kalerkantho


এগিয়ে যাও বাংলাদেশ

পেডেল চেপে স্বপ্নের পথে

এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে শরিফুল। অর্থাভাবে একবার পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছিল। এখন দিনভর রিকশা চালায়, রাতে বই নিয়ে বসে। স্বপ্ন ব্যারিস্টার হওয়া। শরিফুলের জীবনযুদ্ধের গল্প শুনতে গিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম ও পিন্টু রঞ্জন অর্ক

বিনোদন ডেস্ক   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০




পেডেল চেপে স্বপ্নের পথে

ছবি : এল রহমান

নুন আনতে পান্তা ফুরাত

 

নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা ছিল শরিফুলদের। টানাটানির সংসার।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা কোরবান আলী দিনমজুর। সারা দিন গায়েগতরে খেটে যা পেতেন, তা দিয়েই টেনেটুনে চলে যেত। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটত একেকটা বেলা। তিন ভাই, এক বোন। সবার বড় শরিফুল ইসলাম। পাঁচ-পাঁচটা পেটের অন্নের জোগান দেওয়া আর সন্তানদের পড়ালেখার খরচ—কোরবান আলী যেন আর পেরে উঠছিলেন না। শরিফুল তখন চৈরগাতি ভদ্রারঘাট আইডিয়াল হাই স্কুলে পড়ে ক্লাস এইটে। একদিন বাবা বললেন, ‘আমার যতটুকু সাধ্য ছিল, করেছি। এবার নিজের রাস্তা দেখো। ’ আপাতত পড়াশোনায় যতি টানতে হলো।

 

নিজের রাস্তা দেখতে ঢাকায়

২০১০ সাল। শরিফুলের মামা আবদুস সাত্তার ঢাকায় রিকশা চালাতেন। সেবার ঈদে বাড়ি গেলে মামার হাত ধরেন শরিফুল। ‘নিজের রাস্তা দেখা’র জন্য কামরাঙ্গীরচরে এলেন। একটা রিকশা গ্যারেজের পেছনে ঠাঁই হলো। মামা শিখিয়ে দিলেন পেডেল  মারার কলাকৌশল। প্রথম প্রথম কামরাঙ্গীরচরেই চালাতেন। দিনে দুই-আড়াই শ টাকা রোজগার হতো। রিকশার মালিককে ৭০ টাকা ভাড়া দিতে হতো। বাকি টাকায় উদরপূর্তি। কিছু বাড়িতেও পাঠাতেন। এভাবেই চলছিল। তত দিনে ঢাকার অলিগলি চেনা হয়ে গেছে শরিফুলের।

একদিন ভাড়া নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এলেন। এখানে এসে চোখে যেন আলো ফুটল। সবাই পড়াশোনা করছে। আড্ডা দিচ্ছে। কেমন প্রাণোচ্ছল জীবন। আহা, আমি যদি এখানে পড়তে পারতাম! সব কিছু দেখে পড়াশোনার সাধ জাগে মনে। কিন্তু পেটের খোরাকটা তো আগে চাই। কাউকে কিছু বলতেও পারে না। কেবল চেয়ে চেয়ে দেখা! এরপর থেকে প্রতিদিন সকালে রিকশা নিয়ে কামরাঙ্গীরচর থেকে সোজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চলে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনভর রিকশা চালান। সন্ধ্যায় আবার কামরাঙ্গীরচরে ফিরে যান।

 

ভাই, আমি ব্যারিস্টার হইবার চাই

একদিন শরিফুলের যাত্রী হন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রুবায়েত ইসলাম রবিন। গন্তব্য কলাভবন থেকে কলাবাগান। ভাড়া ৪০ টাকা। যেতে যেতে শরিফুলের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেন তিনি। ‘বাড়ি কোথায়? ঢাকায় কেন? পড়াশোনা কতদূর’—ইত্যাদি প্রশ্ন করেন। সুযোগ পেয়ে মনের কথাটা বলে ফেলে শরিফুল—‘ভাই, আমি তো ব্যারিস্টার হইবার চাই। ’ শুনে রবিন বললেন, ‘ব্যারিস্টার হওয়া তো মুখের কথা না যে কইলাম আর হয়ে গেলাম। পড়াশোনা করতে হবে। বুঝলা? একটা কাজ করো, তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আবার ভর্তি হও। পড়াশোনা শুরু করো। কোনো সমস্যা নাই। আমরা তো আছি। ’ শরিফুল যেন অভয় পেলেন।

২০১৩ সাল। বাড়ি ফিরে যান শরিফুল। ‘আবার ভর্তি হইব কইলে শুরুতে কেউ পাত্তা দিতে চায়নি। বলে—খাবি কী?’ কিন্তু শরিফুল নাছোড়বান্দা। আগের স্কুলেই নবম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন। এলাকায়ও ক্লাসের পর রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কিন্তু যা পেতেন তা দিয়ে নিজের চলাই দায় হয়ে পড়ত। সমস্যাটা স্যারদের বুঝিয়ে বললেন। স্যাররা বললেন, ঠিক আছে, তোমাকে নিয়মিত ক্লাস করা লাগবে না। পড়াশোনাটা ঠিক রেখো। পরীক্ষার সময় এসে পরীক্ষা দিয়ে যেয়ো। মাস চারেক পর আবার ঢাকায় চলে এলেন। তবে এবার নতুন সঙ্গী বইপত্র। এর মধ্যে টেস্ট পরীক্ষা চলে এলো। ইংরেজিতে একটু কাঁচা ছিলেন। সন্ধ্যায় প্রাইভেট পড়তেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসমাইল সজীবের কাছে। সজীব কোনো টাকা নিতেন না। বইপত্র দরকার হলে কিনে দিতেন।

২০১৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন। সেবার জিপিএ ৫-এর মধ্যে ৪ দশমিক ১৪ পান। এরপর কোথায় ভর্তি হবেন। শরিফুল বললেন, ‘কম্পিউটারটম্পিউটারও বুঝি না। কী করি! সজীব ভাইকে সব বললাম। ’ শরিফুলের হয়ে অনলাইনে আবেদন করেন সজীব। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হন শরিফুল। রিকশা চালিয়ে ১২ হাজার টাকার মতো জমা করতে পেরেছিলেন। সে টাকা দিয়ে ভর্তির কাজ সারেন।

 

মহাজনও হেল্প কইরছে

কামরাঙ্গীরচরের হাসান নগরে মিরাজ মহাজনের রিকশা গ্যারেজ আছে। সেই গ্যারেজই এখন শরিফুলের ঠিকানা। থাকার জন্য মাসে ৬০০ টাকা করে দিতে হয়। আর রিকশা ভাড়া দৈনিক ৮০ টাকা। শরিফুল জানালেন, ‘মহাজনও হেল্প কইরছে। অন্য রিকশাওয়ালার কাছ থেকে ১০০ টাকা ভাড়া নেয়। আমি ৮০ টাকা দিই। থাকার ভাড়াও এক শ টাকা কম নেয়। ’

গ্যারেজ থেকে কলেজ মাইল দুয়েক। বেশির ভাগ দিনই হেঁটে আসেন। কোনো কোনো দিন বাসে। সকালে ক্লাস করেন। ক্লাস শেষে বিকেলে সবাই যখন ভাত-ঘুমে, শরিফুল তখন রিকশা নিয়ে বের হন। সারা দিন রিকশা চালিয়ে রাতে ফেরেন। গ্যারেজের এক কোনায় পাটের বস্তা বিছিয়ে তার ওপর বইপত্র নিয়ে বসেন। ‘অনেক রাইত পর্যন্ত পড়ি। অন্য রিকশাওয়ালারা তখন ঘুমায়, তাই কারেন্টের বাতি জালান যায় না। মোমবাতি জ্বালায় পড়ি’—বললেন শরিফুল। কোনো বিষয় না বুঝলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তো আছেই। তাদের কাছে চলে আসেন।

 

ইউনিফর্মও ছিল না

কলেজে পরে যাওয়ার মতো ভালো পোশাক ছিল না। একটি মাত্র শার্ট। সেটি পরে ক্লাসে ঢুকতেন। অনেকে চোখ টানাটানি করত। একদিনের ঘটনা। কলেজে শিক্ষামন্ত্রী আসবেন। আগের দিনই ক্লাসে বলে দেওয়া হয়েছে, যেন সবাই ইউনিফর্ম পরে কলেজে আসে। সেদিন শরিফুলও এলেন। কিন্তু কলেজ গেটে আটকে দেওয়া হলো। দারোয়ান জানালেন, ইউনিফর্ম ছাড়া কোনো ছাত্রকে ভেতরে ঢুকতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেকক্ষণ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে এক শিক্ষকের সহায়তায় ভেতরে ঢুকলেন। সেবার কলেজের দরিদ্র তহবিল থেকে দুই হাজার টাকা পেয়েছিলেন। সে টাকা দিয়ে ইউনিফর্ম বানিয়েছেন। এখন সেটা পরেই কলেজে যান।

ক্যাম্পাসে রিকশা চালানোর সময় একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান শরিফুলের রিকশায় ওঠেন। তখন বেতন কাঠামো নিয়ে ক্যাম্পাসে আন্দোলন চলছিল। শরিফুল বলেন, ‘স্যার, একটা কথা বলতাম। ’ সিদ্দিকুর রহমান সায় দিলেন। ‘স্যার, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা তো এক লাখ টাকারও বেশি বেতন পান। আপনারা কত পান?’ রিকশাচালকের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে কিছুটা অবাক হলেন সিদ্দিকুর রহমান। এরপর আরো অনেক কথা হয়। একই ভাবে পরিচয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে। এরপর থেকে বইপত্র, পরীক্ষার ফি থেকে শুরু করে যেকোনো বিপদে-আপদে স্যারদের কাছে চলে আসেন।

এইচএসসিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিতে হবে। কিন্তু নিজের কোনো ল্যাপটপ বা কম্পিউটার নেই। স্থানীয় কম্পিউটারের দোকানে একটা কোর্স করতে চেয়েছিলেন। ওরা ২৫০০ টাকা ফি চায়। কিন্তু অত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারস্থ হন শরিফুল। শরিফুলের কণ্ঠেও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার সুর—‘ঢাকায় তো আমার কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যাররা, ভাইয়েরাই সব। ’

এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন শরিফুল। এপ্রিলে পরীক্ষা। তাঁর স্বপ্ন ভালো রেজাল্ট করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। ‘আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইবার চাই। ভাইয়েরা বলছে, আইন বিভাগে ভর্তি হতে পারলে ব্যারিস্টার হতে পারব। আগে তো ভালো রেজাল্ট করা লাগব। এখন তাই পড়ে যাচ্ছি। ’


মন্তব্য