kalerkantho


ভাষা উদ্ধার অভিযান

রেংমিটচ্য বান্দরবানের আলিকদমের বিলুপ্তপ্রায় এক ভাষা। যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজের অধ্যাপক ডেভিড পিটারসন ভাষাটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে চলেছেন। ইয়াংঙান ম্রো তাঁর দোভাষী ছিলেন। বলেছেন ভাষা উদ্ধার অভিযানের গল্প

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাষা উদ্ধার অভিযান

ছবিটি প্রতীকী। তুলেছেন আরিফুর রহমান।

২০০৭ সাল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে চট্টগ্রামে থাকি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেটের পাশে বিশ্বশান্তি প্যাগোডা নামে বৌদ্ধ হোস্টেল ছিল। উঠেছিলাম সেখানেই। একদিন এক সিনিয়র দাদা আমাকে পানি গরম করে চট্টগ্রাম শহরের এশিয়ান হোটেলে নিয়ে যেতে বললেন। সেখানে এক আমেরিকান ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর নাম ডেভিড পিটারসন। তিনি আমেরিকার ডার্টমাউথ কলেজে শিক্ষকতা করেন। ডেভিড সেদিন আমার সঙ্গে অনেক কথা বলেন। জানলাম, তিনি ম্রো ও খুমি ভাষা নিয়ে কাজ করছেন। ডেভিড আরো জানালেন, ১৯৯৯ সাল থেকে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করছেন তিনি। কাজ করছেন ভাষা নিয়ে। বিশেষ করে যেসব ভাষা হারিয়ে যাওয়ার পথে, সেগুলো সংরক্ষণে কাজ করছেন। তারপর অনেক দিন আর ডেভিডের সঙ্গে দেখা হয়নি।

 

আবার দেখা

২০১৪ সালের দিকে আবারও তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। বান্দরবানে। আমাকে বললেন, লরেন্স জি লোফলার নামের এক জার্মান ভাষাবিদের একটি বই তিনি পেয়েছেন। বইটির নাম ম্রো। ১৯৭০ সালের দিকে লেখা। ওই বই থেকে তিনি রেংমিটচ্য নামের এক ভাষার কথা জেনেছেন। ভাষাটি বিলুপ্তপ্রায়। রেংমিটচ্য ভাষার মানুষ খুঁজতে তিনি আলীকদম গিয়েছিলেন। আমি আগে কোনো দিন রেংমিটচ্য ভাষার কথা শুনিনি। তিনি আমাকে কয়েকটি রেংমিটচ্য শব্দ শোনালেন। যেমন ধানের রেংমিটচ্য শব্দ চবা আর বাড়ি হলো ইম।

রেংমিটচ্য ভাষা ম্রো ভাষা থেকে আলাদা হলেও জাতিতে ম্রো। তবে ভাষাটির সঙ্গে খুমি ভাষার কিছু মিল আছে। এর মধ্যে একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাইরা খান এলেন বান্দরবানে। ডেভিড বান্দরবানেই ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে নিয়ে আমি আলীকদম গেলাম রেংমিটচ্য ভাষাভাষীর মানুষ খুঁজতে। আলীকদম পৌঁছে আমরা ঙুইপংকে পেলাম। ঙুইপংয়ের পূর্বপুরুষ সবাই রেংমিটচ্য ভাষা বলতেন। কিন্তু তিনি নিজে রেংমিটচ্য বলতে পারেন না। আর তাঁর ছেলে-মেয়েরা তো কিছু জানেই না। ঙুইপং আমাদের বললেন, পরের দিন আলীকদমে বাজারের দিন, তাই রেংমিটচ্য লোকেরা বাজার করতে আসবে। আমরা সেবার উঠেছিলাম পানবাজারের একটি এনজিও রেস্ট হাউসে। পরের দিন ডেভিড, নাইরা, ঙুইপং আর আমি আলীকদম বাজারে ঘুরতে বের হলাম। প্রচুর লোক। ডেভিড আমাকে বললেন, ‘রেংমিটচ্য লোকেরা আলীকদমের দুর্গম এলাকা তৈন খালের আশপাশে বাস করে। অন্যান্য এলাকায় থাকতে পারে, তবে তৈন খালের আশপাশেই থাকে বেশি। ’ ডেভিডের কথা সত্য। ডেভিড তৈন খালের কথাও জানতে পেরেছেন ওই লোফলারের বই থেকে। লোফলারের বই আরো বলছে, সত্তরের দশকে আলীকদমে অনেক রেংমিটচ্যভাষী লোক ছিল। বাজার ঘুরতে ঘুরতে ঙুইপং কয়েকজন রেংমিটচ্যভাষী লোককে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করে দিলেন। কেউ কেউ অবশ্য আগে থেকেই ডেভিডকে চিনত। তারা ডেভিডকে খুব সমাদর করল। তাদের সঙ্গে দিনক্ষণ ঠিক করে আমরা বিদায় নিলাম। তারাও নিজ গ্রামে রওনা হলো।

 

ডেভিড খুঁটিনাটি সব লিখে রাখলেন

পরের দিনই আটজন রেংমিটচ্যভাষী আমাদের রেস্ট হাউসে এসে হাজির। তাঁরা হলেন পায়া ম্রো, মাংপুন ম্রো, টিংওয়াই ম্রো, কাইংপা ম্রো, রেংপুন হেডম্যান, কোলেং ম্রো, কুনরাও ম্রো ও আরেক কুনরাও ম্রো। তাঁরা এলে আমরা কথাবার্তা রেকর্ড করতে থাকলাম। রেংমিটচ্য ভাষায় গানও শোনালেন তাঁরা। ডেভিড বেশ কিছু সময় ভিডিও রেকর্ড নিলেন। পরের দিন আমরা কয়েকজন রেংমিটচ্যভাষীকে নিয়ে আলীকদম থেকে বান্দরবান চললাম। সকালে বাবুলদা (আজহারুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্মী) বান্দরবান থেকে জিপ পাঠিয়েছিলেন। আমরা হাইওয়ে রোড দিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হরতালের কারণে যেতে হলো লামা-সুয়ালক রাস্তা ধরে। বান্দরবানে এসে রয়েল হোটেলে উঠলাম। বিকেলে কিছু রেকর্ড করার কথা ছিল, কিন্তু অনেকে কোনো দিন গাড়ি চড়েননি বলে তাঁদের মাথা ধরেছিল। তাই কাজ হলো না। পরের দিন থেকে শুরু হলো ওয়ার্কশপ। তাঁরা রেংমিটচ্য ভাষা বললেন আর আমি তাঁদের কথা ইংরেজিতে অনুবাদ করে ডেভিডকে বুঝিয়ে বললাম। ডেভিড সেগুলো খাতায় লিখলেন। তিনি প্রতিটি অক্ষর খুঁটিনাটি করে ও শব্দ কী রকম তা-ও লিখলেন। একেকটি বাক্য লিখতে কমপক্ষে ১০ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগল। ডেভিড খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে তারপর লিখলেন।

 

যুবক-যুবতীরা লজ্জা পায়

রেংমিটচ্য লোকেরা আমাদের বলল, তাদের ভাষা রেংমিটচ্য নাকি তাদের পূর্বপুরুষের সময়ে অনেক সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু আজ গুটিকয়েক লোক ছাড়া আর কেউ এ ভাষা জানে না। যারা আগে খুব ভালো জানত তারাও না বলতে বলতে ভুলতে বসেছে। বিশেষ করে যুবক-যুবতীরা নিজেদের ভাষায় (রেংমিটচ্য) কথা বলতে নাকি লজ্জাবোধ করে! কারণ অন্য লোকেরা শুনলে হাসাহাসি করে। তাই তারা রেংমিটচ্য বলতে চায় না।

 

ভাষা রক্ষা কমিটি

ডেভিড জানালেন, মিয়ানমারেও নাকি রেংমিটচ্য ভাষায় কথা বলা লোক আছে। ডেভিডের তালিকায় রেংমিটচ্য ভাষা জানা ২২ জন লোকের নাম আছে। তাদের অনেকেই এখন আর জীবিত নেই। তবে বেশ কয়েকজনকেই আমরা খুঁজে বের করতে পেরেছিলাম। ডেভিড প্রায় সময় আমাকে বলতেন, রেংমিটচ্য ভাষা পৃথিবী থেকে শিগগিরই হারিয়ে যাবে। কারণ চর্চা না করলে ভাষা আপনাআপনি হারিয়ে যেতে থাকে। পরে আমরা রেংমিটচ্য লোকদের নিয়ে ভাষা রক্ষা নামে একটি কমিটি করলাম। কমিটির লোকদের কাজ হলো, গ্রামে গ্রামে গিয়ে লোকদের বোঝানো নিজেদের ভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে। ডেভিড অনেক করে বুঝিয়ে বলেছেন, তারা যেন নিজেদের ভাষা রেংমিটচ্যকে ধরে রাখে। কারণ আজকে যারা রেংমিটচ্য পারে তারা যদি মরে যায় তবে পৃথিবীতে আর রেংমিটচ্য ভাষা থাকবে না।

 

কমিটির লোকেরা কথা রেখেছে

ডেভিডের কথা কমিটির লোকেরা বুঝতে পেরেছিল। গুরুত্বও দিয়েছিল। তারা এখন একে অপরের সঙ্গে গ্রামে, পথে অথবা বাজারে দেখা হলে রেংমিটচ্য ভাষায় কথা বলে। তারা বুঝতে পেরেছে মাতৃভাষা হারিয়ে গেলে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। ওয়ার্কশপ করার সময় কিন্তু ঙুইপং নিজে রেংমিটচ্য বুঝতেন না। আফসোস করে বলতেন, পূর্বপুরুষদের ভাষা না বুঝতে পারা বিরাট অপরাধ। এখন কিন্তু তিনি অনেকটাই বুঝতে পারেন। আমার সঙ্গে দেখা হলেও রেমিটচ্য ভাষায় কথা বলেন।

 

মাতৃভাষার গুরুত্ব বুঝলাম

মাতৃভাষায় যখন তারা কথা বলে তখন তাদের কেমন ভালো যে দেখায়, আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। রেংমিটচ্য লোকদের মাতৃভাষায় কথা বলতে দেখে আমার নিজেরও ভালো লাগত। আমি মাতৃভাষার গুরুত্ব বুঝলাম। এখন অনেক রেংমিটচ্য চায় নিজের ভাষায় কথা বলতে, কিন্তু অনেক সময় পরিবেশ পায় না। দোভাষীর কাজ করতে গিয়ে আমি নিজের মাতৃভাষার দিকে নজর দিলাম। কারণ ম্রো ভাষাও আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্রো ছাত্র-ছাত্রীরা আজ মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পর তারা পাঠ্য বইয়ে নিজের ভাষা খুঁজে পায় না। তাই বুঝি লজ্জা বোধ করে। জিজ্ঞেস করলে বলে, এ ভাষা পড়ে চাকরি হয় না। যে ভাষা পড়লে চাকরি হয় সে ভাষা শেখাই ভালো।

 

সুখের কথা

আমরা কয়েকজন মিলে লামা উপজেলায় ডিম পাহাড়ের পাশে ম্রো হোস্টেল চালু করেছি। সেখানে বাংলা, ইংরেজির সঙ্গে ম্রো বর্ণমালায়ও পাঠদান করা হয়। নিজেদের গান, কবিতা, ছড়া, গল্প, ধাঁধা ও নাচ ম্রোরা সেখানে শিখতে পারে। লামা উপজেলায় ২০১৫ সালে আরো তিনটি মাতৃভাষার স্কুল চালু করেছি। জানি না, কত দূর নিয়ে যেতে পারব।

 

ছবি সৌজন্য : লেখক


মন্তব্য