kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফেসবুক থেকে পাওয়া

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ফেসবুক থেকে পাওয়া

রাজশাহী আসার সময় পা হারাল শাহেদ

আমার ফ্যামিলির সঙ্গে আজ প্রায় চার বছর আমার কোনো যোগাযোগ নেই। কারণ আমি তাদের পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করেছি! কী, কিছু বুঝতে পারছেন না? আচ্ছা খুলেই বলি।

২০০৮ সাল। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে পারিবারিকভাবে আমার বিয়ের জন্য একটা ছেলে দেখা হয়। নাম শাহেদ, ঢাকায় ব্যবসা করে। যা-ই হোক, একদিন বিকেলবেলা আমাদের বাসায় শাহেদ, তার মা-বাবা, দুলাভাইসহ বেশ কিছু মেহমান এলো। শাড়ি পরিয়ে আমাকে তাদের সামনে আনা হলো। পাত্রী দেখতে এলে যা হয় আর কি, বর্ণনা দেওয়ার কিছু নেই। অবশেষে আমার হাতে ছয়টি ৫০০ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে শাহেদের আম্মা আমাকে বিদায় দিলেন। মেয়ে তাঁদের পছন্দ হয়েছে। অবশেষে কথাবার্তা। আমি তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। যেহেতু শাহেদ বিসিএস করা ছিল, তাই তার ইচ্ছা ছিল তার বউ ন্যূনতম অনার্স পাস  হোক। সবার সম্মতিক্রমে বিয়ে দুই বছর পেছানো হলো। এরই মধ্যে শাহেদের সঙ্গে আমার আলাপচারিতা শুরু হয়ে গেল। জানো নিধি,  তোমাকে আমার কেন এত পছন্দ হয়েছে? না তো, কেন? তোমার ওই গজদাঁতটার কারণে। জানো, তুমি যখন হাসো তখন ওই দাঁতটা তোমার সৌন্দর্য আরো হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়। ও, তাই? শাহেদের সঙ্গে আমার কথা বলতে ভালোই লাগত। এক বছরের মাথায় আমাদের আর পায় কে? গভীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি দুজন। শাহেদ মাঝেমধ্যে ঢাকা থেকে রাজশাহী আসত আমার সঙ্গে দেখা করতে। ২০১০ সালের এপ্রিলের ১৯ তারিখ রাজশাহী আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারায় শাহেদ। আমার পরিবার থেকে সরাসরি আমাদের বিয়ের বিষয়টি মানা করে দেওয়া হলো। শাহেদও আমাকে ফোন করে বলেছিল যে নিধি, যদি তুমি চাও তবে সরে যেতে পারো, বিশ্বাস করো, আমি একটুও কষ্ট পাব না। আমার ফাইনাল পরীক্ষার আগ পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস শাহেদের সঙ্গে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। সেও আমাকে ফোন করেনি। ভেবেছিলাম,  যে ছেলে এক মিনিট আমার সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারত না, সে ছয় মাস কেমনে আছে?

যা হোক, ডিসেম্বরের ৪ তারিখ আমার পরীক্ষা  শেষ হলো। সেদিন বিকেলেই আমি সরাসরি শাহেদের বাসায় গিয়ে উঠলাম। সে তখন একটা ছবি আঁকছিল, গজদাঁতওয়ালা একটা মেয়ের মুখ। মুখটা যে নিধি ছাড়া আর কারোর নয়, তা বুঝতে আমার সময় লাগল না। আজ চার বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমাদের বিয়েটা আমার পরিবার আজও মেনে নেয়নি।

 

আমি তুই আরে তোরা, ৯ মে ২০১৬

 

দুটি ছলছলে বৃদ্ধ চোখ

ঠুক ঠুক করে লাঠিতে ভর দিয়ে রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে এক বৃদ্ধ। জোব্বা, পাগড়ি পরিহিত নূরানি চেহারা। বয়স নব্বইয়ের ওপর হবে। এলাকায় আগেও কয়েকবার দেখেছি। কেন যেন মনে হলো, তাঁর একটু খোঁজখবর নেওয়া দরকার। —‘আসসালামু আলাইকুম। দাদু কি বাসায় যাচ্ছেন?’—‘হ্যাঁ, দাদাভাই...। ’ আমি গিয়ে তাঁর হাতটি ধরে বললাম, ‘চলেন, আপনাকে বাসায় দিয়ে আসি। ’ বলার সঙ্গে সঙ্গে শক্ত করে আমার হাত ধরলেন তিনি। এমন শক্ত করে যে মনে হচ্ছিল, হাত আমি কখনো ছাড়িয়ে নিতে পারব না। মসজিদ থেকে তাঁর বাসা দু-তিন মিনিটের রাস্তা। বাসায় যেতে যেতে অনেক কথা বললেন। ’ খুবই অস্পষ্ট স্বর। আমাকে খুব মনোযোগ সহকারে তাঁর কথাগুলো শুনতে হয়েছিল। দু-তিন মিনিটে তিনি যা বললেন তার মূল কথা হচ্ছে—‘ছেলে, ছেলের বউ বিদেশে থাকে, এখানে এক নাতনির বাসায় থাকেন। ’ কিছুটা অভিমান নিয়ে তাঁর দিনগুলো কেমন করে যেন পার হয়ে যাচ্ছে। অনেক বয়স হয়েছে, মৃত্যু পর্যন্ত বাকিটা সময় সবার আদর-যত্ন, ভালোবাসা পেয়ে কাটিয়ে দিতে চান। এবার বিদায়ের পালা। তিনি আমার হাতটা কিছুক্ষণ ধরে রাখলেন। তারপর বললেন, ‘দাদুভাই, তোমাকে অনেক কষ্ট দিলাম। রাস্তা দেখে-শুনে যেয়ো। সব সময় মা-বাবাকে ভালোবেসো। আসসালামু আলাইকুম। ’ সালামের জবাব দিয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকলাম শহরের  কোলাহলে, বুঝতে পারছিলাম, আমার দিকে তাকিয়ে আছে দুটি ছলছলে বৃদ্ধ চোখ...

মাজহারুল ইসলাম মিয়াজী, ঢাকা সেনানিবাস


মন্তব্য