kalerkantho


মাহফুজের আঁচল

২০১২ সাল থেকে ঢাকার আশপাশে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে আঁচল ট্রাস্ট্রের ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পেয়েছেন অর্ধ লাখ মানুষ। আঁচলের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজুর রহমান। স্বেচ্ছাসেবী এ প্রতিষ্ঠান নিয়ে জানাচ্ছেন নাদিম মজিদ

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মাহফুজের আঁচল

মাহফুজুর রহমানের শৈশব কেটেছে হাতিরপুলে। বাবার ছিল গাড়ির গ্যারেজের ব্যবসা। ভালোই কাটছিল দিন। ১৪ বছর বয়সে বাবা মারা যান। গ্যারেজটি দখল করে নিল ম্যানেজার। ছেলেমেয়ে নিয়ে বিপদে পড়ে যান মা। মা সবাইকে নিয়ে চলে আসেন ঝিগাতলায়। ১৯৮৩ সালে আইডিয়াল কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে উচ্চশিক্ষা নিতে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমান মাহফুজ। অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি পাস করেন। পড়াশোনা করার সময় বহুজাতিক কম্পানি শেল ওয়েলের অকল্যান্ড শাখায় ১৯৮৫ সালে বিজনেস অ্যানালিস্ট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯০ সালে হন ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর।

১৯৯৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্যাসিফিক অর্চার্ডের বাংলাদেশি এজেন্সির দায়িত্ব নিয়ে শেলের চাকরি ছেড়ে দেন।

বাংলাদেশে এজেন্সি নেওয়ায় ঘনঘন বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া করতে হতো।   এ যাতায়াতের মাঝেই একদিন প্রিয়াঙ্কা সম্পর্কে জানতে পারেন।

 

ডিফর্ম বেবি প্রিয়াঙ্কা

বাংলাদেশের মেয়ে প্রিয়াঙ্কা। জন্মের সময় তার হাত ও পা দুটো জোড়া লাগানো ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় এ ধরনের সমস্যা নিয়ে জন্মানো শিশুদের অপারেশনের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা হয়। বাংলাদেশে তার চিকিৎসা সম্ভব না হওয়ায় রোটারি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে তাকে ২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। চিকিৎসার জন্য প্রিয়াঙ্কাকে চার মাস অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে হবে। মাহফুজ শিশুটির থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব নেন।

 

বাংলাদেশে আসতে চায় ইন্টারপ্লাস্ট

প্রিয়াঙ্কাকে চিকিৎসা করাতে গিয়েই ইন্টারপ্লাস্টের সঙ্গে যোগাযোগ। এটি অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় সার্জনদের সংগঠন। ওখানকার ডাক্তাররা বাংলাদেশের গরিবদের চিকিৎসা দিতে চায়। বিশেষ করে যাদের সার্জারির প্রয়োজন এবং বাংলাদেশে যে ধরনের সার্জারি হয় না। বাংলাদেশে ক্যাম্প করতে চায় তারা। মাহফুজুর রহমান তাদের প্রস্তাব শুনে খুশি। তাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সমন্বয়ের দায়িত্ব নেন।

 

বাংলাদেশে ডিফর্ম প্লাস্টিক সার্জারি

২০০২ সাল থেকে বছরে দুবার বাংলাদেশে আসে ইন্টারপ্লাস্ট। প্রতিবার দুজন সার্জন থাকেন। অপারেশনের যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়ে আসেন তারা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যস্ত রোগীদের অপারেশন করেন। সাধারণত যেসব রোগীর অপারেশন বাংলাদেশের ডাক্তারদের জন্য কঠিন, সেসব রোগীকে তাঁরা অপারেশন করে থাকেন।

 

আঁচল ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা

ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে জটিল রোগীদের সেবা করেও মন ভরছিল না। সব সময় ভাবতেন, চিকিৎসাবঞ্চিত রোগীদের জন্য আরো কিছু করা যায় কি না। অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে দীর্ঘদিন রোগীদের নিয়ে কাজ করায় অনেক ডাক্তারের সঙ্গে পরিচিত হন। এ পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আঁচল। মাহফুজ জানান, ‘মা যেমন তাঁর সন্তানকে আঁচল দিয়ে আগলে রাখেন। আমরাও গরিব রোগীকে সেভাবে আগলে রাখতে চাই। ’

 

চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

আঁচল ট্রাস্ট্রের প্রথম মোবাইল হেলথ ক্যাম্প হয়েছিল মাহফুজের দাদার বাড়ি নবাবগঞ্জ উপজেলার কুণ্ডা গ্রামে। আগে থেকে মাইকিং করা হয়েছিল। গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন। প্রথম ক্যাম্পে ১২০০ রোগী এসেছিল। ‘কথায় আছে, যেকোনো সেবামূলক কাজ নিজের ঘর থেকে শুরু করতে হয়। আমরাও নিজের দাদাবাড়ি থেকে ক্যাম্প করা শুরু করি। ’ বললেন মাহফুজ।

আঁচল ট্রাস্টের প্রধান কাজ ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যক্লিনিক পরিচালনা। প্রতি মাসে ২০-২২ জায়গায় ক্লিনিক হয়ে থাকে। প্রত্যেক ক্লিনিকে থাকে ডাক্তার, নার্স, সাপোর্টিং স্টাফ এবং কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী তরুণ। ক্যাম্প বড় হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও দাঁতের ডাক্তারও রাখা হয়। আঁচল ট্রাস্টের হেড অব পাবলিকেশন্স অ্যান্ড রিপোর্টিং পিয়াল রিজোয়ান জানান, ‘রাজধানী ঢাকার ৪০-৫০ কিলোমিটারের মধ্যে আমাদের ক্লিনিক গিয়ে থাকে। দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসি। কোথাও যাওয়ার আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করি, মাইকিং করি এবং লিফলেট বিতরণ করি। প্রথম প্রথম বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে আলাপ করার দরকার হলেও এখন নতুন নতুন এলাকা থেকে জনপ্রতিনিধি বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের এলাকায় ক্লিনিক নিতে বলে। ’

 

স্বাস্থ্যসেবায় যা থাকে

সাধারণত তিন ধরনের রোগী পেয়ে থাকে এ ক্লিনিক। আঁচল ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহাদী অপু জানান, আমাদের সঙ্গে সব সময় রক্ত ও ডায়াবেটিস পরীক্ষার যন্ত্রপাতি থাকে। থাকে দন্ত ও চক্ষুশিবির। আমরা তিন ধরনের রোগী দেখি সব সময়।  

প্রথমত, এক ধরনের রোগী থাকে, যাদের একদিন দেখে ওষুধ দিলে সেরে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে ওষুধেরও প্রয়োজন হয় না। শুধু ডাক্তারের পরামর্শ হলেই চলে।

দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু রোগী থাকে খুব অসহায়। তাদের শুধু এক দিন চিকিৎসা দিলেই হয় না, পরবর্তী সময়ে আবার ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন পড়ে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মতো সহায় তাদের থাকে না। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের পরবর্তী সময়ে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়।

তৃতীয়ত, কিছু কিছু রোগীর জন্য অপারেশনের প্রয়োজন হয়। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো কিংবা অস্ট্রেলিয়ায়ও নিয়ে যায় আঁচল ট্রাস্ট।

গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা পেয়েছেন ৫৯ হাজার মানুষ। ৭৩ জনের চোখের অপারেশন হয়েছে।

 

সুস্থ হচ্ছে চৈতি

গত বছর জুলাই মাসে চৈতি নামে এক ডিফর্ম বেবির দেখা পায় আঁচল ট্রাস্ট। তার তিনটি পা। জরায়ু ও পায়ুপথ নেই। চিকিৎসা করানোর জন্য অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গেলে সার্জনরা বৈঠকে বসেন। সে বৈঠকে ৬০ জন সার্জন উপস্থিত ছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, চৈতি আসলে দুজনের শরীর নিয়ে বড় হচ্ছে। আরেকজন বড় হচ্ছে তার পেটে। শুধু পা বের হয়ে আছে। তাকে অপারেশন করে আরেকজনের পা এবং পেট থেকে দেহ অপসারণ করা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে জরায়ু এবং পায়ুপথ। এখন তাকে রি-বিল্ড করার কাজ করছেন চিকিৎসকরা। চৈতির মতো মোট সাতজন রোগীকে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল আঁচল ট্রাস্ট।

 

নিজের টাকায় চলছে ট্রাস্ট

সদস্যদের টাকায় চলছে ট্রাস্ট। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অপারেশনের জন্য টাকা লাগে না। বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডাক্তার ও বেডের খরচ বহন করে হাসপাতাল। শুধু ভিসা ও বিমান ভাড়া জোগাড় করে ট্রাস্ট।

 

সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে আঁচল দিয়ে আগলে রাখতে চাই

মাহফুজুর রহমান

প্রতিষ্ঠাতা, আঁচল ট্রাস্ট

 

সংগঠনের নাম আঁচল ট্রাস্ট রাখলেন কেন?

শৈশবে বাবাকে হারিয়েছি। মা তাঁর আঁচলে আমাদের আগলে রেখেছিলেন। বড় করেছিলেন। আমরাও আমাদের আয়ত্তাধীন সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে আঁচল দিয়ে আগলে রাখতে চাই। তাদের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিতে চাই।

 

ডিফর্ম বেবিদের অপারেশন করার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে থাকে আঁচল ট্রাস্ট। কাজটি কিভাবে করে থাকেন?

অস্ট্রেলিয়ার একটি হাসপাতালের সঙ্গে কথা বলে ডিফর্ম বেবির অপারেশন ও ওষুধ খরচ ফ্রি করিয়ে নিয়েছি। আবার সেখানে তাদের থাকার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাহায্য নিই। প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের বাসায় এসব ডিফর্ম বেবি ও অভিভাবকদের রাখেন। একেকটি চিকিৎসার জন্য ছয় থেকে এক বছর সময় লাগে। আমরা যাতায়াতের জন্য ভিসা ও বিমান ভাড়া জোগাড় করে দিই। সেখানে চিকিৎসা নেওয়া, থাকা-খাওয়ার ব্যাপারেও আমাদের ট্রাস্ট তদারকি করে।

 

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠায় জড়িত ছিলেন?

১০ বছর আগে ইন্টারপ্লাস্টের মতো অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বার্নস অ্যাসোসিয়েশনও বাংলাদেশে আসার আগ্রহ দেখিয়েছিল। আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিই। অগ্নিদগ্ধদের জন্য আগুন লাগার পরবর্তী ২৪-৪৮ ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় যেন রোগী ভালো চিকিৎসা পায়, সে জন্য সংগঠনটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্লাস্টিক অ্যান্ড বার্নস ইউনিট প্রতিষ্ঠা হয়।

 

কী স্বপ্ন দেখেন?

আঁচল ট্রাস্টের মতো আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত রোগীরা যেন চিকিৎসাসেবা পায়।


মন্তব্য