kalerkantho


ফেসবুক থেকে পাওয়া

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ফেসবুক থেকে পাওয়া

খুব মিস করছি তোমাদের

কেমন আছ বড় ভাইয়া? আশা করছি আল্লাহ তাআলার অশেষ কৃপায় অনেক অনেক ভালো আছ। দেখতে দেখতে দুই বছর পেরিয়ে গেল, তুমি নেই।

আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছ অচেনা জগতে, যেখানে একবার গেলে আর ফিরে আসা যায় না। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী একটু আগে কি একটু পরে, আমাদের প্রত্যেককেই একদিন সেখানে যেতে হবে। কিন্তু সেই যাওয়াটা মানা যায়, যদি তা ঠিক সময়ে হয়। কিন্তু তুমি বড় অকালেই চলে গেলে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তুমি চলে যাওয়ার পরপরই মা-বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই অসুস্থতা এখনো কাল হয়েই আছে। তাঁদের নির্জীব করে রেখেছে। শোকে পাথর করে রেখেছে আমাদের। তুমি চলে যাওয়ার দুই বছর পূর্ণ হতে না হতেই আমাদের কাঁদিয়ে মেজো আপাও চলে গেল। পাড়ি জমাল অচেনা জগতে, যেখানে তুমি আছ। এক শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আরেক ছায়া আছর করল পরিবারের ওপর। মা-বাবা দুজনেই ভেঙে পড়েছেন। ছেলে-মেয়েরা শোকে পাথর হয়ে গেছে। আর আমি অধম প্রতিটি পলে তোমাদের অনুভব করি। এখন বাড়ি গেলেই কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগে। মেজো আপার কথা খুব মনে পড়ে। বিশেষ করে টিউবওয়েলের কাছে গেলে বেশি ভেঙে পড়ি। কারণ টিউবওয়েলের কাঠের রাস্তাটাই যে আপা তোমার রান্নাঘরের গলি। টিউবওয়েলের পাশে গেলেই তোমার সঙ্গে দেখা হতো। তুমি বলতে, ‘কেমন আছ, কখন এসেছ, খেয়েছ কি না, স্বাস্থ্যের এ কী অবস্থা! ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করো না কেন? আরো কত কী! কিন্তু এখন আর কেউ বলে না আপা! লেখাপড়ার ফাঁকে ছুটি কাটাতে গ্রামে এসেছি। অসুস্থ মা-বাবাকে দেখভাল করেছিলাম। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা আর আমার সেবাযত্নে কিছুটা শোকমুক্ত আর সুস্থ হওয়ার পথে আসতে না আসতেই গেল ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৬ তারিখে চিরতরে হারিয়ে গেল প্রাণপ্রিয় মেজো ভাই মো. ফরিদুল ইসলাম। অন্ধকারের কালো ছায়া আরো গভীরভাবে পরিবারের ওপর ছেয়ে গেল। যে অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই দুষ্কর। একটি পরিবারে একই বছরে মাত্র দুই মাস ১৪ দিনের ব্যবধানে দুই ভাই-বোন চলে গেলে কি সেই পরিবারের কিছু থাকে? এত বড় শোক কি ভোলা যায়? তবু যথাসাধ্য চেষ্টা করছি মা-বাবাকে বোঝাতে। এ ছাড়া যে উপায়ও নেই। একই সঙ্গে সবাই ভেঙে পড়লে পুরো পরিবারই যে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে সংবরণ করে মা-বাবাকে সংবরণ করার চেষ্টা করছি। খুব মিস করছি বড় ভাইয়া, মেজো আপু ও মেজো ভাইয়া, তোমাদের। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোমাদের ভালো রাখেন। জান্নাতবাসী করেন। আমিন।

 

ইতি

তোমাদের স্নেহধন্য ছোট ভাই

রাকিবুল প্রিয়

রূপসা, সিরাজগঞ্জ।

 

 

মায়ের কাছে ঋণ

মাকে নিয়ে বলতে গেলে স্মৃতিপটে অনেক কথাই ভেসে ওঠে। জন্মের পর থেকেই মায়ের ছায়ায় বেড়ে ওঠা, মায়ের হাত ধরে পথচলা, পড়াশোনা করা—আরো কত কী। জীবনের প্রতিটি পরতে মায়ের পরশ লেগে আছে। আজ থেকে ১৮ বছর আগের কথা। তখন আমার বয়স ছয়। পাক্কা স্কুুলে যাওয়ার বয়স। হাত বাড়িয়ে বাম কান ছুতে পারি। গ্রামে একটা স্কুল, তার গা ঘেঁষে একটা জরাজীর্ণ মাদ্রাসা। ছাত্র-ছাত্রী হাতেগোনা কয়েকজন। পড়ালেখাও তেমন হয় না। আম্মা চিন্তা করলেন একে বাড়িতে পড়াই, পরে না হয় স্কুল বা মাদ্রাসা কোনো একটায় ভর্তি করিয়ে দেব। বাবার কাছে বললেন, ‘গ্রামে পড়ালেখার অবস্থা খারাপ, ওকে আমি বাড়িতে পড়াব। ’ বাবা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। আমার জন্য হজমিওয়ালার কাছ থেকে একটা ‘ছোটদের বর্ণমালা’ অ, আ, ই, ঈ বই কেনা হলো। তখনকার সময় বাড়িতে বাড়িতে হজমিওয়ালা আসত। আমরা ছোটরা ভাঙা টিন, লোহা, পুরনো কাগজপত্র দিয়ে হজমি কিনে খেতাম। আহা, কী স্বাদ ছিল! ফিরে আসি মূল কথায়। শুরু হলো বাড়িতে পড়ানো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় আম্মা আমাকে পড়াতেন। আশ্চর্যের বিষয়, এক মাসের মাথায় পুরো বই আমার কণ্ঠস্থ! একদিন রাগ করে বই ছিঁড়ে ফেললাম। আমি সব পারি! এ বই তাই ছিঁড়ে ফেলেছি। ভাইয়া বইয়ের ছেঁড়া টুকরা হাতে নিয়ে বললেন, বল তো, স্বরবর্ণ কয়টা ও কী কী? আমি বললাম। তারপর একটা একটা করে সব জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে পরাস্ত করতে পারলেন না। আমি তো মহাখুশি। এবার আর স্কুুলে যেতে কোনো আপত্তি নেই। ওহ, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। মা শুধু আমাকেই পড়াতেন না, আমাদের বাড়িতে গেদুর মা থাকতেন, তাঁর মেজো ছেলে আর ছোট মেয়েকেও পড়াতেন। চাচাজি তাদের খুব স্নেহ করে আমাদের বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন। তারা ভাই-বোন মায়ের কাছে পড়তে বসত। আম্মা পড়াতেন। আব্বা বলতেন, পড়রে সোনা। আম্মা বলতেন, মন দে। ‘পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠাল চাপার গন্ধে’ (কবি আল মাহমুদ) এই কবিতা আমারও খুব ভালো লাগত। কেননা আমাদের বাড়ির উঠানে একটা কাঁঠালগাছ ছিল, কাঁঠালের পাকা ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসত। যা হোক, তসলিম উদ্দিনের পড়ালেখা বেশি দূর এগোয়নি। অভাবের সংসার। একটু বড় হতেই পেটের দায়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করা শুরু হলো। তার মা প্রায়ই আম্মার কাছে এসে বলতেন, ‘আইজ এখটা স্বপন দেখছি, দেখলাম আমার পোয়া বিদেশ গেছে গি। ’ আম্মা বললেন, ‘আল্লাহ চাইনতে এখদিন যাইব নে। ’ পরম করুণাময় মায়ের সেই প্রার্থনা কবুল করেছিলেন। বছর কয়েক পর শুনি তসলিম উদ্দিন বিয়ে করেছে। তার শ্বশুরবাড়ির অবস্থা ভালো; তারা তাকে সৌদি পাঠিয়েছে। আমার যেহেতু ছোট ওয়ান (ক্লাস-১) এর পাঠ শেষ, এখন আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো বাড়ির কাছের মাদ্রাসায়। এত দিনে মাদ্রাসা অনেক বেশি উন্নত হয়েছে, ছাত্র-ছাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। তো আমাকে নেওয়ার পর হুজুর বই খুঁজতে লাগলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মুখ কালো করে বললেন, ‘ওয়ানের বই নাই, তুমি ক্লাস টুতে ভর্তি হও। ’ আমি একবাক্যে বললাম, জি, আচ্ছা। এরপর আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা চলতে লাগল। মা আমাকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বাড়িতে কায়দা-ছিপারা পড়াতেন। পরে মক্তবে গিয়ে আমি সব পড়া পারতাম। হুজুর বলতেন, তুমি তো দেখি সব পারো! মনে মনে বলতাম, সবই মায়ের অবদান। অ আ ক খ প্রথম মায়ের কাছেই শেখা। আলিফ, বা, তা-ও। জীবনে চলার যে জ্ঞান সেটাও মায়ের কাছ থেকে শিখেছি। আমাদের ছোট জীবনে সবার কাছেই ঋণ আছে, যে মানুষটা আমায় শৈশবে কোলে নিয়ে আদর করেছিলেন, যে শিক্ষক হাতে ধরে পড়িয়েছিলেন, যে বন্ধু তার আইসক্রিম ভাগ করে খাইয়েছিল—সবার সব ঋণ একত্র করলেও মায়ের কাছে জমানো ঋণের সমান হবে না। আমরা মায়ের কাছে অনেক অনেক বেশি ঋণী।

 

শায়খুল ইসলাম

শিবগঞ্জ, সিলেট।


মন্তব্য