kalerkantho


আজীবন সম্মাননা

ধরতে চাইতাম বলাকা, পদ্মা

দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাইদা খানম। ছবিমেলা তাঁকে আজীবন সম্মাননা দিচ্ছে এবারের নবম আসরে। তাঁর পথচলার গল্প শুনেছেন আবু সালেহ শফিক। ছবি তুলেছেন লুৎফর রহমান

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ধরতে চাইতাম বলাকা, পদ্মা

সাইদা খানমের জন্ম ১৯৩৭ সালে। পাবনায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও লাইব্রেরি সায়েন্সে এমএ করেছেন। বেগম পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। রানি এলিজাবেথ, মাদার তেরেসা, নীল আর্মস্ট্রংসহ অনেক বিখ্যাত মানুষের ছবি তুলেছেন। তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেন ১৯৫৬ সালে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড কোলন, জার্মানি লাভ করেন ওই বছরই। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে অল ইন্ডিয়া ফটোজার্নালিজম কনফারেন্সে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে ষষ্ঠ এশিয়ান গেমসে বেগম পত্রিকার প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০০২ সালে তিনি বিপিএস (বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি) রজতজয়ন্তী পদক লাভ করেন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে।

 

কোডাক বক্স ক্যামেরা দিয়ে প্রথম ছবি তুলি। কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পাশ দিয়ে দুজন কাবুলিওয়ালা যাচ্ছিল। তাদের ছবি তুলেছিলাম প্রথম। ক্যামেরাটি দিয়েছিলেন কিটি আপা। আমার বোন হামিদা খানমের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। হামিদা আপা তখন লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে কাজ করতেন। দেশ ভাগের আগের কথাই। আমার বয়স ১০ বা তার আশপাশে। কিটি আপার ভালো নাম লুত্ফুন্নেসা চৌধুরী। তিনি কামরুন্নেসা স্কুলের হেডমিসট্রেস হয়েছিলেন। দরবার-এ-জহুরখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী।

 

পাবনায় ছিল শৈশব

দোতলা বাড়ি। পাবনায় নানার বাড়ি অনেক বড় ছিল। নিমগাছ ছিল। পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকত। অনেক কুকুর ছিল, বিড়ালও ছিল কয়েকটি। খরগোশ পালতাম। ছোটবেলা থেকে আমি কল্পনাবিলাসী। পদ্মা আমাকে খুব আকর্ষণ করত। বলাকাদের উড়ে যাওয়া মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। হঠাৎ হঠাৎ ভাবতাম, এসব ধরে রাখা যায় না?

আমার নানার নাম খানবাহাদুর মোহাম্মদ সোলায়মান। মা ছিলেন তাঁর বড় মেয়ে। আমার বাবার সরকারি চাকরি। এদিক-ওদিক ছোটাছুটির কাজ। নানা একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডা. বিধানচন্দ্র রায় দেখে বলেছিলেন হাওয়া বদল করতে হবে। আমরা নানাকে নিয়ে গেলাম বিশাখাপট্টমে। সেখানে আমাদের ভাড়া বাড়িটা এত সুন্দর ছিল, আমার মনে হতো রূপকথার রাজ্য। সমুদ্রের পারে বিকেলে নানাকে নিয়ে বেড়াতে গেলে ঢেউয়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতাম। তারপর রাচিতে ছিলাম। গিরিডিতেও। গিরিডিতে আমরা প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ছিলাম। সেখানকার স্কুলেও পড়েছি। টিলার ওপর ছিল আমাদের  বাড়িটা। পেছনে শালবন। শরতে কাশফুল ফুটত কাছের মাঠে। তবে বড়রা সাপখোপের ভয় দেখাত। একবার আমি প্রকৃতির টানে সত্যি সত্যি বনে ছুটে গিয়েছিলাম। একটা শেয়ালও দেখে ফেলেছিলাম। কে যেন হেডমিসট্রেসের কানে তুলেছিল কথাটা। তিনি আমাকে হাইবেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে চার আনা জরিমানা করেছিলেন।

 

ঢাকায় দেশ ভাগের পর

বকশিবাজারের কাছে একটি ভাড়াবাড়িতে এসে উঠেছিলাম। আমরা চার বোন, তিন ভাই। বড় ভাই আব্দুল আহাদ। সুরকার হিসেবে স্বনামধন্য। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতনে চার বছর শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। মোহরদির (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) সঙ্গে তাঁর ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সমাজ তো তাতে সম্মতি দেয়নি, তাই পরিণতি লাভ করেনি। কিন্তু মোহরদি আমাকে বোনজ্ঞানে স্নেহ করতেন। খুব স্নেহ করতেন। ছোটবেলা থেকেই আমি দুর্বল ছিলাম। বাইরেটা শান্ত দেখাত কিন্তু ভেতরে ছটফটে ছিলাম। প্রকৃতির কাছে চলে যেতে চাইতাম বারবার। আমার ক্যামেরার প্রতি আগ্রহ দেখে হামিদা আপা (মেঝ বোন হামিদা খানম) আমেরিকা থেকে একটি রোলিকড ক্যামেরা এনে দিয়েছিলেন।

 

খালা ছিলেন কবি  

কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা আমার খালা। ১৯৫৬ সালে তিনি আমাকে প্রথম বেগম অফিসে নিয়ে যান। প্রথম ঘরটি পার হওয়ার পর দ্বিতীয় ঘরটিতেই বসতেন নাসিরউদ্দিন সাহেব। খালা তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, ও ভালো ছবি তোলে। বেগমের জন্য ছবি তুলতে পারে। নাসিরউদ্দিন সাহেব খুশি হয়ে বললেন, আপনি বেগমের প্রচ্ছদ তুলবেন আর সভা-সমিতি বা অনুষ্ঠানাদির। কাজটি পেয়ে আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। আমি বেতন পেতাম না। কিন্তু তাঁরা যাতায়াত খরচ, ফিল্ম কেনার টাকা দিত। ওই বেগমেই ছাপা হয়েছিল ভেজা মেয়ের ছবিটা। ছাপা হওয়ার পরে অনেক গণ্ডগোল হয়েছিল। আমি অনেক দিন ধরেই চাইছিলাম, স্নান করে আসা একটি মেয়ের ছবি তুলতে। কিন্তু অন্য কোথাও সম্ভব হচ্ছিল না বলে আমাদেরই বাসার একটি মেয়েকে ছাদে নিয়ে জলে ভিজিয়ে ছবিটি তুলেছিলাম। বেগমে ছাপা হওয়ার পর এলাকার লোক আমাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে। হৈচৈ করতে থাকে। পরে আমার দুলাভাই সামাল দিয়েছিলেন।

 

ঢাকায় দুটি মাত্র স্টুডিও ছিল

একটির নাম ছিল জায়েদী। অন্য স্টুডিওটি ছিল ডাস স্টুডিও। জায়েদী সাহেব আমার কম্পোজিশন পছন্দ করতেন। তিনি আমার জন্য আমেরিকা, জার্মানির ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিন রেখে দিতেন। আর বলতেন, অ্যাপারচার আর এক্সপোজার খেয়াল করো। সেভাবে বলতে গেলে জায়েদী সাহেবই আমার প্রথম ও শেষ শিক্ষক।

 

রানি এসেছিলেন ১৯৬১ সালে

আগে থেকেই খবর চাউর হয়ে গিয়েছিল। আমার রানির ছবি তোলার সাধ জেগেছিল। আমি নূরজাহান বেগমকে গিয়ে বললাম কোনো একটা ব্যবস্থা করা যায় কি না। তিনি বললেন, একটি প্রশংসাপত্র লিখে দিই। তথ্য দপ্তরে দেখালে তারা একটা কিছু ব্যবস্থা করতে পারে। নূরজাহান সুন্দর মানুষ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ সব সময় ছিল। যা হোক, আমি এই অফিস সেই অফিস ঘুরে একটা প্রেস কার্ড জোগাড় করতে পারলাম। এক বিকেলে এলেন রানি। এয়ারপোর্টে আমি দুটি ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলাম। একটা হাইস্পিড আরেকটি সাধারণ। হাইস্পিডে খুব ভালো ছবি ধরা দিয়েছিল। রমনা পার্কে রানির সম্মানে আতশবাজি পোড়ানো হয়েছিল। তাঁর তখন একটি হাসিমাখা ছবি আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

 

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ৩০ বছর

আমার ডাকনাম বাদল। মানিকদা আমাকে বাদল বলেই ডাকতেন। আমি চিত্রালির জন্য ছবি তুলতে যেতাম কলকাতায়। পাহাড়ি স্যান্যাল, উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন অনেকের ছবিই তুলেছি তখন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি। একবার ভাবলাম সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। গেলাম একদিন তাঁর লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে। দুরুদুরু বক্ষ। অত বড় মানুষ, পথের পাঁচালীর নির্মাতা। আমি খুব ভীরু পায়ে তাঁর স্টাডির কাছে গিয়ে দেখি, কিছু লিখছেন। ভাবলাম চলে যাই, বিরক্ত না করি। তখন তিনি খেয়াল করেন, আমাকে ডেকে বসতে বললেন। তারপর আবার লেখায় ডুবে গেলেন। অনেকক্ষণ পর আমার দিকে চাইলেন। মনে হয় পাঁচ মিনিট এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর জানতে চাইলেন, আমি কী জানতে চাই? তখন তিনি সদ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিটি শেষ করেছেন। নিজের লেখা থেকে কালার ফিল্মে। আমি ওই ছবিটি নিয়েই কথা বললাম। তারপর একসময় বললাম, আপনার ছবি তুলি? তিনি খুশি হয়ে সম্মতি দিলেন। তিনি নাকি পরে বলেছিলেন, ওর (আমার) ক্যামেরা ধরা দেখেই বুঝেছিলাম, সে ভালো ছবি তোলে। এ কথাটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বলে আমি মনে করি। মানিকদার সঙ্গে ৩০ বছর আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসতেন। তাঁর শেষ শয্যায় যখন তিনি অনেক ঘনিষ্ঠজনকেও চিনতে পারছিলেন না, তখনো আমাকে দেখে সেই আগের মতোই বলেছিলেন, কেমন আছেন?

 

আলাউদ্দিন খাঁ বলতেন মাইহার চলো

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ঢাকায় এলে বর্ধমান হাউসে (এখনকার বাংলা একাডেমি) এসে উঠতেন। আসর বসত। আমিও যেতাম। আমাকে বলতেন, মাইহার চলো। সরোদ শেখাব। আমি একবার সাহস করে তাঁকে বাসায় খেতে বলেছিলাম। তিনি রাজি হয়ে দিন নির্দিষ্ট করেছিলেন। মাহমুদা খালা ওই দিন সকাল থেকে নানা পদ রেঁধেছিলেন। কিন্তু ওই দিন সারা দিন বৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের বাসার সামনে হাঁটুপানি জমে গিয়েছিল। ফোনও ছিল না। তাঁকে আনতে যাওয়া হয়নি। পর দিন খাবারগুলো সাজিয়ে নিয়ে বর্ধমান হাউসে গিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর সহকারী বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি বিদায় হও। উনি কাল তোমার অপেক্ষায় থেকে থেকে খুব রেগে গেছেন। আমার চোখে পানি চলে এলো। খুব দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেছিলাম আর প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, বিখ্যাত মানুষদের ধারেকাছে আর যাব না। কিন্তু প্রতিজ্ঞা রাখতে পারিনি। পরের বছর গড়ের মাঠে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে তিনি গাইতে এসেছিলেন কলকাতায়। আমি ভাবলাম, কারণটা অন্তত জানিয়ে যাই। গ্রিনরুমে গিয়ে চিরকুট পাঠালে তিনি দ্রুত এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, সেদিনের পর থেকে তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম। তারপর তিনি অসুস্থ হয়ে কলকাতায় যখন চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তখন আমি তাঁর সেবিকা হয়ে গিয়েছিলাম। দুপুরে আমার সঙ্গে খাবার ভাগ করে খেতেন। অন্নপূর্ণা (খাঁ সাহেবের মেয়ে) একবার আমাকে আধা ঘণ্টা সেতার শুনিয়েছিলেন। মনে হয়েছিল স্বর্গ থেকে সুর ভেসে আসছে। কিন্তু শর্ত দিয়েছিলেন, কোনো ছবি তুলতে পারব না।    

 

বঙ্গবন্ধু খুশি হয়েছিলেন

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের কোনো এক জন্মদিনে শেখ সাহেবের কাছে গিয়েছিলাম। সালাম করেছিলাম। কেউ একজন বলেছিল, ও ছবি তোলে। তিনি শুনে খুশি হয়েছিলেন আর দোয়া করেছিলেন। তিনি হাসপাতালে পিতাকে দেখতে গেলে আমিও গিয়েছিলাম সঙ্গে। পিতাকে জড়িয়ে ধরে আছেন বঙ্গবন্ধু—এমন একটি ছবি আমি তুলেছিলাম।

 

সহকর্মীরা খুশি ছিল না

একটা মেয়ে ছবি তুলছে, এটা অন্য পুরুষ আলোকচিত্রীরা সুনজরে দেখত না। তবে সবাই কিন্তু একরকম ছিল না। অবজারভারের একজন ছিলেন, অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। রানি এলিজাবেথের বিদায়বেলায় অনেক লোকের ভিড় জমে গিয়েছিল। একজন সহকর্মী আমাকে আগলে না রাখলে হয়তো মানুষের পায়ের তলে চাপা পড়তাম।

 

নতুনদের জন্য তিনটি পরামর্শ

স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান থাকতে হবে। আলোকচিত্রীকে অনেক ছোটাছুটি করতে হয়, শরীর ভালো না থাকলে চলবে কী করে! যাঁর ছবি তুলতে যাচ্ছেন, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। আপনার কোনো আচরণ যেন তাঁকে আহত না করে। আর যে কাজই করুন আন্তরিকতার সঙ্গে করবেন।


মন্তব্য