kalerkantho


কিউরেটর

কেউ প্রশ্ন করে না কেন?

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কেউ প্রশ্ন করে না কেন?

বাফায় গহর দাশতি। প্রস্তুতিপর্বে ছবিটি তুলেছেন তৌকির আহমেদ তানভী

আমি প্রশ্ন করতাম, ছবিটা কী বলতে চাইছে? কেন ছবিটা এই দেয়ালে, ওই দেয়ালে নয় কেন? দেয়ালটা কি ছবি বা স্পেসের অংশ নয়? এমন অনেক অনেক প্রশ্ন। দেখতাম সবার মধ্যেই একটা নির্লিপ্তি। শিল্পী ও দর্শক বা আয়োজক কেউ তেমন কোনো প্রশ্ন তুলছেন না। শিল্পী হয়তো ভাবছেন, আমি এঁকেছি বা তুলেছি, তুমি তোমার মতো বুঝে নাও। আয়োজকও বুঝতে পারছে না শিল্পীর উদ্দেশ্য (ইনটেনশন) কী? মানে তিনি কী বলতে চাইছেন? তাই আয়োজক শিল্পীর ছবি দেয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে।

 

আমি ভাবি, নিশ্চয়ই ইনটেনশন আছে। শিল্পী কিছুই বলতে চান না—এটা তো হতে পারে না। এভাবে অনেক প্রশ্ন করতাম বলেই হয়তো দৃকের শহীদুল আলম (উত্সব পরিচালক, ছবিমেলা) বললেন, তাহলে সালাহউদ্দিন কিছু কাজ কিউরেট (তত্ত্বাবধান) করুক। তো শুরু করলাম। ২০১৫ সালে (ছবিমেলা ৮) চারটি প্রকল্প কিউরেট করেছি। একটা প্রকল্প ছিল খুব ইন্টিমেট (নিবিড় সম্পর্কের)।

রাশিয়ার জানা রোমানোভা ছবিগুলো তুলেছিলেন রাতে। স্বামী-স্ত্রী ঘুমাচ্ছে এবং এ রকম আরো ছবি। আলোকচিত্রী তাঁদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন এমনভাবে যে স্বামী-স্ত্রী হয়তো ভুলেই গেছেন, ঘরে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি আছেন। ছবিগুলো তোলা হয়েছিল ওপর থেকে। আমি শিল্পকলা একাডেমির এমন একটি জায়গা বেছে নিলাম, যেন ছবিগুলো ওপর থেকে দেখার সুযোগ হয় দর্শকের। আর ছবিগুলো রাখলামও খাটের ওপর। প্রদর্শনী কক্ষটি ঘিরে দিয়েছিলাম মোলায়েম সাদা রঙের ফেব্রিক দিয়ে। সব মিলিয়ে চাইলাম একটি নিবিড় পরিবেশ তৈরি করতে এবং চেয়েছিলাম দর্শক আলোকচিত্রীর অবস্থান নিক। দর্শক আলোকচিত্রীর মতো করেই দৃশ্যটি দেখতে পেরেছে আর শিল্পের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে। তারপর আরেকটি প্রকল্প ছিল মিসরের শিল্পী লরা এলটার্নচাওরের। প্রকল্পটি ছিল ক্ষুদ্রঋণে জর্জরিত হয়ে যারা আত্মহত্যা করেছিল, তাদের নিয়ে। ৫০০ টাকা হয়তো আপনার-আমার কাছে কিছু নয়, কিন্তু কারো কারো কাছে জীবনের সমান দাম। জীবন দিয়েই মেটাতে হয়। সমাজের চোখে এরা অনেক ছোট। যারা আত্মহত্যা করেছিল, তাদের পোর্ট্রেট দেখার জন্য তাই আতশ কাচ দেওয়া হয়েছিল। এ মানুষগুলো শুধুই সংখ্যা। পরিচয় নেই, মর্যাদা নেই। তারা বুঝি হাত-পাসর্বস্ব। দেয়ালে যে আলোকচিত্রগুলো ঝোলানো হয়েছিল সেখানে তাদের হাত-পায়ের বলিরেখা বড় বড় করে দেখানো হয়েছিল।

এসবের মধ্য দিয়ে একজন কিউরেটর আসলে কী চান?

কিউরেটর শিল্পীর ইনটেনশনকে বুঝতে সাহায্য করেন দর্শককে। এটাই মুখ্য উদ্দেশ্য। এ জন্য কিউরেটর আলোকসজ্জা, মেঝে বা দেয়াল ব্যবস্থাপনা, স্থান আকৃতি (গোল বা বর্গাকার) ইত্যাদি অনেক বিষয় আমলে নেন। প্রদর্শনীর সময় (দিনের কত ভাগ, রাতের কতক্ষণ), দর্শকসংখ্যা ইত্যাদি বিষয়ও হিসাবে রাখেন। প্রতিদিন ধরা যাক একটি প্রকল্প এক হাজার দর্শক দেখছেন। তখন কিউরেটরকে ঘণ্টাপ্রতি একটি গড় সংখ্যা মাথায় রাখতে হয়। পিক আওয়ার, অফ পিক আওয়ারের কথাও ভাবেন তিনি। এবং সেভাবেই স্থাপনাগুলো স্থাপন করেন। না হলে অনেক দর্শকে ঠোকাঠুকি হয়ে যায়। একটা দ্রষ্টব্য সাধারণভাবে বোঝার জন্যও নির্দিষ্ট দূরত্বের প্রয়োজন হয়।   কিউরেটরের কাজ আসলে শিল্পকে এলিভেট (উন্নতি সাধন) করা। দর্শক ও শিল্পীর মধ্যে সেতু গড়ে দেওয়া। দর্শক যেন শিল্পীর প্রশ্নটাকে ধরতে পারে, প্রয়োজনে আরো প্রশ্ন তুলতে পারে, তা সহজ করে দেন কিউরেটর।

এবার দুটি প্রকল্প কিউরেট করছি। একটি বেলজিয়ান ফটোগ্রাফার থমাস ভনের, অন্যটি ইরানের গহর দাশতির। ভন ছবি তুলেছে ড্রোন দিয়ে। আমেরিকায়। শুনতে পাই, আমেরিকার কাছে পৃথিবীর সব জায়গার ছবি আছে। সেটি মাথায় রেখেই বুঝি ভন আমেরিকার ছবি তুলেছে। তবে কোনো স্পর্শকাতর স্থানের নয়। কোনো ছবি খনন কাজের, কোনোটা বিবাহ অনুষ্ঠানের। কবরস্থানের ছবিও আছে। এই ছবিগুলো আমি দেখাতে চাই দুই ভাবেই। ওপর থেকে এবং আই লেভেল থেকেও। প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে ভনই তুলেছে ছবিগুলো অথচ ভন সেখানে অনুপস্থিত। দর্শককেও আমি একই রকম অংশগ্রহণে নিয়ে যেতে চাইছি। এ জন্য ছবিগুলো বসানো হয়েছে  প্রায় চতুর্ভুজাকার কাঠামোর ওপর।

আর গহর দাশতির প্রকল্পের নাম ইরান, আনটাইটেলড। সারা পৃথিবীতে কত জায়গা খালি পড়ে আছে, অথচ কিছু মানুষ সব সময়ই জায়গাহীন। গহর ছবিগুলোও তুলেছেন বড় বড় ল্যান্ডস্কেপে। গহরের স্টেটলেস সিরিজের একটি ছবি যিশুখ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পর মা মেরির কোলের সেই ছবিটির কথা মনে করিয়ে দেয়। আরেকটি ছবিতে দেখি একটি মরা গাছ টেনে নিয়ে যাচ্ছে দুজন। একে বলতে পারেন দ্য লাস্ট ট্রি অব ডেজার্ট। ইরান, আনটাইটেলডের প্রায় সব ছবিতে দেখবেন অনেকগুলো মানুষ অনেক খালি জায়গা পড়ে থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট স্থানে গাদাগাদি করে আছে। এই প্রদর্শনীটা হচ্ছে পুরান ঢাকার বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে (বাফা)। আমি জায়গাটি ঘুরতে গিয়ে দেখি অনেক উঁচু ভবন চারধারে। আমরা ছবিগুলো খোলা আঙিনায় বিলবোর্ডের মতো করে লাগিয়েছি। বিগার দ্যান লাইফ। জীবনের চেয়ে বড় সব কিছু কিন্তু জীবন কত না ছোট!

হ্যাঁ, আমাদের দেশে প্রদর্শনী কিউরেট বেশি করা হয় না। অথচ আপনি বিশ্বের বড় কোনো মিউজিয়ামে কিউরেটর ছাড়া প্রবেশাধিকার পাবেন না। একবার আমি মোমাতে (মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট) গিয়ে খুব অবাক বনেছিলাম। সেখানে রিচার্ড সারার ভাস্কর্য দেখেছিলাম। ভাস্কর্যগুলো রাখার জন্য আলাদা ওয়্যারহাউস তৈরি করেছিল মোমা। ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে সেগুলো দেখতে হয়। দর্শককে কত আপন অনুভূতি দেয় ভাবতে পারেন? একজন কিউরেটরই এ কাজে শিল্পী আর দর্শককে সাহায্য করতে পারেন। আমি মনে করি, শিল্পী আপন প্রশ্ন তুলে যাবেন আর কিউরেটর প্রশ্নটিকে উসকে দেবেন। এতে সবারই উপকার।   

 

শ্রুতলিখন: আবু সালেহ মো. শফিক


মন্তব্য