kalerkantho


কীর্তিমান

বাঁশিওয়ালা

ছেলেবেলা থেকেই বাঁশির প্রতি অনুরাগ। সাগরে নিজের নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে বাঁশি বাজাতেন। এবার একুশে পদক পাওয়া বংশীবাদক ওস্তাদ ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলামকে নিয়ে লিখেছেন ফারিয়া মৌ

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাঁশিওয়ালা

১৯৪৫ সালে বাবার কর্মস্থল রাজবাড়ীতে আজিজুল ইসলামের জন্ম। পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হলেও শৈশব থেকে চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে ছিলেন।

শৈশবে রেডিওর গানের সঙ্গে বাঁশির সুর তাঁকে মুগ্ধ করত। আর তখন থেকেই নিজে নিজে বাঁশি বাজানোর চেষ্টা করতেন। তখন স্থানীয় মেলায় বাঁশি বাজাতেন। ম্যাট্রিক পাসের পর ওস্তাদ বেলায়েত আলী খানের কাছে এক মাসের তালিম নেন। বেতন মিটিয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে দশ টাকা এবং নিজের দুই টাকা দিয়ে। এরপর ওস্তাদ বেলায়েত আলী খানের কাছেই শিখেছেন শাস্ত্রীয় সংগীত। পরে এই গুরু তাঁকে কিছুদিনের জন্য তবলার তালিমও দেন।

১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করে বাবার ইচ্ছায় মেরিন একাডেমির প্রথম ব্যাচে যোগ দেন। কিন্তু মেরিন একাডেমির শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে নিজেকে বন্দি মনে হতে থাকে।

তখন মাসে মাত্র এক দিন ছুটি পেতেন, যা তাঁর বাঁশি শেখার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ইতিমধ্যে মেরিন একাডেমির চিফ অফিসার ক্যাপ্টেন শাহ্ তাঁর বাঁশি বাজানোর কথা জানতে পারেন। তিনি মাসে তিন দিন ছুটির ব্যবস্থা করেন।

পেশাগত প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় সাগরে থাকতে হয়। ফলে তালিম নেওয়ার সুযোগ থাকে না। জাহাজে নিয়মিত রেডিও শুনতেন। রেডিওতে প্রচারিত বাঁশির সুর শুনে বাঁশির তাল ও সুরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে চেষ্টা করেন। অবসর সময়গুলো বাঁশি বাজিয়ে কাটাতেন। বিশ্বের অনেক দেশে যেতে হতো। মানুষের কাছে বিশ্বের অনেক গুণী বংশীবাদকের গল্প শুনতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় করাচি ছিলেন। তিন দফা চেষ্টা করে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে পালিয়ে আসেন। এরপর কয়েক মাস বাংলাদেশ শিপিংয়ে ছিলেন। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আনজুমান আরাকে বিয়ে করেন। তাদের দুই কন্যা।

বাংলাদেশের রেডিও-টেলিভিশনের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতীয় টেলিভিশনেও এখন পরিচিত মুখ ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম! বিশ্ববিখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মেলন ‘ডোভারলেন মিউজিক কনফারেন্স’-এর সুবর্ণ জয়ন্তীতে পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনেন। সিঙ্গাপুরে ‘ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক কনফারেন্স ফর ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক এ ড্যান্স’,  রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, দিল্লির হ্যাবিটেট সেন্টার, মুম্বাইয়ের নেহেরু সেন্টারসহ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁশি বাজিয়ে খ্যাতি লাভ করেন।

 

 

বাংলাদেশে সংগীত সাধকের তুলনায় বংশীবাদক নগণ্য

 

বাঁশি বাজানোকে কীভাবে নিয়েছেন?

খুব কম বয়স থেকেই বাঁশির সঙ্গে সম্পর্ক। তখন থেকে একদিনের জন্যও বাঁশি ছাড়া নিজের অস্তিত্ব চিন্তা করতে পারিনি।

 

আপনার এই বাঁশিটা?

এই বাঁশি আমার নিজের বানানো। বাঁশি বানাতে শ্রীমঙ্গলের বাঁশ ব্যবহার করেছিলাম। ২০ বছর এই বাঁশি আমার প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী। একবার ভারতে এক ট্যাক্সিতে ভুল করে বাঁশি ফেলে গিয়েছিলাম। হোটেলে গিয়ে বাঁশি খুঁজে না পেয়ে আমার তো নাজেহাল অবস্থা! মনে হচ্ছিল এখনই দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। পরদিন সকালে হোটেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় বাঁশি খুঁজে পেয়েছিলাম।  

 

শুনেছি আপনার বাঁশিটি জাতীয় জাদুঘরে উপহার দেয়ার ইচ্ছা আছে?

জাতীয় জাদুঘরে এক অনুষ্ঠানে এক দর্শক জিজ্ঞেস করেছিলেন আমার এই বাঁশির উত্তরাধিকার কে হবে? তখন উপস্থিত জাতীয় জাদুঘরের সিনিয়র অফিসারদের অনুরোধে এবং আমার সম্মতিতে আমার মৃত্যুর পর বা  অনুপস্থিতিতে জাতীয় জাদুঘরের জন্য আমার বাঁশিকে অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলাম। ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে, এই জাদুঘরের হলরুমে অসংখ্য বার বাঁশি বাজানোর সুযোগ হয়েছে।  

 

একুশে পদক পাবার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই।

যেকোনো সম্মাননাই আনন্দের। তবে আমি কিছুটা সৌভাগ্যবান বলতে পারেন। কারণ আমার মা এখনো জীবিত। মায়ের জীবদ্দশায় এই অর্জন আমার কাছে পরম পাওয়া। আর অনেক ক্ষেত্রেই মরণোত্তর সম্মাননা দেয়া হয়। কিন্তু আমি আমার জীবদ্দশায় এই পুরস্কার পেলাম, অবশ্যই অনেক বেশি আনন্দের।

 

ঠিক এই মূহূর্তে কোনো ঘটনার কথা মনে পড়ছে?

২০১৬ সালের ২৭ মে ১১৭তম নজরুল জন্মজয়ন্তীতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঁশি পরিবেশন করেছি। সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে ১৪ জুন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় আসানসোলে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঁশি বাজানোর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

 

নতুন যারা বাঁশি বাজাচ্ছেন, তাদের নিয়ে কিছু বলুন।

বাংলাদেশে সংগীত সাধকের তুলনায় বংশীবাদক নগণ্য। আর জীবিকার তাগিদ থাকলে বাঁশি বাজানোর শখটাকে ধরে রাখা ভীষণ কঠিন। এখন পেশা হিসেবে বংশীবাদকের অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার সুযোগ কম। তাই এখনকার ছেলেরা বাঁশি বাজাতে সেভাবে উৎসাহী হয় না। তবে বাঁশি বাজানো আজীবন সাধনার বিষয়।


মন্তব্য