kalerkantho


উদ্যমী বাংলাদেশ

বাঁধনহারার দল

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলেছে নরসিংদী জেলা প্রশাসন। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নিয়েছে নানা উদ্যোগ। বাঁধনহারা থিয়েটার স্কুলের নির্দেশক কামরুজ্জামান তাপু তাঁদের পথচলার গল্প শুনিয়েছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাঁধনহারার দল

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। তখন নরসিংদীতে জেলা প্রশাসক ছিলেন ওবায়দুল আজম। তিনিই আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন নরসিংদী। জানলাম, তিনি জেলা শহীদ মিনারে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন ২১ ফেব্রুয়ারি। সামনের দিকে কিছু সুবিধাবঞ্চিত ছেলে-মেয়ে বসে ছিল। কিন্তু কর্মকর্তারা তাঁদের তাড়িয়ে দেন। দেখে ডিসি স্যারের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মঞ্চে উঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ যে ছেলে-মেয়েদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের দিয়েই একদিন এই মঞ্চে অনুষ্ঠান করব।

স্যার আমাকে বললেন, ‘ওদের নিয়ে অনুষ্ঠান করতে চাই। আপনি আমাদের সঙ্গে থাকুন। কর্মশালার মাধ্যমে ওদের গড়ে তুলুন।

সামনের ২৬ মার্চ ডেটলাইন। ’ আমি ছেলে-মেয়েদের খুঁজে বেড়াতে থাকলাম। কর্মশালার পরিকল্পনা করতে থাকলাম।

 

৩০০ জন হাজির

ফয়সল আমার সহযোগী। আমরা দুজনই পালাকার নাট্যদলে কাজ করতাম। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে একদিন নরসিংদী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে দেখি, ৩০০ জন ছেলে-মেয়ে হাজির। বয়স পাঁচ থেকে চৌদ্দোর মধ্যে হবে। কেউ দিনমজুরের ছেলে, কারোর বাবা ট্রাক চালায়, কেউ বা টং দোকানদারের মেয়ে। কারোর আবার মা নেই কিংবা বাবা। ডিসি স্যার ও শিল্পকলার ফাল্গুনী আপার সহযোগিতায় আমি আর ফয়সল ৮০ জন বাছাই করলাম।

 

কাজ শুরু হলো

কর্মশালা শুরু করলাম ৯ মার্চ। প্রতিদিন সকালে শুরু করতাম। চলত রাত ৯টা অব্দি। ছেলে-মেয়েগুলোকে হাতে-কলমে অভিনয়, নাচ, গান, থিয়েটার, পাপেট ও মডেলিং শেখাতে লাগলাম। ডিসি স্যার মাঝেমধ্যে আমাদের উত্সাহ দিতে আসতেন। ছেলে-মেয়েগুলো আসলে প্রতিভাবান। কিন্তু দারিদ্র্য ওদের বিকাশের সুযোগ দেয়নি। তবে আমাদের ঘাম ছুটে গিয়েছিল। ওরা একেবারেই আনকোরা, তদুপরি সংকোচও আছে। শেষাবধি টিকে ছিল ৭০ জন। অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হলো এই ৭০ জন দিয়েই। ওদের নিয়ম করে গান শিখিয়েছেন বিটিভির নিবন্ধিত শিল্পী এনামুল হক মুকুল। মডেলিং দেখিয়েছেন মনিকা হাসান চৌধুরী। নাচ শিখিয়েছেন রানা চৌধুরী আর পাপেট শাওন ও সুশান্ত।

 

আলোর পথযাত্রী

২৫ মার্চ কালরাত। ৭০ জন শিশু-কিশোর। হাতে মোমবাতি। ডিসি অফিস প্রাঙ্গণের স্মৃতিসৌধে জড়ো হয়েছিল। সে রাতে ওরাও আলোর পথযাত্রী গেয়েছিল। পরের দিন ২৬ মার্চ জেলা শিল্পকলা একাডেমি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে নাচ, গান ছাড়া তারা ‘যশোর রোড’ পরিবেশন করে। নাটকটি দেখার পর দর্শকরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। এই অনুষ্ঠান দিয়েই আত্মপ্রকাশ করে বাঁধনহারা। তারপর ১৬ ডিসেম্বর ২০১২। বিজয় দিবস। জেলা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বড়সড় মঞ্চ বানানো হয়েছিল। সেখানে টানা পাঁচ দিন ধরে নাচ, গান, পাপেট শো, কোরিওগ্রাফি, মডেলিং, নাটক পরিবেশন করে তাক লাগিয়ে দেয় বাঁধনহারা।

 

এগিয়ে এসেছেন অনেকেই

জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে এগিয়ে এসেছে জেবি গ্রুপ। তাঁরা একটি থিয়েটার ভবন গড়ে দিয়েছে। এখানে রিহার্সাল চলে, দাপ্তরিক কাজকর্মও হয়। তারপর মজিদ মোল্লা ফাউন্ডেশন একটি মাইক্রোবাস দিয়েছে। ছেলে-মেয়েদের চলাচল সহজ হয়েছে।

 

রবি ঠাকুরের সামান্য ক্ষতি

২০১৪ সালে ওবায়দুল আজম পদোন্নতি পেয়ে নরসিংদী ছাড়েন। বাঁধনহারার সদস্যরা তাঁকে বিদায় জানাতে অনুষ্ঠান করেছে, সেই সঙ্গে বরণ করে নিয়েছে নতুন ডিসিকে। আবু হেনা মোরশেদ জামান নতুন ডিসি। শঙ্কায় ছিলাম, আগের গতিতে বাঁধনহারা চলতে পারবে কি না। জামান স্যার একদিন ডেকে বললেন, ভাববেন না, বাঁধনহারাকে হারিয়ে যেতে দেব না। আমি দ্বিগুণ উত্সাহে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামান্য ক্ষতি নিয়ে নাটক বুনতে বসলাম। নাট্য ভাবনা ও নির্মাণ উপদেষ্টা ছিলেন জামান স্যার।

 

বাঁধনহারার উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কক্সবাজার ও পঞ্চগড়ে গিয়েও অনুষ্ঠান করেছে বাঁধনহারার দল। ২০১৪ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিশু নাট্য উৎসবে ‘দৈত্য হলো খেলার সাথী’ এবং ‘যশোর রোড’-এর ১২তম মঞ্চায়ন করে বাঁধনহারা। ২৮ এপ্রিল ইউএনডিপি আয়োজিত বৈশাখী পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে গুলশানের লেকশোর হোটেলে নাটকগুলো আবার পরিবেশন করে বাঁধনহারা। অমর একুশে বইমেলার মঞ্চেও অনুষ্ঠান করেছে বাঁধনহারা। বাংলাদেশ টেলিভিশন বাঁধনহারার দৈত্য হলো খেলার সাথী প্রদর্শন করেছে। এশিয়ান টিভি দেখিয়েছে যশোর রোড।

 

বাঁধনহারা ফুডস

জামান স্যার সঙ্গী করলেন এডিসি (রেভিনিউ) কামাল হোসেনকে। চাইলেন বাঁধনহারার ভিত শক্ত করতে। একটি রেস্তোরাঁ খোলার ব্যবস্থা করলেন। নাম হলো বাঁধনহারা ফুডস। নরসিংদীর এটি একটি মানসম্পন্ন রেস্তোরাঁ। বাঁধনহারার ছেলেমেয়ে আর তাঁদের মা-বাবা এখানে কাজ করেন। সকালে নাশতা, দুপুরের খাবার ছাড়াও স্ন্যাকস, জুস, কফি, কোমল পানীয় ইত্যাদি পাওয়া যায়। ক্যাটারিংয়ের ব্যবস্থাও আছে। এখন বাঁধনহারা ফুডসের দুটি আউটলেট। রেস্তোরাঁ দুটির আয় দিয়েই এখন বাঁধনহারার হয়ে যায়।

 

ওরা কয়েকজন

রিশাদ। পেপার বিক্রি করত। বাবা অন্ধ। গান গেয়ে গেয়ে জীবিকা রোজগার করত। নিতুর গানের গলা ভালো। অভিনয়ও ভালো করে। মা-বাবা কোনোভাবেই নিতুর স্কুলের খরচ জোগাতে পারছিল না। ওর বাবা এখন বাঁধনহারা ফুডসের বাবুর্চি। নিতু প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কারও পেয়েছে। বাবার সঙ্গে পিঠা বিক্রি করত কবির। সংসার টেনেটুনে চলত। এখন কবির পলিটেকনিকের ছাত্র। ঝিনুকের বাবা কোনো কাজ করতেন না। মা একটি কারখানায় শ্রমিক ছিলেন। ঝিনুক এখন অনার্সে পড়ে। পাশাপাশি নরসিংদী কালেক্টরেট পাবলিক স্কুলে সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষকতা করছে। ওর বাবা এখন অটো চালান। বাঁধনহারার নিয়মিত সদস্য ৫০ জন। সদস্যদের কম্পিউটার, সেলাই, গাড়ি চালানো প্রশিক্ষণসহ জীবিকা আহরণের নানা উপায় শেখানো হচ্ছে।

 

বাঁধনহারার আরো প্রযোজনা

হায়েনার হাসি, কাঁঠালগাছের আত্মকথা, এক টুকরো খোলা চিঠি (বাল্যবিবাহবিরোধী), খোকা (বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে), মাদক, ব্রিটিশ ৭১ (পরাধীন বাংলা), আমার স্বাধীনতা (শ্রমজীবী শিশুদের নিয়ে), আমার বন্ধু গাছ (পরিবেশবিষয়ক), খাদক (খাদ্য অপচয়বিষয়ক), জাদুর তুলি, মজার স্কুল, হ-য-ব-র-ল, সংগ্রাম ও মুক্তি, এসিড, বাঁধনহারার রাজ্য, লাল গরু, অবাক জলপান (পাপেট শো), ভাষা, বাঙালি জাগো ইত্যাদি।

 

স্বপ্ন আছে অনেক

‘বাঁধনহারা হতে পারি, ছন্নছাড়া নই, আমাদেরও ইচ্ছে করে ভালো মানুষ হই, সফল মানুষ হই’—এসব স্লোগানে এগিয়ে যাচ্ছে বাঁধনহারা। বাঁধনহারা সংস্কৃতিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়ে যেতে চায়। শিশুদের নাট্যচর্চা সহজ করতে প্রতিষ্ঠা করেছে স্টুডিও থিয়েটার। আগামী দিনে বাঁধনহারা মুক্তমঞ্চ নির্মাণ, রেডিও বাঁধনহারা নামে একটি কমিউনিটি রেডিও এবং একটি অনলাইন টিভি চালু করার স্বপ্ন দেখছে।


মন্তব্য