kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শিকড়সন্ধানী

লাভ ইউ ইসায়াহ

প্রথম আমেরিকান আইডল কেলি ক্লার্কসনের জানার আগ্রহ ছিল, কোথায় পেয়েছেন অদম্য হওয়ার সাহস? খুঁজতে খুঁজতে পেলেন নানার দাদা ইসায়াহ রোজকে। কেলির খোঁজযাত্রায় সঙ্গী হয়েছেন মো. নাভিদ রিজোয়ান

২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



লাভ ইউ ইসায়াহ

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইসায়াহ রোজ

হু ডু ইউ থিংক ইউ আর

পূর্বপুরুষ খুঁজে বেড়ানোবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্রের অনুষ্ঠান হু ডু ইউ থিংক ইউ আর। একটি পর্বে সাধারণত একজন টিভি, চলচ্চিত্র বা সংগীত তারকা আর্কাইভ আর উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো ঘুরে ঘুরে তাঁর পূর্বপুরুষদের খুঁজে বেড়ান।

বিবিসি ২০০৪ সালে অনুষ্ঠানটির প্রচার শুরু করে। অনুষ্ঠানটি এতই জনপ্রিয়তা পায় যে আমেরিকার এনবিসি টিভিও একই নামে অনুষ্ঠানটি প্রচার করতে থাকে। এখন টিএলসি এ অনুষ্ঠান করছে। গড়ে ৬০ লাখ দর্শক পায় পূর্বপুরুষ খুঁজে বেড়ানোর এ অনুষ্ঠান। প্রতিটি পর্বের দৈর্ঘ্য ৬০ মিনিট।

কেলি ক্লার্কসন

১৯৮২ সালে টেক্সাসে জন্ম কেলির। মা ইংরেজির শিক্ষক, বাবা প্রকৌশলী। মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে কেলির অর্থকষ্ট শুরু হয়। আপন মনেই গাইতেন। শুনতে পেয়ে একদিন স্কুলের এক শিক্ষক তাঁকে কোরাস দলের সদস্য করে নেন। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পরপরই তিনি চাকরিতে ঢুকে পড়েন। গ্রোসারি স্টোর থেকে শুরু করে শুঁড়িখানা, চিড়িয়াখানায়ও চাকরি করেছেন কেলি। তাঁর ইচ্ছা ছিল, টাকা জমিয়ে একটি গানের অ্যালবাম প্রকাশ করার। এতে সফল হয়ে গানের সিডি বিভিন্ন সংগীত প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠান। কিন্তু বেশির ভাগই ফেরত আসে, অনেকে হয়তো খুলেও দেখেনি। তবে কেলি দমে যাওয়ার মানুষ নন। তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস গিয়ে গীতিকার জেরি গোফিনের সঙ্গে পরিচিত হন। কিন্তু বেশি দিন সান্নিধ্য পাননি, কারণ জেরি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পরে আবার মায়ের কাছে ফিরে যান। ছোট শহরে নতুন কাজ খুঁজে নেন। দিন কাটছিল একভাবে। সময় বদলায় আমেরিকান আইডলের মাধ্যমে। আবেদনপত্র এনে দিয়েছিলেন এক বন্ধু। কেলি প্রতিযোগিতার গুরুত্ব বুঝতে পেরে উঠেপড়ে লেগেছিলেন আইডল হতে। প্রথম আমেরিকান আইডল হয়ে তিনি এক মিলিয়ন ডলার লাভ করেন এবং আরসিএ রেকর্ডের সঙ্গে কাজ করারও সুযোগ পান। তার পর থেকে কেলি গানের জগতে একটি পরিচিত নাম হয়ে ওঠে। বারাক ওবামার দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে গান করেন কেলি।   

আমেরিকার গৃহযুদ্ধ

যুদ্ধের সময়কাল ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫। দাসপ্রথা ঘিরে তৈরি হয়েছিল এ যুদ্ধ। ১৮৬১ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আমেরিকার সাতটি রাজ্য (আলাবামা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, দক্ষিণ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাস) যেগুলোয় দাসদের সংখ্যাধিক্য ছিল, সেগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা দেয়। গঠন করে কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা। এপ্রিল মাসে কনফেডারেটরা ফোর্ট সামটার আক্রমণ করলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীত পক্ষ ইউনিয়ন বা আমেরিকা-উত্তর নামে পরিচিত ছিল। চার বছরের যুদ্ধে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ নিহত হয়। এ যুদ্ধের ফলাফল দাসপ্রথার বিলোপ। উল্লেখ্য, তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্রাহাম লিংকন। তিনি দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন।   

 

কেলির পূর্বপুরুষ

কেলির দাদার দাদার বাবার নাম ছিল হেনরি রোজ। তবে হেনরি সম্পর্কে বেশি জানতে পারেননি কেলি। জানতে পেরেছেন ইসায়াহ রোজ সম্পর্কে। কেলির নানার দাদা ছিলেন ইসায়াহ রোজ। ১৮৪৩ সালে তাঁর জন্ম। মায়ের কাছে থাকা প্রাথমিক সূত্র ধরে কেলি গিয়েছিলেন ওহাইও হিস্টরিক্যাল সোসাইটিতে। সেখানে আমেকাির গৃহযুদ্ধের অনেক নথি সংগৃহীত আছে। ইসায়াহ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই এপ্রিলের ২৩ তারিখে ইউনিয়ন আর্মির পতাকাতলে নাম লেখান। ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে তিনি ডেকাতুরের যুদ্ধে বন্দি হন। কুখ্যাত অ্যান্ডারসনভিলে জেলখানায় তাঁর থাকার জায়গা মেলে। কেলি অ্যান্ডারসনভিলের একজন বন্দির চিঠি খুঁজে পান। তাতে লেখা ছিল : এখানে ঢোকার পর থেকে ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরল, আমার হৃত্স্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। হাড়গোড় আর রক্ত ছড়িয়েছিল চারদিকে। অনেকে হায় হায় রব তুলে বলেছিল, এটাই কি নরক, যার কথা আমরা এত দিন শুনে এসেছি? ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন। জায়গাটা ছিল জলাভূমি। বন্দিদের প্রস্রাব আর পায়খানার গন্ধে বাতাস ভারী ছিল। আসছে গ্রীষ্মের কঠোর তাপের কথা ভেবে আমরা ভীত হয়ে পড়েছিলাম।

ভাগ্য ভালো যে ইসায়াহ অ্যান্ডারসনভিলে থেকে এক বছরের মাথায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু ইউনিয়ন আর্মি ভুল বুঝেছিল। ভেবেছিল, সে বুঝি কনফেডারেট। গুলি চালিয়েছিল তাঁকে দেখে। পায়ে বিঁধেছিল গুলি। বাকি জীবন ওই গুলির কষ্ট তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। ১৮৮৪ সালে ইসায়াহ ওহাইওর মেরিয়েটা শহরের শেরিফ নির্বাচিত হন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সরকারি অফিস আসলে সাধারণ মানুষের অফিস। ১৯০৫ সালের দিকে তিনি ওহাইওর সিনেটর হন। ইসায়াহ শুঁড়িখানা (সেলুন) উচ্ছেদ করার বিল এনেছিলেন। কারণ সেলুনগুলো গরিব মানুষদের আরো গরিব করে তুলত। ১৯০৮ সালে ইসায়াহর আনীত শুঁড়িখানা বিলটি পাস হয়েছিল। পরেরবার ওই মদ ব্যবসায়ীদের বিরোধিতার কারণেই তিনি আর সিনেটর নির্বাচিত হতে পারেননি। মাত্র ৩২ ভোটে হেরে গিয়েছিলেন।   ইসায়াহ বিয়ে করেছিলেন মেলিসা ইলেন ক্রক্সকে। তাঁদের সাতজন সন্তান ছিল। ১৯১৬ সালের থ্যাংকসগিভিং ডেতে মারা যান ইসায়াহ। কেলি খুশি হয়েছিলেন জেনে, ইসায়াহ তাঁর পুরো জীবন নীতিতে অটল ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ লাঘবে কাজ করে গেছেন। ইসায়াহর ব্যবহৃত ডেস্কটিও খুঁজে পান কেলি এবং বসার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত হন। কেলি ইসায়াহর কবরে গিয়ে প্রার্থনা করেন। কেলি তাঁর পূর্বপুরুষদের খোঁজ জানতে উৎসাহী ছিলেন এটা জানার জন্য—তাঁর নিজের মধ্যে হেরে গিয়েও হারিয়ে না যাওয়ার শক্তি এলো কোথা থেকে? কোথায় পেলেন এই মন্ত্র, একবার না পারিলে দেখো শতবার।


মন্তব্য