kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলার সুরভি

আতরগ্রাম সুজানগর

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর আগর-আতরের জন্য বিখ্যাত। বিদেশও পাড়ি দেয় এই সুগন্ধি। বড়লেখা থেকে জানাচ্ছেন জাভেদ ইসলাম

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আতরগ্রাম সুজানগর

ছোট-বড় পাহাড়, জঙ্গল বা টিলা—সবখানে গাছ আর গাছ। আর সবখানেই যে আগরগাছ।

সুজানগরের এমনই চেহারা। এখানে এখনো মাঝেমধ্যে শত বছরের পুরনো আগরগাছ পাওয়া যায়। এখানকার অনেকেই এখন এর চাষ ও বিক্রি করেন। আগরগাছ শনাক্তকারীকে স্থানীয় ভাষায় তাঁকে বলে ‘দৌড়াল’। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম দুভাবে আগর কাঠ সংগ্রহ করা যায়। প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ করা আগরগাছ কেটে তার মধ্য থেকে এক ধরনের কালো রঙের কাঠ পাওয়া যায়, স্থানীয় ভাষায় এটাই আগর কাঠ বা মাল। কালো এই আগর কাঠ কেজি হিসেবে চড়া দামে বিক্রি হয়। তবে প্রাকৃতিকভাবে বড় হওয়া সব আগরগাছে মূল্যবান কালো আগর কাঠ পাওয়া যায় না। আর যেটি পাওয়া যায়, তার দাম ও গুণগত মান বেশি।

এখন বেশির ভাগ আগর কাঠ সংগ্রহ করা হয় কৃত্রিমভাবে। এর জন্য আগরচাষি বা ব্যবসায়ীরা পাঁচ-সাত বছর বয়সী আগরগাছের চারপাশে নিচ থেকে মাথা পর্যন্ত লোহা বা গজাল পুঁতে দেন। তিন-চার বছর বা তারও বেশি সময় পর সেই আগরগাছ কেটে ফেলা হয়। লোহা বা গজাল পোঁতার ফলে আগরগাছে লোহা বা গজালের চারপাশে এক ধরনের ফাংগাস তৈরি হয়। আর এই ফাংগাসের ফলেই আগরগাছে কৃত্রিম উপায়ে আগর কাঠ তৈরি হয়।

আগরের চারা বেশি রোপণ করা হয় বর্ষাকালে। আগরগাছ থেকে বিচি সংগ্রহ করে চারা উত্পাদন করা হয়। ১২-১৪ বছরের আগরগাছেই আগরের বিচি পাওয়া যায়। বিচি রোপণের সাত দিনের মাথায় অঙ্কুরিত হয়। এখন নার্সারি থেকেও চারা সংগ্রহ করেন আগর ব্যবসায়ীরা। নার্সারিতে তিন থেকে পাঁচ ফুটের একটি গাছ বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ টাকায়। পূর্ণাঙ্গ একটি আগরগাছের গোড়ার প্রস্থ দুই থেকে ২০ ফুট পর্যন্তও হয়ে থাকে।

মোটামুটি ছয় থেকে আট বছরের একটি আগরগাছ বর্তমান বাজারে বিক্রি হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায়। আর এই আগরগাছ বড় করতে ব্যয় হয় গড়ে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। সুজানগরসহ বড়লেখায় আগরের বাগান রয়েছে ছোট-বড় প্রায় ৫০০টি এবং আগরের নার্সারি আছে ২০-২৫টি। এ ছাড়া এখানকার প্রতিটি বাড়ির আশপাশেও রয়েছে আগরগাছ। এ অঞ্চলে তেমন কোনো ফাঁকা জায়গা নেই, প্রায় সব জায়গা দখল করে আছে আগরগাছ। বড়লেখা উপজেলার দেখাদেখি এখন এর আশপাশে এবং সিলেটের অন্যান্য জায়গায় আগরগাছের চাষ শুরু হয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও আগরের বনায়ন শুরু হয়েছে।

পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিচালিত হয় আগর-আতরশিল্প। বাড়ির কম-বেশি সবাই এ শিল্পের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত থাকে। এ ছাড়া এ শিল্পের সঙ্গে কাজ করেন অনেক শ্রমিক। এখানকার প্রায় প্রতিটি আগর-আতরশিল্পের বাড়িতে সব সময় পাঁচ থেকে ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন। আগর শ্রমিকদের বলা হয় মালকামলা। শ্রমিকরা আগরগাছ কাটা, গাছ থেকে কালো আগর কাঠ বের করা, সাদা আগর কাঠের ছোট ছোট চিপস বানানো, সেগুলো জ্বালানো, বের করাসহ নানা কাজ করে থাকেন।

একসময় আগর-আতর কিনতে বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন এই সুজানগরে। আঠারো শতকে আরব ব্যবসায়ীরা কলকাতা ও সুজানগরে আসতেন নিয়মিত। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকেও চিঠি ও টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে সুজানগরের ব্যবসায়ীদের কাছে আগর-আতরের অর্ডার আসত। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আগর ব্যবসা বন্ধ করার চেষ্টা করে। তখন অনেক আগরের ডিপো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ও আগর ব্যবসা বাধা পায়। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আগর-আতর ব্যবসায় কিছুটা জৌলুস আসে। তারও আগে কলকাতা ও মুম্বাইয়ে বসত আগর-আতরের উপমহাদেশের বড় পাইকারি বাজার। বর্তমানে সুজানগরে কিছু ব্যবসায়ী আছেন, যাঁরা এখানকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে আগর-আতর কেনেন এবং একত্র করে বিদেশে রপ্তানি করেন। সুজানগরের আগর-আতর সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মরক্কো, কম্বোডিয়া, লাওস, ভারত, মিয়ানমারসহ আরো কিছু দেশে যায়।

আগর-আতর বিক্রির জন্য সুজানগরে হাট বা বাজার বসে না। নির্দিষ্ট দোকানপাট বা মোকামও নেই। তবে ঠিকই আগর-আতরের হাট বসে সিঙ্গাপুরের কাকুবুকিতে। এটাই এখন বিশ্বের বড় আগর-আতরের পাইকারি বাজার। বিশ্বের বড় বড় আগর-আতর ব্যবসায়ীরা এখানে মিলিত হন আগর-আতর কেনার জন্য। এই হাটে যাঁরা কেনাবেচা করেন, তাঁদের বেশির ভাগ আবার সিলেট অঞ্চলের।

 

আতর তৈরি

আগরগাছ কাটার পর প্রথমে তা থেকে কালো আগরকাঠ সংগ্রহ করা হয়। বাকি কাঠ কেটে ছোট ছোট করে চিপস বানানো হয়। তারপর সেই চিপস বড় পাত্রে বা বিশেষ কূপে ভিজিয়ে রাখা হয়। আট থেকে ১০ দিন ভেজানোর পর তা বড় ডেক বা ডিস্টিলিং প্লান্টে আগুনের তাপ দিয়ে জ্বালানো হয়। জ্বালানোর সময় ডেক বা ডিস্টিলিং প্লান্টের মুখ বন্ধ রাখা হয়। এ ছাড়া জ্বালানোর জন্য যে পরিমাণ কাঠ থাকে, তার চেয়ে একটু বেশি পানি দেওয়া হয়। পাঁচ থেকে সাত দিন পানিতে জ্বালানো অবস্থায় এই চিপস থেকে ডেকচি বা ডিস্টিলিং প্লান্টের নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে আতরের নির্যাস এসে জমা হয় বিশেষ পাত্র বা বোতলে। পাঁচ থেকে সাত দিন জ্বালানোর পর ডেকচিতে তাপ দেওয়া বন্ধ করে চিপসগুলো বাইরে রোদে শুকানো হয়। শুকানো চিপস বা আগরকাঠগুলোকে আবার গুঁড়ো করে তৈরি করা হয় আগরবাতিসহ সুগন্ধিজাতীয় বিভিন্ন জিনিস।

কালো কাঠ থেকে যে আগর সংগ্রহ করা হয়, তার প্রতি তোলার দাম মানভেদে এক হাজার ২৫০ থেকে ছয় হাজার ২৫০ টাকা। রপ্তানির জন্য প্রতি কেজি বিক্রি হয় এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকায়। কাঠ থেকে তৈরি আতর প্রতি তোলা ছয় থেকে আট হাজার টাকা। রপ্তানির জন্য প্রতি লিটার বিক্রি হয় মানভেদে দুই লাখ থেকে চার লাখ টাকায়। প্রাকৃতিকভাবে উত্পন্ন প্রতি তোলা আতরের দাম এক লাখ টাকা পর্যন্ত হয়।


মন্তব্য