kalerkantho


ছড়িয়ে দিই বাংলাদেশ

বাংলা চ্যানেলে মুম্বাই

বাচ্চা বাচ্চা তিনজন। এসেছে মুম্বাই থেকে। বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেবে। টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনস। নাফ হয়ে বঙ্গোপসাগর। ১১ ফেব্রুয়ারির দিনটি আলাদাই ছিল। লিখেছেন ফয়সাল আমান রায়হান

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাংলা চ্যানেলে মুম্বাই

কাজী হামিদুল হক

সুদূর মুম্বাই থেকে এসেছে ভিদান্ত, ডলি আর রাজ। সুইমিং ছাড়া না কিছু দেখতে পায়, না তাদের কোনো কথা আছে, না অন্য কিছু শুনতে চায়।

ভারতের সব চ্যানেলে সাঁতার কেটেছে রাজ। ভিদান্ত আর ডলির ঝোলা অত ভারী না হলেও একটি চ্যানেল তারা পার হয়েছে। শিশুর চেয়ে কিছু বড় তারা। কিশোর বললে আবার না বেশি হয়ে যায়।

মুম্বাইয়ে থাকে। সমুদ্রের সঙ্গে ভালোই যোগাযোগ। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়ে। রাজের বাবা ইন্ডিয়ান নেভিতে কাজ করেন। দূরপাল্লার সাঁতারে আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে।

তিনজনই এসেছে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেবে বলে। টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনস পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য ১৬.১ কিলোমিটার। বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন কাজী হামিদুল হক ২০০৬ সালে। হামিদুল হক ছিলেন কীর্তিমান আলোকচিত্রী ও স্কুবা ডাইভার।

বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার এটি ১২তম আসর। আয়োজক মুসা ইব্রাহীম ও এভারেস্ট একাডেমি। ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল সোয়া ১০টায় টেকনাফের ফিশারিজ ঘাট থেকে সাঁতার শুরু হয়। মুম্বাইয়ের সাঁতারুদের গাইড করার জন্য ছিল তিনটি বোট, দক্ষ নাবিক, ডাক্তার, রেফারি ও আরো অনেকজন।

শুরুতে সবাই সমানতালেই এগোচ্ছিল। দেড় কিলোমিটার যাওয়ার পর রাজ পিছিয়ে পড়ে। ডলি আর ভিদান্ত যাচ্ছিল আগের মতোই। স্থানীয় মানুষ এমন আয়োজন আগেও অনেকবার দেখেছে, কিন্তু তাদের বিস্ময় বুঝি কাটেনি। পর্যটকরা তো অবাক হচ্ছিলই।

প্রায় সাত-আট কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর আমাদের সারেংয়ের হঠাত্ মনে হলো, সাঁতারুদের সঙ্গ দেবেন। ব্যস, দিলেন ঝাঁপ। ১৫-২০ মিনিট সাঁতরে  আবার নৌকায় উঠে এলেন। দম নিয়ে বললেন, ওরা আসলে মাছ। মানুষ এভাবে সাঁতরাতে পারে?

১০-১১ কিলোমিটার যাওয়ার পর ডলি একটু পিছিয়ে পড়ে। রাজ অবশ্য আরো পেছনে ছিল। আমরা কয়েকজন একটি নৌকা নিয়ে সেন্ট মার্টিনস জেটিতে (ফিনিশিং পয়েন্ট) চলে গেলাম। আমাদের নামিয়ে দিয়ে নৌকা আবার সাঁতারুদের কাছে ফিরে গেল। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম সাঁতারুদের বরণ করে নেওয়ার জন্য।

মনে পড়ল তাদের কোচ অজয়ের কথা। গতকাল বিকেলে চাচক্রে দেখা হয়েছিল। বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে এসে আমরা অভিভূত। আয়োজকরা কিছুরই কমতি রাখেননি। ’ অজয় বারবারই আমাদের ভারতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

অবশেষে ৪ ঘণ্টা ২৫ সেকেন্ড সময় পর ফিনিশিং পয়েন্ট টাচ্ করল ভিদান্ত। একে একে আসে ডলি আর রাজ। পরে জিরিয়ে নিয়ে রাজ বলছিল, এক-দেড় কিলোমিটার আসার পরই (যাত্রা শুরুর পয়েন্ট থেকে) তাঁর শরীর খারাপ লাগতে শুরু করে। তবে কাউকে বুঝতে দেয়নি। মাঝে একবার এক নৌকা থেকে কেবল একটি এয়ারপ্লাগ চেয়ে নিয়েছিল। অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরেই ১১ বছরের এই ছেলেটি বাকি ১৪-১৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছে।

আমার মনে পড়ল, যেদিন এসে পৌঁছেছিল সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার জীবনের লক্ষ্য কী?

চোখের পলক না ফেলেই ও জবাব দিয়েছিল, ‘অলিম্পিক যাব’।

ছবি : লেখক

 

বাংলা চ্যানেলের খবর

►   ২০০৬ সালে শুরু। উদ্যোক্তা কাজী হামিদুল হক। প্রথমবার সাঁতরেছিলেন ফজলুল কবির, লিপটন ও সালমান সায়ীদ।

►   ২০১২ সালে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেন ডাচ্ সাঁতারু ভ্যান গুল মিলকো। এই সুবাদে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দূরপাল্লার সাঁতারতালিকায় ওঠে

     বাংলা চ্যানেলের নাম।

►   ২০১৬ সালে ভারতের রিতু কেডিয়া দ্রুততম সময়ে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড গড়েন। এটি তাঁকে ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে তেনজিং নোরগে অ্যাডভেঞ্চার অ্যাওয়ার্ড পেতে সাহায্য করে।

 


মন্তব্য