর রহমান, সাদ্দাম-বুশের যুদ্ধ। মক্কা-মদিনা, তাজমহল, মুজিব, ইন্দিরা গান্ধী এখনো আছে। সব সময় থাকে সমকালের ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধানের ছবি। এ জিনিসটা রাখতেই হয়। লেখাপড়া না জানলেও কী দেখাতে হবে, এটা খুব ভালোই বুঝতেন বায়স্কোপওয়ালারা।

 

কী চমৎকার দেখা গেল!

‘কী চমৎকার দেখা গেল; আরো কিছু রইয়া গেল; তারা জ্যোতি চইলা গেছে; দেখতে কত বাহার আছে, এইবারেতে দেখেন ভালো, আপন রাজা সামনে আছে। তীর-ধনুক হাতে আছে। কত সৈন্য শহীদ হলো; পরিস্থানের পরি আছে; দেখতে কত বাহার আছে; ডানে বামে নজর করো; মদিনারই শহর আছে, নবী সাহেবের পাগড়ি আছে, নবী সাহেবের লাঠি আছে, আরবি দিয়ে লেখা আছে; এইবারেতে দেখেন ভালো মক্কা শরিফ সামনে আছে, কত হাজি হজ করিতে দেশের থেকে রওনা দেছে;’ আরও আছে দার্জিলিংয়ের পাহাড়, সুন্দরবনের বাঘ-ভাল্লুক। বাস্তবে সুন্দরবনে ভাল্লুক না থাকলেও গল্পকথায় বাঘের সঙ্গে ভাল্লুক থাকবেই। অবশেষে ‘কী চমৎকার দেখা গেল; তারা জ্যোতি চইলা গেল; অন্ধকার পইড়া রইল। ’ থামলেন আব্দুল জলিল। সোনারগাঁয়ের লোকশিল্প জাদুঘরের ময়দানে বার্ষিক মেলার শেষ দিন আজ।

 

স্মৃতি আর কৌতূহলে

বায়স্কোপ আর খুব ভালো চলে না এখন। টুকটাক দর্শক আসে। তাও বিনোদনের জন্য নয়, ছোটরা কৌতূহলে আর বড়রা স্মৃতির টানে। করতালের তালে তালে ‘কী সুন্দুর দেখা গেল’—ভাঙা কণ্ঠের এই শ্লোক যেন তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্বপ্নময় ধূসর শৈশবে। কোন বটতলায় দাঁড় করিয়ে দেয় মেলার লোকারণ্যে খাবি খাওয়া এক কিশোরের মুখোমুখি কাউকে কাউকে। মেলায় ঘুরতে আসা বয়সী লোকেরা তাই তিন প্রজন্ম সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে চোখ রাখে বায়স্কোপের চোঙায়। ছোটরা এই সুযোগে মিলিয়ে নেয় বড়দের মুখে শোনা কথা।   

 

শেষ সৈনিক

রাজশাহীর বাঘমারা থানার চায়ের শারা গ্রাম থেকে প্রতিবছর মেলা উপলক্ষে সোনারগাঁয়ে আসেন আব্দুল জলিল। শুধু সোনারগাঁয়েই নয়, গোটা উত্তরবঙ্গ ঘোরেন বায়স্কোপ নিয়ে। যান সিলেটেও। মাজার প্রাঙ্গণে যে মেলা বসে, তাতে তার ডাক পড়ে। বায়স্কোপ নিয়ে আর কেউ আসে না। তাতেই বোঝা যায়, এ ধারার শেষ যোদ্ধা সে-ই। একচ্ছত্র, একমাত্র আর শেষ সৈনিক তিনিই। আগে তাঁদের গাঁয়ের আরো অনেকে ছিল এই পেশায়। সবাই ছেড়ে দিয়েছে। শুধু আব্দুল জলিল ধরে রেখেছেন বাপ-দাদার স্মৃতি। কিছুটা প্রয়োজন আর খানিকটা অবচেতন মনের ভালো লাগা থেকে। অল্প-বিস্তর যা জমিজিরাত আছে, তাতে তাঁর চলতে চায় না। তাই বাড়তি আয়ের আশায় বাক্স মাথায় ঘুরে বেড়ান গ্রামে গ্রামে। আনন্দ দেন নগদ টাকা বা চালের বিনিময়ে। তাঁর পরে এই কাজ করার মতো আর কেউ নেই। এক মেয়ে এক ছেলে জলিলের। মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেটা স্কুলে পড়ে। তিনি নিজেই চান না ছেলে এ পেশায় আসুক। প্রায় এক মণ ওজনের এই বাক্স নিয়ে দিনভর ঘোরেন পথে পথে। তাঁর স্বপ্ন—ছেলে লেখাপড়া শিখে চাকরি করবে। ছবি : লেখক

 


মন্তব্য