kalerkantho


ফেলো

পাথর পাখি

অষ্টম আসর থেকে শুরু হয়েছে ছবিমেলার ফেলো প্রকল্প। উদ্দেশ্য শিল্পের সম্ভাবনা যাচাই। এবারও বিভিন্ন মাধ্যমের ১০ জনকে ফেলো নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁদের কেউ চিত্রশিল্পী, কেউ বা চলচ্চিত্রকার। ঋতু সাত্তার বেশি চেনা অভিনয়শিল্পী হিসেবে। তিনিও ছবিমেলার চলতি আসরে একজন ফেলো। সাজ্জাদ হোসেন গিয়েছিলেন তাঁর ‘এ বার্ড অব স্টোন’ নিয়ে আলাপ করতে

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পাথর পাখি

ঋতুর গ্যালারি। প্রস্তুতিপর্বে ছবিটি তুলেছেন মাসুম সায়ীদ

‘বাংলাদেশের নৃশংস হত্যাকাণ্ড (১৯৭১) অতি দ্রুত রুশদের চেকস্লোভাকিয়া আগ্রাসনের স্মৃতিকে ঢেকে দেয়, আয়েন্দের হত্যা বাংলাদেশের আর্তনাদকে ভাসিয়ে দেয়, সিনাই মরুভূমির যুদ্ধের কারণে আয়েন্দেকে মানুষ ভুলে যায়, কম্বোডিয়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ড সিনাইকে ভুলিয়ে দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি। ততক্ষণে শেষ বিচারে সবাই সব কিছুকে ভুলতে দেয়। ’

       মিলান কুন্ডেরা, দ্য বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং

 

২০১৪ সালে ১৫ কিলোমিটার হেঁটেছিলেন ঋতু সাত্তার। কারণ সে বছর জুলাই মাসে ইসরায়েল নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল ফিলিস্তিনের গাজায়। সাত দিনের এ হত্যাযজ্ঞে ৬০০ বেসামরিক মানুষ মারা গিয়েছিল। কম করেও তিন হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিল। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সারা বিশ্বে। একজন শিল্পী হিসেবে ঋতুও দায় বোধ করেছিলেন। তিনি ১৫ কিলোমিটার হেঁটে ফিলিস্তিনের নিরস্ত্র নারী-পুরুষ-শিশুর সঙ্গে একাত্ম হতে চেয়েছিলেন। তাঁর হাতে ছিল সিংগিং বোল। পায়ের নিচে নুড়ি পাথর।

তিনি প্রশ্ন করতে চেয়েছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্রের আয়ু কত অল্প? ভেবেছেন, আগ্রাসনের সংকট নিয়ে। তাঁর কাছে শান্তি হচ্ছে কল্পনা। স্মৃতির জমিনে যার বসতি। ঋতু হেঁটে হেঁটে স্মৃতি হাতড়ে বেড়িয়েছেন। ঋতু আরো জানতে চেয়েছিলেন, স্মৃতি কি একা এক মানুষের? নাকি অনেক মানুষ একই স্মৃতি লালন করে চলে? ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসনের বয়স ৬৮ হতে চলেছে। নিহত সন্তান কোলে মা অথবা বাবার বুক চাপড়ে কান্না কিংবা সন্তানের মায়ের খোঁজে ধ্বংসস্তূপ সরানোর ছবি তো ওই ৬৮ বছর ধরেই ছাপা হয়ে চলেছে। সে ছবি দেখার অভিজ্ঞতা ছড়িয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কিন্তু থিতু হতে পারছে কই? একই ছবি মানে একই হত্যাযজ্ঞ। মানে বছরের পর বছর। থামছে কই? দুঃখ বা দীর্ঘশ্বাস বা থামাতে না পারার বেদনা কোথায় গিয়ে লুকাচ্ছে? আসলে ঘটনা এত ঘটে যে স্মৃতির তাক উঁচু হয় কেবল।   

কুন্ডেরা যেমন বলছেন, বাংলাদেশকে ভুলিয়ে দিচ্ছে চেকস্লোভাকিয়া। আয়েন্দেকে ভুলিয়ে দিচ্ছে সিনাই মরুভূমি। আবার কম্বোডিয়া ভুলিয়ে দিচ্ছে সিনাইকে। স্মৃতির স্তূপ জমছে। কিন্তু থামছে না হত্যাকাণ্ড। বর্বরতা ফিরে ফিরে আসছে। ঋতু তাই এমন স্মৃতি তৈরি করতে চাইলেন, যার আদল আলাদা। বারবার একই ছবির ভিড়ে যেটি হারিয়ে যায় না। কিন্তু ঋতুও সন্দিহান—আসলেই কি তেমন স্মৃতি তৈরি হলো? ফিলিস্তিন, কম্বোডিয়া বা সিনাইতে যারা মারা গেল তারা অবশেষে ৩০০ বা ৬০০-র মতো একটি সংখ্যা হয়ে রইল। অথবা সংখ্যাও নয়, কেবল ছবি। একটাই ছবি, বারবার, অনেক বছর ধরে।  

নিজেকে একটি সাদা কাপড়ে ঢেকে নিয়ে হেঁটেছিলেন ঋতু। শুরু করেছিলেন ইউএস দূতাবাস থেকে। গিয়ে থেমেছিলেন দৃক গ্যালারিতে। দৃক তখন গাজার মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিল। ঋতু তাঁর এই পরিবেশনাশিল্পের জন্য পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন তাঁদের প্রিয় কোনো বস্তু দান করার জন্য। ১৫ জন তাঁর অনুরোধে সাড়া দেয়। হাঁটা শেষে ঋতু সেগুলো পুড়িয়ে ফেলেন প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করার মতো।

ঋতু দুই বছর পর আবার সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনছেন এবারের ছবিমেলায়। বন্ধু সামিনা লুত্ফা নিত্রার একটি জামা জোগাড় করেছেন, যেটি লুত্ফার মেয়েও গায়ে দিয়েছে। আরেক বন্ধু মুনেম ওয়াসিফের একটি ছবির কিছু অংশ সংরক্ষণ করেছিলেন ঋতু। তারপর শহীদুল আলমের কোমরবন্ধনী, কিছু গোলাপ পাপড়ি ও জল, বন্ধুকে আরেক বন্ধুর দেওয়া উপহার, ফিলিস্তিনি বন্ধুর হাতের লেখায় মাহমুদ দারবিশের টু মাই মাদার কবিতার অংশবিশেষ নিয়ে তৈরি হচ্ছে ঋতুর প্রকল্প ‘এ বার্ড অব স্টোন’। ২০১৪ সালে পোড়ানো প্রিয় বস্তুর ছাইও থাকছে প্রদর্শনীতে।   

ঋতু বলছেন, ওই পরিবেশনাশিল্প শুধু গাজা নয়, যেকোনো হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধেই একটি প্রতিক্রিয়া। গণহত্যা বিভিন্ন রঙে-ঢঙে আজও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় হয়ে চলেছে। প্রকল্পটি সেসবের একটি প্রতিক্রিয়া। হয়তো আবার ভুলে যাওয়া, স্মৃতির তাক আরো উঁচু হওয়া।


মন্তব্য