kalerkantho


ভারতের শিল্পী

দেহাতি নারী বিবাহযোগ্য মেয়ে, সুপ্রসন্ন দেবী

১৯৫৬ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে জন্ম পুষ্পমালার। বেঙ্গালুরুতেই থাকেন। বেঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে অর্থনীতি, ইংরেজি আর মনস্তত্ত্বে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন। প্রখ্যাত শিল্পী বালান নাম্বিয়ার সাহচর্য পান সে সময়। তারপর তিনি বরোদার মহারাজা সয়াজি রাও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্য বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস (ভারত) লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে ষষ্ঠ ত্রিবার্ষিক প্রদর্শনীতে (ভারত) পান স্বর্ণপদক। ছবিমেলায় তিনি প্রদর্শন করছেন নেটিভ উইমেন অব সাউথ ইন্ডিয়া : ম্যানারস অ্যান্ড কাস্টমস (২০০০-২০০৪)। প্রদর্শিত হচ্ছে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। ই-মেইলে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওমর শরীফ পল্লব

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দেহাতি নারী বিবাহযোগ্য মেয়ে, সুপ্রসন্ন দেবী

দক্ষিণ এশিয়ার নারীপ্রকল্পটি নিয়ে বলুন।

আমি ভাস্কর্য নিয়ে কাজ করতাম। ১৯৯৬ সালে ফটোগ্রাফিও শুরু করি। আমার প্রথম ফটোগ্রাফিক প্রজেক্ট হলো ফ্যান্টম লেডি বা কিসমত। এটি মুম্বাই শহরের একটি মুভি সেটের ফটোস্টোরি। ফ্যান্টম লেডিতে আমিই প্রধান চরিত্র করেছি। কাজটি ধরনে নতুন ছিল। কারণ আগের ফটো ডকুমেন্টারিগুলো ছিল গুরুগম্ভীর। দর্শকরা সেগুলো দেখতও হাই ক্লাস ভেবে নিয়ে। ফ্যান্টম লেডি মানুষ সহজে যোগাযোগ করতে পেরেছিল। এটিতে ফটোগ্রাফি, থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের মেলবন্ধন ঘটেছিল।

আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্রে আমি যেসব কাজ করেছি, বেশির ভাগই অনুদান, রেসিডেন্সি বা কর্মশালা। ফ্যান্টম লেডি যুক্তরাজ্যের বাথ ফেস্টিভ্যাল ট্রাস্টের অনুমোদন পেয়েছে এবং সারা যুক্তরাজ্যে প্রদর্শিত হয়েছে।

১৯৯৯ সালে আমি একটি অন্য রকম প্রকল্প হাতে নিই। একটু উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প। এর জন্য ব্যাঙ্গালুরুভিত্তিক দ্য ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন ফর আর্টসে অনুদানের জন্য আবেদন করি। সঙ্গে নিই ফটোগ্রাফার বন্ধু ক্লেয়ার আর্নিকে। তিনি ব্রিটিশ হলেও ভারতে বড় হয়েছেন এবং ব্যাঙ্গালুরুতেই থাকেন। আমরা দুজনেই পুরনো ছবির স্টুডিও নিয়ে কাজ করতে চাইছিলাম, যেগুলোতে নানা দৃশ্য আঁকা থাকে।   আমরা দক্ষিণ ভারতের নারীদের  ভঙ্গি, পোশাক, সাজসরঞ্জাম (আয়না) ইত্যাদি সংগ্রহ করতে থাকি। তারপর সেগুলো নিয়ে স্টুডিওতে যাই এবং নিজেই চরিত্র হয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই। আমাদের কাছে প্রকল্পটি এথনোগ্রাফিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল। এ প্রকল্পটি করতে গিয়ে অনেক পড়াশোনা ও গবেষণার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আমরা গুগল থেকে বেশি কিছু নিইনি, আসলে কিছুই নিইনি। সব বই, পত্রপত্রিকা, পোস্টকার্ড বা দলিলপত্র ঘেঁটে ঘেঁটে জোগাড় করেছি। প্রকল্পের ছবিগুলোর নাম—দেহাতি নারী, বিবাহযোগ্য মেয়ে, সুপ্রসন্ন দেবী, নিম্নবর্ণের প্রান্তিক নারী, বিনোদনকারী, সম্মোহিনী, রক্তচোষা, জাদুকরি, দেবী মাতা ইত্যাদি।

সেটের নাটকীয়তায় মজা পেয়ে আমরা আরেকটি সিরিজ করি। নাম দ্য পপুলার সিরিজ। স্টুডিওগুলো তাদের কাচের ওপর যেসব ছবি সেঁটে রাখে (পুরাণের চরিত্র বা তারকা) সেগুলো নিয়ে তৈরি হয় সিরিজটি। পথচলতি মানুষই এ প্রকল্পের চরিত্র হয়েছে।

প্রকল্পটির অর্থ সহায়তা ছিল দেড় বছরের জন্য। তবে কাজ আমরা করেছি চার বছর ধরে। আমি ও আর্নি আসলে কিন্তু ঔপনিবেশিক ইতিহাস ফুটিয়ে তুলেছি। আমরা কয়েকটি প্রশ্ন দিয়েছি দর্শকদের—নারীর অবস্থান কোথায়? বর্ণ কী? ভারতীয় আধুনিকতা আসলে কী বস্তু?

 

প্রকল্পটির পেছনের কথা জানতে চাই।

পোশাক নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান, কাঠমিস্ত্রি, তাঁবু নির্মাতা, দর্জি, সিনেমার প্রডাকশন ম্যানেজার, ওয়েল্ডার কাঠ খোদাইকারী—এমন অনেকে কাজ করেছে প্রকল্পটি সফল করতে। সহায়তা নিয়েছি নৃতাত্ত্বিক থেকে শুরু করে থিয়েটারকর্মী পর্যন্ত সবার। আমার স্টুডিও বেঙ্গালুরু শহরের উপকণ্ঠে। আশপাশে খালি জায়গা অনেক। সেট ফেলেছিলাম সেখানেও। প্রতিটি ছবি তুলতে অনেক সময় পার হয়েছে। বহুবার করে শট নেওয়া। একটা হিসাব বলতে পারি, প্রতিটি ছবির জন্য গড়ে তিন মাস কাজ করেছি। রিহার্সালেও অনেক সময় গেছে। অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তি ভুল হয়ে যাচ্ছিল। আমার অনেক বন্ধু অনেকভাবে এ প্রকল্পে সাহায্য করেছেন। তাই বলা ভালো, এটি একটি কমিউনিটি প্রজেক্ট। আমরা চেষ্টা করেছি কাজটি নিখুঁত করতে।  

টোডা (দক্ষিণ ভারতের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী) ইমেজটির কথাই ধরুন। এটি আমরা তৈরি করেছি ১৯ শতকের একটি নৃতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে। পেছনে যে ব্যাকড্রপটি দেওয়া হয়েছে, তা একটি মাপযন্ত্রের অনুকরণে। পোর্টম্যান নামের এক নৃবিজ্ঞানী এটি আবিষ্কার করেছেন। এর প্রতি বর্গের মাপ হয় দুই ইঞ্চি বাই দুই ইঞ্চি। কিন্তু আমাদের যিনি কম্পিউটারে ব্যাকড্রপটি তৈরি করে দিচ্ছিলেন, তিনি মাপ সঠিক রাখতে পারছিলেন না। পরে বালান নাম্বিয়ার একটি সমাধান বলেন। সমুদ্রসৈকতে ব্যবহার করা হয় এমন একটি বড় ছাতা ব্যবহার করে আমরা কাজটি শেষ করেছি। আর  আমার পরনে যে শালটি দেখতে পাচ্ছেন, তার সেলাই-ফোঁড়াইয়ের কাজ আমিই করেছিলাম।

অনেকে জানতে চেয়েছেন, এত খুঁতখুঁত করছ কেন? তাঁরা রবি বর্মার ঘটসহ গ্রামের নারীর দৃশ্যের উদাহরণ দিতেন। আমি বলেছি, রবি বর্মা আদর্শ ভারতীয় নারীর ছবি এঁকেছেন। আমি বাস্তবকে নতুন ভাব দেওয়ার চেষ্টা করছি। একটু ফাঁক পেলেই ভাব উড়ে যাবে।

 

প্রদর্শনের পদ্ধতি কি আলাদা?

জাদুঘরে যেভাবে দ্রষ্টব্য প্রদর্শন করা হয় এ প্রকল্পও তেমনভাবে প্রদর্শিত হয়। ছবিগুলোর সঙ্গে সেট, প্রপস, সাজসরঞ্জামও থাকে। প্রকল্পটিতে নারী সম্পর্কে চলমান সমাজভাবনা পুনর্নির্মিত হয়েছে। সেট, প্রপস এখানে আদি বাস্তবতা আর আমি যেভাবে হাজির হয়েছি, তা তৈরি করা বাস্তবতা।

 

ছবিমেলায় এ প্রকল্প প্রদর্শন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

দক্ষিণ এশিয়ার আলোকচিত্রের প্রধান উৎসব ছবিমেলা। এ প্রকল্প দর্শকদের নতুন ভাবনা জোগায়। আশা করি ঢাকাও খুশি হবে ছবিগুলো দেখে।

 

ঢাকায় আসছেন?

ঢাকায় আমি এবারই প্রথম। আমি খুশি যে যখন আমার ছবি দেখানো হচ্ছে তখন আমি ঢাকায় থাকছি। বাংলাদেশে আমার অনেক বন্ধু। বরোদায় যখন পড়তাম, তখন অনেক বাংলাদেশি বন্ধু পেয়েছি। তাদের সঙ্গে দেখা হবে ভেবে আমি আনন্দিত।   বন্ধুরা বলত, ঢাকার খাবার খুব ভালো।


মন্তব্য