kalerkantho


বাংলাদেশের শিল্পী

হেনা বলে ডাকুন

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হেনা বলে ডাকুন

শাহরিয়া শারমীন

বাংলাদেশ, ভারতসহ আরো কিছু দেশের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন শাহরিয়া। তাদের সাজ-কাজ, হাসি-কান্না, লড়াই-সংগ্রামের সঙ্গী হতে চেয়েছেন।

তাঁর ক্যামেরা সময়গুলো ধরে রাখার উপায় খুঁজেছে। শেষে বলেছেন কিছু গভীর অনুভূতির গল্প। তৈরি হয়েছে ‘কল মি হেনা’। ২০১৪ সালের আলেক্সিয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে এই ফটো সিরিজ। ওই বছরই তিনি মস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফটো অ্যাওয়ার্ড জেতেন। ২০১৫ সালের রেনেসাঁ ফটোগ্রাফি প্রাইজের চূড়ান্ত পর্বে মনোনীত হয় কল মি হেনা। দুই কন্যাসন্তানের জননী শাহরিয়া শারমিন চান তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিবারের দূরত্ব ঘোচাতে। ছবিমেলার অংশ হিসেবে কল মি হেনা প্রদর্শিত হচ্ছে জাতীয় চিত্রশালার ৫ নম্বর গ্যালারিতে। তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে গিয়েছিলেন মো. নাভিদ রেজোয়ান

 

নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন।

অনার্স শেষ করার আগেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। আর মাস্টার্সের রেজাল্ট বেরোনোর আগে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে চাকরি শুরু করি। তিন বছর পর আমার দুই যমজ মেয়ে জন্ম নেয়। দেশের বাইরে চলে যাই তার পর পরই। আমার মেয়েদের বয়স ১১ হলে আমি নিজের প্যাশনের প্রতি মনোযোগী হই। বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে একটি ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সে ভর্তি হই। ছবি তোলা ব্যাপারটি আমার পছন্দ হয়। তবে আমি ফোকাস করতে চাইছিলাম একটি ফ্রেমের ওপর। আর সেটা জানতে পাঠশালায় (সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট) যাই। ছবি তোলার শখ ছিল ছোটবেলা থেকেই। আমার বাবা প্রচুর ছবি তুলতেন।

 

কল মি হেনার কথা বলুন।

পাঠশালায় প্রতি সপ্তাহে কিছু সাপ্তাহিক কাজ জমা দিতাম। ছবি তুলে নিয়ে আসার পর খুটিনাটি অনেক বিষয়ে কথা বলতাম। গার্মেন্টকর্মীদের নিয়ে আমাদের এখানে যত কাজ হয়েছে তার বেশির ভাগই নির্যাতিত-নিপীড়িত নারীকর্মীদের চিত্র। মেয়েরা এখানে পীড়িত সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও। আমি আসলে স্বাধীনতা খুঁজছিলাম। ওরা কি কোনো স্বাধীনতা ভোগ করে না? যদি করে সেটি কেমন। আমি গার্মেন্টে যাই উত্তর খুঁজতে। সময় কাটাতে শুরু করি কর্মীদের সঙ্গে। তৃতীয় দিনের দিন কারখানার একটা ফ্লোরে একজন হিজড়ার (তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ) সঙ্গে দেখা হয়। গল্পও করি। ও ছেলেদের পোশাক পরেছিল, কিন্তু সবাই ওকে জানে ঠিকই। ওর সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বললাম। জানতে চাইলাম, কিভাবে এখানে মানিয়ে নিচ্ছে। আমি পরে ওর বাসায় যাই। আরো কয়েকজন হিজড়াকে পাই। বারবার যেতে থাকি। কিন্তু ছবি তুলি না। আরো কিছুদিন পরে আমি ওদের সাজগোজ, আনন্দ ইত্যাদির ছবি তুললাম। ওরা অনেক রঙিন থাকে, নাচ-গান, হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকে। তামাশা করতে পছন্দ করে। দুই-তিন সপ্তাহ পর ওদের সম্পর্কে আমার ভাবনা বদলাতে থাকল। প্রথমদিকে যা দেখতাম তা-ই তুলতাম। ধীরে ধীরে আমার দেখা গভীর হতে থাকে। আমার ফ্রেমের আকারও বদলে যেতে থাকে। ওদের গল্প শুনতে শুনতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসত। আমার চোখের দেখায় ও ছেলে কিন্তু সে বলছে ও মেয়ে। বিকেল পর্যন্ত ছেলেদের পোশাকে ছিল। বাসায় ফেরার পর মেয়ের পোশাক ধরছে। চেষ্টা করেছি এই অনুভূতি আর সংঘাত নিয়ে কাজ করতে। দীর্ঘ সময় ধরে ছবিগুলো তুলেছি। এই সিরিজটি দেড় বছর করেছি বাংলাদেশে। ছয় মাস ভারতে। আলেক্সিয়া ফাউন্ডেশনের পুরস্কার অনেক সম্মানজনক। সৌভাগ্য যে পুরস্কার আমি পেয়ে যাই। আলেক্সিয়া জেতার পর আমি বৃত্তি পাই। লন্ডনে ছয় মাসের বৃত্তি। আর যে অর্থ সম্মানী পেয়েছি তা খরচ করেছি ভারতের হিজড়াদের কথা জানতে। আমাদের দেশ থেকে অনেক হিজড়া ভারতে চলে যায়। আমার জানতে ইচ্ছা করত কেন ওরা দেশ ছাড়ে। কিছুদিন কলকাতায় আর কিছুদিন দিল্লীতে কাজ করেছি।

 

ওদের সম্পর্কে জানার উপায় কী?

অনেকে আমার কাছে জানতে চেয়েছে, আচ্ছা, ওরা ছেলে, না মেয়ে? সবার আগ্রহ আছে ওদের ঘিরে, কিন্তু জানার তেমন কোনো উপায় নেই। আমাদের  স্কুলগুলোতে, পাঠ্য বইয়ে যদি ওদের সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকত তবে হয়তো ছোটরা ওদের অনেক সহজভাবে নিত। নিজেকেই আমি অনেকবার প্রশ্ন করেছি, কেন আগে ওদের সম্পর্কে জানলাম না? আমি কিন্তু আমার প্রতিটি ছবি আমার মেয়েদের দেখিয়েছি। প্রতিদিনের গল্প তাদের বলেছি। আমার মেয়েদের চিন্তার ধরন অনেকটাই বদলেছে। আমি জোর করিনি; ওরা ওদের মতোই শিখেছে, বুঝেছে। আমার মনে হয় পরিবার এ ব্যাপারে অনেক সাহায্য করতে পারে। যে হিজড়ার বাবা তাঁর সন্তানকে ঘরে বেঁধে রাখছে তাঁকে কি আপনি দোষ দেবেন? সমাজ তাঁকে বাধ্য করেছে এটা করতে। কোন বাবা তাঁর সন্তানকে ভালোবাসেন না? ওই বাবার কত কষ্ট! সন্তানকে তিনি ভালোও বাসতে পারেন না। সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যেতে পারেন না। বেঁধে রাখেন শেকল দিয়ে!

 

 

সামনে কী কাজ?

আমি ওদের পরিবারের কাছে যাব। পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলব, মিশব।   আমি চাই মা-বাবার সঙ্গে ছেলে বা মেয়ের দূরত্ব কমে যাক। আমি তাদের একত্রে ছবি তুলতে চাই। হয়তো তারা কাছে আসার সুযোগ পাবে। ওদের হয়তো অনেক দিন কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ হয়নি। যদি ছবি তোলার মাধ্যমে হয় তো ভালো। হয়তো ভাববে কেন আমরা আগেও একসঙ্গে বসিনি? বাবা যদি একবারের জন্যও সন্তানের হাতটা ধরে তো সন্তান কতই না খুশি হবে।

 

কেন কল মি হেনা?

সারা দিন ও পুরুষের পোশাকে ছিল। বাড়ি ফিরে কাপড় বদলে রাঁধতে বসে যায়। কারণ ওর স্বামী ফিরবে। দিনে সে হাসান নাম নিয়ে থাকে। আমি জানতে চাইলাম, কী নামে ডাকব? আপা আমাকে হেনা নামে ডাকেন। ও কিন্তু বাবার কাছে এই নামেই মানে মেয়ে হিসেবে যেতে চায়। কিন্তু পারছে কই?

 

আর কী ভাবনা?

আমি ওদের সঙ্গে থাকতে চাই। আরো বহুদিন। দেশের বাইরে গেলে ওদের অনেককেই জানিয়ে যাই। ফিরে এসেও ফোন দিই। সম্পর্কটা বন্ধুর মতো বা তার চেয়েও বেশি। আমার গল্পের হেনার বয়স এখন ৫০। যদি হেনার ৮০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকি তবে হয়তো দেখব গল্পটায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন বেশির ভাগ সময় ক্যামেরা ছাড়াই যাই।


মন্তব্য