kalerkantho


জয় বাংলা

পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরতে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। জাদুঘর ঘুরে এসে জানাচ্ছেন সাইমুম সাদ

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

ছবি : তারেক আজিজ নিশক

‘যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল পুলিশ বাহিনী। সেই বাধা ভেঙে জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে তারা।

’ বললেন জাদুঘরের দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য। অগ্রজদের বীরত্বগাথায় তাঁর চোখে-মুখে গর্বের হাসি। গল্পচ্ছলে জানালেন, ‘এখানে কয়েক দিন আগে পোস্টিং হয়েছে। প্রতিদিনই অনেক ছেলে-মেয়ে ও বিদেশি ঘুরতে আসে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের বীরত্ব সম্পর্কে জানতে পারে। ’ ভেতরটায় বেশ ভিড়ভাট্টা। ছাত্র থেকে বৃদ্ধ—সবাই হাজির। দুইটি তলায় অবস্থিত জাদুঘরটি। বেজমেন্টে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ এবং গ্রাউন্ড ফ্লোরে ‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’। বঙ্গবন্ধু গ্যালারির প্রবেশমুখে বঙ্গবন্ধুর দুর্লভ কিছু ছবি এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দুটি ডকুমেন্টারি। আর কাচের দেয়ালে ঘেরা বাক্সে থরে থরে সাজানো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহূত টুপি, বেল্ট, টাই, স্টিক, ডায়েরি, বই, পরিচয়পত্র, চশমা, কলম, মেডেল, বাঁশি, মাফলার, জায়নামাজ, খাবারের প্লেট, পানির মগ, পানির গ্লাস, রেডিও, শার্ট, প্যান্ট, র্যাংক ব্যাজসহ টিউনিক সেট, ক্যামেরা, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মানিব্যাগ, লোহার হেলমেট, হ্যান্ড মাইক, রক্তভেজা প্যান্ট-শার্ট, দেয়ালঘড়িসহ আরো কত কী! আরেক পাশে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ব্যবহূত ৭.৬২ এমএম রাইফেল, ২ ইঞ্চি মর্টার, মর্টার শেল, সার্চ লাইট, রায়ট রাবার শেল, রিভলবার, .৩০৩ এলএমজি, মেশিনগান, ৭.৬২ এমএম এলএমজি, .৩২ বোর রিভলবার, .৩৮ বোর রিভলবার, .৩০৩ রাইফেল, ১২ বোর শটগান, ৯ এমএম এসএমজিসহ আরো অনেক অস্ত্র। আছে মোগল, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের পুলিশের ইউনিফর্ম এবং পুলিশ সদস্যদের ব্যবহূত তরবারি, চাবুক, শিঙা, রামদা, ঘোড়ার গাড়িসহ অন্য জিনিসপত্র।

মুগ্ধ হয়ে এসব ঘুরে ঘুরে দেখছে রামপুরা থেকে আসা স্কুলছাত্রী অনিকা তাবাসসুম। বলল, ‘পুরো মিউজিয়াম ঘুরে দেখছি। অনেক কিছুই জানা হচ্ছে। ’ পাশেই ছিলেন তার মা। তিনি বললেন, ‘পুলিশের কথা উঠলে এখন আমরা বেশির ভাগ সময়ই গালাগাল করি। কিন্তু এ বাহিনীর সদস্যরা একাত্তরে জীবন বাজি রেখেছেন—এটা আমরা ভুলে যাই। ’

এক কোরিয়ান নাগরিকের সঙ্গেও দেখা হলো। ভদ্রলোক কোরিয়ান একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন। গণমাধ্যম মারফত জাদুঘরটির কথা শুনে দেখতে এসেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘তাঁরা (পুলিশ) তো বীর। নিজের দেশ রক্ষার জন্য যাঁরা যুদ্ধে নিজেকে বিলিয়ে দেন, তাঁদের নিয়ে তো দেশের মানুষের গর্ব হওয়ারই কথা। ’

 

জাদুঘর প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে

জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হাবিবুর রহমান। তিনি শোনান এই জাদুঘর তৈরির পেছনের কথা। বললেন, ‘আমাদের এডিসি মোস্তাক আহমদ একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেটি তৈরি করতে গিয়ে শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্মারক সংগ্রহ করি। রাজারবাগে পঁচিশে মার্চ যে পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধ তৈরি করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলি। সেই থেকেই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মাথায় আসে। এরপর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের টেলিকম ভবনে প্রাথমিকভাবে সংগ্রহগুলো সংরক্ষণ করি। ২৩ জানুয়ারি স্থায়ী ভবনে সংগ্রহগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে। এতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরাও সহায়তা করেছেন। ’

 

মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত বেতারযন্ত্র

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের কন্ট্রোলরুমে রাখা বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে বেতার অপারেটর শাহজাহান মিয়া রাজারবাগ আক্রান্ত হওয়ার খবরটি দেশের বিভিন্ন পুলিশ লাইনসে প্রেরণ করেন। ঘোষণাটি ছিল, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সব পুলিশ লাইনসের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পাকিস্তান আর্মি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ চালিয়েছে। আপনারা নিরাপদে আশ্রয় নিন। ’ বেতারযন্ত্রটি জাদুঘরে রাখা আছে।

 

পাগলা ঘণ্টা

পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণ করলে তৎকালীন আইজিপির বডিগার্ড কনস্টেবল আব্দুল আলী পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে পুলিশ সদস্যদের জড়ো করেন। পাগলা ঘণ্টার আওয়াজ শুনে পুলিশ সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে সমবেত হন। তার পরই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেন। সেই ঐতিহাসিক পাগলা ঘণ্টাটি এখন জাদুঘরে সংরক্ষিত।

 

পৃষ্ঠাজুড়েও মুক্তিযুদ্ধ

জাদুঘরে রয়েছে একটি লাইব্রেরিও। এখানে মূলত মুক্তিযুদ্ধনির্ভর বইগুলো রাখা হয়েছে। আছে পুলিশ সদস্যদের আত্মজীবনী, রণাঙ্গনের স্মৃতি, পুলিশের নানা অবদানের ওপর লেখা বই। পাঠকরা চাইলে লাইব্রেরিতে বসে বই পড়তে পারেন। চারটি কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে বিভিন্ন বই পড়তে পারবেন।

আছে আরো লাইব্রেরির পাশেই স্যুভেনির শপ। সেখান থেকে নির্ধারিত মূল্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা—প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ড’ বই, শহীদ পুলিশের রক্তের ঋণ নামক বই, প্লেট, মগ, কলমদানি, চাবির রিং, ব্যাগ, গেঞ্জি, পেপার ওয়েট, কলম ও ক্রেস্ট কিনতে পারবেন।

বুধবার ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটি খোলা থাকে। তবে শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত। টিকিটের মূল্য ১০ টাকা। ছাত্রদের ক্ষেত্রে পাঁচ টাকা।


মন্তব্য