kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সেই সময়

হেজাজের ট্রেন

সৌদি আরবের পশ্চিম অংশ হেজাজ। তুরস্কের অটোমান শাসকরা দীর্ঘ রেলপথ গড়ে তুলেছিলেন হেজাজ অঞ্চলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ মিলিটারি অফিসার টি ই লরেন্সের নেতৃত্বে আরব গেরিলারা ধ্বংস করে দেয় পথটি। পর্যটকদের কেউ কেউ লরেন্সের পথ ধরে হাঁটতে ভালোবাসেন এখনো। শিমুল খালেদ জানাচ্ছেন আরো অনেকটা

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হেজাজের ট্রেন

সিরিয়ার দামেস্ক থেকে সৌদি আরবের মদিনা পর্যন্ত এই রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার ৩২০ কিলোমিটার। অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের (১৮৪২-১৯১৮) সময়ে এটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

এর শেষটা ধরা হয়েছিল মক্কা পর্যন্ত, তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে। তখন মিদিয়ান, নাফুদ আর হেজাজের পাহাড় মিলিয়ে যাত্রাটি ছিল কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। এই রেলপথ সময় কমিয়ে আনতে চাইল ১২০ ঘণ্টার। অটোমান শাসক আসলে চাইছিলেন সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুলের সঙ্গে মক্কাকে জুড়ে নিতে। যেন দূরতম অঞ্চলটিও সহজে তদারকি করা যায়। ব্রিটিশরা তখন আশপাশে ঘোট পাকাচ্ছিল। অতএব ব্রিটিশ ঠেকানোর ব্যাপারটিও রেলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। মদিনা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ শেষ হয়ে গিয়েছিল ১৯০৮ সালেই। এরপর আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। রেলপথ মদিনা থেকে আর এগোয়নি। পরে যখন ব্রিটিশদের সঙ্গী করে আরবরা খেপে ওঠে, তখন রেলপথটিই হয়ে ওঠে গেরিলাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু। ১৯৬০ সালে রেলপথটি সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কথা ভাবা হয়। কিন্তু ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয় রেলপথটি।

 

পথটি ভিড় বাড়িয়েছিল

রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ইরান, ইরাকসহ আরো সব দেশ থেকে অনেক যাত্রী দামেস্কে এসে জড়ো হচ্ছিল। ১৯১২ সালে এ পথে ভ্রমণ করেছিল মাত্র ৩০ হাজার যাত্রী। দুই বছর পর ১৯১৪ সালেই সংখ্যাটি তিন লাখ ছাড়ায়। ফলে মরু পথে নিয়ন্ত্রণ হারায় বেদুইনরা। তীর্থযাত্রীদের মক্কা পৌঁছে দেওয়া বাবদ তাদের আয় মন্দ ছিল না। কিন্তু রেলপথটি ৪০ দিনকে মাত্র চার দিনে নামিয়ে আনল।

 

বিদ্রোহ শুরু হলে পরে

তিন বছর ছিল তুঙ্গ বিদ্রোহকাল। ১৯১৬ সালে শুরু হয়েছিল। তুর্কি বাহিনী পথটি ব্যবহার করত সৈন্য ও রসদ বহনের কাজে। আরব গেরিলারা উপর্যুপরি হামলা চালাতে থাকে। একবার তারা একটি ধাবমান লোকোমোটিভ রেললাইনসহ উড়িয়ে দেয়। লরেন্সের বুদ্ধিতে তারা বহু রেলব্রিজ উড়িয়ে দিতেও সমর্থ হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে না হতেই অকার্যকর হয়ে যায় রেলপথটি। তারপর টুকরো টুকরো চেষ্টাচরিত হয়েছে; কিন্তু ফল মেলেনি ভালো।

 

তবে এখনো আছে কিছু বাকি

জর্দানের আম্মান থেকে সিরিয়ার দামেস্ক পর্যন্ত চালু থাকা রেলপথটি কিন্তু ওই হেজাজ রেলপথেরই অংশ। জর্দানের মাআন শহরের ফসফেট খনি থেকে আকাবা পর্যন্ত রেলপথটিও হেজাজ পথেরই সম্প্রসারণ। এ পথে সেসব দিনের কিছু বগি আর ইঞ্জিন এখনো চলে। চালু থাকা সবচেয়ে পুরনো ইঞ্জিনটি তৈরি হয়েছিল জার্মানিতে ১৯১৮ সালে।

 

পড়ে থাকা সময়

মদিনার আলুলায় অনেকেই যান হেজাজ রেলের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে। পরিত্যক্ত রেলস্টেশন আছে, আছে ইঞ্জিন মেরামত ভবন, মরচে পড়া ইঞ্জিন ইত্যাদি।

 

টমাস এডওয়ার্ড লরেন্স

(১৮৮৮-১৯৩৫)

অক্সফোর্ডের জেসাস কলেজে লরেন্স ইতিহাস পড়েছিলেন তিন বছর। ১৯১০ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে কোনো একসময়ে তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে সিরিয়ার কর্কমিশে যান। বাইবেলে বর্ণিত আছে, এখানে ব্যাবিলনিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল মিসরিদের। পরে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে তিনি ব্রিটিশ আর্মিতে যোগ দেন। তাঁর প্রথম পোস্টিং হয় মিসরে। তারপর ১৯১৬ সালে তাঁকে পাঠানো হয় আরবে। সৌদী আমির ফয়সালের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন দ্রুতই। অটোমান শাসকদের বিরুদ্ধে আরব গেরিলাদের সংঘবদ্ধ করেন লরেন্স এবং ১৯১৮ সালে দামেস্ক দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধের পরেও ১৯২২ সাল পর্যন্ত আমির ফয়সাল আর ব্রিটিশদের মধ্যকার যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন লরেন্স। পরে তিনি আরব বিদ্রোহ নিয়ে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘সেভেন পিলারস অব উইজডম’ রচনা করেন। তাঁর আরব বিদ্রোহকালীন দিনপঞ্জি এমন :

৩ জানুয়ারি ১৯১৭ : হেজাজের একটি অটোমান আউটপোস্টে আক্রমণ

মার্চ ১৯১৭ : আবা এল নাআমের রেলপথ আক্রমণ।

১১ জুন ১৯১৭ : রাস বাআলবেকের সেতু আক্রমণ।

২ জুলাই ১৯১৭ : আকাবার একটি আউটপোস্টে অটোমান শক্তির পরাজয়।

১৮ সেপ্টেম্বর ১৯১৭ : মুদাওয়ারার কাছের রেলপথ আক্রমণ।

২৭ সেপ্টেম্বর ১৯১৭ : রেলপথ আক্রমণ এবং একটি ইঞ্জিন ধ্বংস।

৭ নভেম্বর ১৯১৭ : দেরা ও আম্মানের মধ্যকার রেলপথে একটি ট্রেন উড়িয়ে দেওয়া।

২৩ জানুয়ারি ১৯১৮ : ডেড সির দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল তাফিলে হতে যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পারদর্শিতার স্বীকৃতিস্বরূপ লরেন্স লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন।

মার্চ ১৯১৮ : আকাবার কাছের একটি রেলপথ আক্রমণ

১৯ এপ্রিল ১৯১৮ : তেল শাহমের যুদ্ধ

২৬ সেপ্টেম্বর : তাফাসে অটোমান ও জার্মান বাহিনীকে ধাওয়া 

 

লরেন্স অব আরাবিয়া

টি ই লরেন্সের অভিযান নিয়ে পরিচালক ডেভিড লিন ১৯৬২ সালে ‘লরেন্স অব আরাবিয়া’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ছবিটি ১৯৬৩ সালে সাতটি অস্কার জিতে নেয়। পিটার ওটুল ছবিতে লরেন্সের চরিত্রে অভিনয় করেন।


মন্তব্য