kalerkantho


ইরানের শিল্পী

গহরের ছবিগুলো

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গহরের ছবিগুলো

গহর বলেন, ‘চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র সবই সৃজনশীল মাধ্যম। আমি আলোকচিত্রে স্বচ্ছন্দ বোধ করি।

’ গহরের কাছে ছবি মানে সময়ের স্বাক্ষর। ঘটনার দলিল। ছবি তুলছেন একযুগ হয়ে গেল। সমাজের মধ্যকার সংঘাত তাঁর আগ্রহের বিষয়, বিশেষ করে আরব সমাজের। নির্দিষ্ট বিষয়কে থিম করে তিনি সিরিজ ছবি তোলেন। সব মিলিয়ে একটিই গল্প বলেন। ফারিয়া মৌ তাঁর শিল্পযাত্রার বয়ান হাজির করেছেন। ছবিমেলার অংশ হিসেবে তাঁর ইরান, আনটাইটেলড সিরিজের ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে ওয়াইজঘাটের বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে

 

 

গহর দাশতি

ইরানে জন্ম ১৯৮০ সালে। ফটোগ্রাফির হাতেখড়ি স্কুলজীবনে।

কলেজে গ্রাফিক ডিজাইন পড়ার সময় ফটোগ্রাফির ওপর কোর্স করেছেন কয়েকটি। চলচ্চিত্রকার হওয়ার পথও খোলা ছিল; কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আলোকচিত্রী হবেন। কলেজে তাই ফিল্মমেকিং মেজর করেননি। ২০০৩ সালে ইরানের তেহরান ইউনিভার্সিটি অব আর্ট থেকে বিএ এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৫ সালে এমএ করেন গহর। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আর্ট ব্রিজ প্রগ্রামে অংশ নেন। ২০১১ সালে ব্রাডফোর্ডে লাইভস অ্যান্ড ওয়ার্কস ইন তেহরান, ইরান নামের একটি বিশেষ প্রকল্পে অংশ নেন। ২০১২ সালে প্যারিসের হোয়াইট প্রজেক্ট গ্যালারিতে এবং বার্লিনের গ্রিম মিউজিয়ামে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়।

 

স্টেটলেস

এখন সময়টাই বুঝি উদ্বাস্তু। রিফিউজি বললে বুঝতে সুবিধা হয়। ভদ্রতা করে রাষ্ট্রহীন, অভিবাসী ইত্যাদিও বলা হয়। এশিয়া, আফ্রিকার অনেক মানুষ এখন রিফিউজি। নিঃস্ব মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাস পড়েছে গহরের ঘাড়ে। তিনি ছুটলেন মানুষগুলোর পেছনে, আসলে বলা ভালো, মানুষগুলোকে নিজেই নিয়ে গেলেন পূর্ব নির্ধারিত লোকেশনে। বুঝতে চাইলেন উদ্বাস্তুরা কিভাবে জীবন কাটায়।

মানুষগুলো যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আরেক যুদ্ধে লাগে। আশ্রয় খোঁজার যুদ্ধ, নিরাপত্তার যুদ্ধ। বলছিলেন, ‘যুদ্ধ বা নির্যাতন তা পৃথিবীর যেখানেই হোক, মানুষের জন্য নিয়ে আসে সীমাহীন কষ্ট। উদ্বাস্তুকে কে দরদ করে? নতুন কোনো জায়গায় সে একটু ভালো জীবনের আশায় ঘুরতেই থাকে। আমি ভেবেছি সম্ভবত আকাশ আর পাহাড়ই ওদের আশ্রয় দিতে পারে। প্রকৃতির চেয়ে উদার তো আর কেউ নেই। ’  গহর স্টেটলেসের ছবি তুলতে মডেলদের নিয়ে যান মরু পাহাড়ে। বিশাল বড় ল্যান্ডস্কেপে তিনি অল্প মানুষকে জায়গা দিয়েছেন। মানুষগুলো বন্দি আছে নিজের ভেতর যেমন, বাইরের জগত্ও তাঁদের সাদরে গ্রহণ করে না। তাই অল্প জায়গায়ই গুটিয়ে থাকে আর আশা করতে থাকে ভালো দিনের। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে স্টেটলেসের প্রথম প্রদর্শনী হয়।  

 

ইরান, আনটাইটেলড

গহরের ২০১৩ সালের প্রকল্প ইরান, আনটাইটেলড। গহর দাশতির ইরানে ভাষা শব্দ দিয়ে তৈরি হয় না, কথা বলে ভঙ্গি। শরীরগুলো এখানে সমবেত হয় কুয়োয় বা বিয়েবাড়িতে। সন্তানহারা মায়েরা কাঁদে কিন্তু শোনা যায় না কিছুই। লোকজন মাদুরের ওপর শুয়ে থাকে, অপেক্ষা করে কিছু একটা ঘটার। একটা দলকে দেখা যায় যাত্রা শুরুর আয়োজন করেছে, কিন্তু আশা নেই তাদের চোখে। শিল্পলেখক মেহরান মোহাজের আরো বলছেন, গহর এমন একটি জায়গা দেখাচ্ছেন, যেটি বিরাট কিন্তু নিষ্ফলা। এখানে জীবন আছে কিন্তু ছন্দ নেই। গহরের এই ছবিগুলো নিজেরা গল্প বলে না, দর্শকদের গল্প বুনতে উত্সাহ দেয়।

 

টুডেজ লাইফ অ্যান্ড ওয়ার

এ প্রকল্পের ছবিগুলো ২০০৮ সালে তুলেছেন গহর। ছোটবেলায় দেখা ঘটনার বিবরণ আছে ছবিগুলোয়। তখন ইরাক আর ইরান যুদ্ধ করছিল। পরিবারের সঙ্গে তিনি ছিলেন এক সীমান্ত এলাকায়। তিনি দেখেছেন যুদ্ধ মানুষকে কিভাবে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। বৃদ্ধ আর শিশুর মধ্যে ফারাক থাকে না তখন। কারণ মৃত্যুভয়ে ভীত থাকে সবাই। এটি গহরের একটি পরিষ্কার যুদ্ধবিরোধী প্রকল্প।

 

মি. শী অ্যান্ড আদারস

২০০৯ সালে ছবিগুলো তুলেছিলেন গহর। মি. শি অ্যান্ড আদারস নামের এই প্রকল্প পোশাকের গল্প বলেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান মেয়েদের তিন রকমের পোশাকে অভ্যস্ত করছে। স্থানভেদে পোশাকগুলো বদলায়। কর্মস্থলে এক রকম, বাসস্থানে আরেক, বিয়েবাড়িতে আরো এক রকম। গহর ভাবছেন, এতে নারীর নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ হারিয়ে যাচ্ছে।

 


মন্তব্য