kalerkantho

খুঁজে ফেরা

শুলকবহর

অটোমান সম্রাট চট্টগ্রামে তৈরি জাহাজ পছন্দ করতেন। কথাটির সূত্র ধরে শুলকবহর জায়গায় অনুসন্ধান চালিয়েছেন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রেয়াজুল হক

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শুলকবহর

চট্টগ্রাম বন্দরে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির জাহাজ। ১৭০২

মোগল আমলে শুলকবহর একটি গণ্ডগ্রাম ছিল। পরে ইংরেজ আমলে মৌজা হয়।

এখন সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ড। লোকসংখ্যা তিন লাখের বেশি। চকবাজার থেকে পাঁচলাইশ সড়ক ধরে এগিয়ে গেলে পাবেন বিচিত্রা লাইব্রেরি ও একুশে হাসপাতাল। তারপর কাতালগঞ্জ মোড় হয়ে ডান দিকে যাবেন। পাবেন আব্দুল্লাহ খান সড়ক। কিছু দূর এগোনোর পর নিউ স্টার হোটেল। বাঁয়ে মোড় নিলে আবদুল লতিফ সড়ক। এটি ডান দিকে মোড় নিয়ে হামদু মিয়া সড়কে গিয়ে মিশেছে। হামদু মিয়া সড়কের লাকি ফার্মেসির মোড় থেকে একটি রাস্তা গেছে পূর্ব দিকে। সেটি রশিওয়ালা পাড়া। অবশ্য এ নামটি এখন কম লোকে জানে। আল মাদানি সড়ক বললে চিনে। এটি দক্ষিণ শুলকবহরের মধ্যে। পাঁচলাইশের পরে সুগন্ধা আবাসিক এলাকা, ষোলশহর দুই নম্বর এলাকাও শুলকবহর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়ে। কবি মোহাম্মদ দানেশ পণ্ডিত ও ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জন্মেছিলেন শুলকবহরে। হামিদউল্লাহ খান জামে মসজিদ নামে পুরনো একটি মসজিদ আছে শুলকবহরে। মসজিদের পশ্চিম দিকে আছে বড় একটি পুকুর।

 

জাহাজবন্দর

শুলকবহরের ধারে-কাছেই মির্জার খাল। একসময় এটি অনেক প্রশস্ত ছিল। এই খালে নোঙর করত পালতোলা নৌকা। নৌকাগুলো থেকে মালামাল খালাস করত খালাসি পাড়ার মানুষ। অনেকে মনে করে, একসময় কর্ণফুলী নদী প্রবাহিত হতো শুলকবহরের খুবই কাছ দিয়ে। সেখানে জাহাজ (সুলুপ) সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। আরবি সুলুপবহর মুখে মুখে হয়ে গেছে শুলকবহর। খ্রিস্টীয় অষ্টম-নবম শতকের দিকে আরব বণিকরা কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত সুলুপবহরে বাণিজ্যিক জাহাজ ভেড়াত।

 

এখনকার শুলকবহর

পশুপাখির দোকান অনেক আছে শুলকবহরে। আবদুল লতিফ সড়কেই আছে কয়েকটি। দোকানে কবুতরই বেশি। কুকুর, খরগোশও আছে। এই সড়কের শেষ মাথায় শুলকবহর মাদ্রাসা। বিশাল তার প্রবেশদ্বার। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অনেক। নোয়খালীর লক্ষ্মীপুরের নিবাসী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক সহকারী পরিচালক আবদুল মান্নান ভূঁইয়া শুলকবহরে এসে ঠাঁই গেড়েছেন বেশ আগে। চারতলা বাড়ি তাঁর। ১৯৭০ সালে কিনেছিলেন জায়গা। তিনিও দেখেছেন বাড়ির সামনে দিয়ে খাল প্রবাহিত হতে। এখন ভরাট হয়ে গেছে সেই খাল।

 

কিছু আগের দিন

শুলকবহরের একটি হোটেলে চা খাচ্ছিলেন বাসিন্দা মো. আলমগীর। বয়স তাঁর ৪৬। মুরব্বিদের কাছে শুনেছেন শুলকবহরের কথা। বহুতল ভবন নির্মাণকালে পাইলিংয়ের সময় নৌকার কাঠ, গাছের গুঁড়ি ও শিল পাথর পাওয়ার কথা শুনেছেন তিনি। দক্ষিণ শুলকবহরের রশিওয়ালাপাড়া ও মুরাদপুরের কাছে খালাসিপাড়ার কথাও তিনি জানান। তিনি নিশ্চিত করলেন, এখনকার আল মাদানি লেনেই ছিল রশিওয়ালাপাড়া। এই পাড়ার পুরনো বাসিন্দারা পাটের আঁশ শুকিয়ে, তারপর পাকিয়ে নিয়ে রশি তৈরি করত। রশিগুলো জাহাজ বাঁধাছাদার কাজে ব্যবহূত হতো। আর খালাসিপাড়ার অধিবাসীরা জাহাজের খালাসি হিসেবে কাজ করত।

 

জাহাজ ফ্যাক্টরি চট্টগ্রাম

দেশ এখন জাহাজ নির্মাণশিল্পে বেশ এগিয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের আনন্দ শিপইয়ার্ড ও স্লিপওয়ে এবং চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড বিদেশেও নাম করেছে। এর শুরু যে শুলকবহরে অথবা এর কাছাকাছি কোনো এলাকায়, বললে অত্যুক্তি হয় না। আবদুল হক চৌধুরী তাঁর বন্দর শহর চট্টগ্রাম গ্রন্থে লিখেছেন—ষোলশহর ও শুলকবহর গ্রামদ্বয়ের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত গোদিরপাড়া। গোদির শব্দটি আরবি গোদরির বিকৃত রূপ। গোদরি শব্দের অর্থ জাহাজ নির্মাণ বা মেরামতের স্থান। নবম-দশম শতকে আরবি বণিকরা এখানে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত করাতেন। এই পাড়ায় পুকুর খননের সময় তলদেশে জাহাজের একটি মাস্তুল ও একটি জাহাজের অর্ধেকাংশ পাওয়া গিয়েছিল। অন্য একটি পুকুর খননের সময় সম্পূর্ণ একটি জাহাজ পাওয়া গিয়েছিল বলে জানা যায়। এ জায়গাটি তিন দিকে প্রশস্ত খাল দিয়ে বেষ্টিত ছিল, যা এই জায়গাটিকে জাহাজ নির্মাণে উপযোগী করেছিল। বর্তমানে খালের অস্তিত্ব আর নেই। ভরাট হয়ে বাড়িঘর উঠে গেছে। এই পাড়ায় অনেকটা জাহাজের মতো দেখতে একটি উঁচু টিলা ছিল। এর দৈর্ঘ্য ছিল ৩০-৩৫ হাত, প্রস্থ ১০-১২ হাত এবং উচ্চতা ৮-৯ হাত। এটি গোদির পাহাড় নামে পরিচিত ছিল এবং বলা হয়ে থাকে এটি জাহাজ নির্মাণের ডক ছিল।    

চট্টগ্রামে সনাতনি জাহাজ ও কাঠের নৌকা প্রচুর তৈরি হতো। মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৪ শতকে বাংলায় এসেছিলেন। বাংলার নদীতে মানুষ ও পণ্যবাহী প্রচুর নৌকা চলাচল করতে দেখেন এবং তিনি সেই সময় যুদ্ধজাহাজের বিশাল বহরের কথাও জানিয়েছেন। ভেনিশিয়ান পরিব্রাজক সিজার ফ্রেডরিক থেকে জানা যায়, পনেরো শতকের মধ্যভাগে চট্টগ্রাম ছিল সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণশিল্পের উল্লেখযোগ্য স্থান। কনস্টানটিনোপলের সুলতান আলেকজান্দ্রিয়ায় তৈরি জাহাজ নয়, পছন্দ করতেন চট্টগ্রামে তৈরি জাহাজ। সতেরো শতকে তুরস্কের সুলতানদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধজাহাজ বহর তৈরি করেছিল চট্টগ্রাম। মোগল নৌবাহিনীর অনেক যুদ্ধজাহাজ চট্টগ্রামে নির্মিত হয়েছিল। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য চট্টগ্রামে নির্মিত যুদ্ধজাহাজ ১৮০৫ সালের ঐতিহাসিক ট্রাফলগার যুদ্ধে ব্যবহূত হয়েছিল।


মন্তব্য