kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাঙালির বিশ্ব দর্শন

মধ্যযুগের এক বিকেলে

তারেক অণু   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মধ্যযুগের এক বিকেলে

গরমে তিতিবিরক্ত হয়ে কফি পান করতে দেখলাম একজন ভাইকিং দেবতাকে

শিকলের ঝনঝন, তলোয়ারের ঠোকাঠুকি, ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি—শুনেই মন চলে গেল অনেক দিন আগের কোনো এক দিনে। তারপর চকচকে শিরস্ত্রাণে রোদের ঝলকানি, কামারের আগুন, সারি সারি তাঁবু আর কয়েকজন তীরন্দাজ দেখে সত্যি মনে হলো, চলে এসেছি মধ্যযুগে।

যে লোকটা রবিনহুড সেজেছে, তাকে ঘিরে অনেক ভিড়। যে গাছটার নিচে সে দাঁড়িয়ে আছে, তার গায়ে লটকানো কয়েকজন আসামির ছবি।

একটু পর ঘোড়ার পিঠে চাপানো জমকালো জিনে সওয়ার হয়ে এলেন চার অশ্বারোহী। চারজন আবার চারটি আলাদা জাতির প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁদের গায়ে ক্রুসেডের সময়কার পোশাক। মেলা প্রাঙ্গণে আরো আছেন আরব মুসলিম, ব্রিটিশ নাইট, ক্যাথলিক স্প্যানিশ। আছে নাম না-জানা ভবঘুরেও। পবিত্র ভূমির জন্য তার কোনো মায়া আছে বলে মনে হয় না, যুদ্ধে চলেছে খাওয়া-পরার নিশ্চয়তায়। একসময় যুদ্ধ লেগে গেল। ঘোড়ার খুরের আঘাতে প্রকম্পিত হলো যুদ্ধক্ষেত্র। তলোয়ারের ঠোকাঠুকিতে আগুন ঝরল ফুলঝুরি হয়ে।

ফিনল্যান্ডের হামেনলিন্না শহরে অতল নীল হ্রদের পাড়ে প্রতি গ্রীষ্মে কয়েক দিনের জন্য বসে এই মধ্যযুগীয় মেলা। অংশগ্রহণকারী আসে সারা ইউরোপ থেকে—কেউ কামার, কেউ কুমার, কেউ যোদ্ধা, কেউ মদের জোগানদার! নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও করে তারা।

বিশাল এলাকা ঘেরা হয়েছে বেড়া দিয়ে। টিকিট কেটে ঢুকলেই চলে যাবেন হাজার বছর আগে। আছে বেশুমার খাবারের দোকান। গরুর মাংস ভাজা, চিনি লাগানো আপেল ইত্যাদি অনেক কিছুই পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রায়ার টাককেও দেখলাম একধারে। তিনি রবিনহুডের আমলের একজন মহত্প্রাণ যুদ্ধবাজ সন্ন্যাসী—তাঁর বাইবেল জ্ঞান যেমন প্রখর, তলোয়ারেও বিদ্যুৎ চমকায়। খেতেও পারেন অনেক। আমি দেখলাম, আস্ত একটা শুয়োর গ্রিল করতে উঠেপড়ে লেগেছেন ফ্রায়ার টাক।

ওদিকে গরমে তিতিবিরক্ত হয়ে হ্রদের ধারে কফি পান করতে দেখলাম একজন ভাইকিং দেবতাকে। তাঁর পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে নেকড়েসদৃশ এক বিরাট হাস্কি (স্লেজ টানা কুকুর)।

কামারের দোকানগুলো আলাদাভাবে নজর কাড়ল। ছুরি, বল্লমের ফলা, বর্ম, মুখোশ, ঢাল তৈরির উপায় হাতে-কলমে দেখানো হচ্ছে এই দোকানগুলোতে। হাতের দারুণ এক বর্ম দেখে লর্ড অব দ্য রিংসের ডার্ক লর্ডের কাটাপড়া হাতের কথা মনে পড়ে গেল।

মেলা দেখতে যেসব শিশু এসেছে, ওদের দেখেই বেশি ভালো লাগল। তারা চোখে নিখাদ বিস্ময় নিয়ে দেখছে মধ্যযুগের বিশ্ব। নাইটের ঘোড়া, কুমারের চাকা, তীরন্দাজের মাথার পালক—সব কিছুতেই তাদের তুমুল আগ্রহ। তাদের অনেকেই আবার প্রাচীন বেশভূষা জড়িয়ে হয়ে গেছে অংশগ্রহণকারী।

দুই নাইটের সঙ্গে কথা হলো—একজন এসেছেন বেলজিয়াম থেকে, অন্যজন ফরাসি। বললাম, অনেকে বলে নাইটরা ছিল  ভাড়াটে সৈন্য, তাদের  ন্যায়-অন্যায় বোধ ছিল না। যে পয়সা দিত তার পক্ষেই যুদ্ধ করত, কিন্তু সাহিত্য আর চলচ্চিত্রে তারা হয়ে গেছে দুষ্টের দমনকারী—কিভাবে দেখো ব্যাপারটি?

ঘাড় নেড়ে বলল, ‘অতশত জানি না বাপু। এইটা আমার জীবিকা, এই করেই চালাচ্ছি। ’

আকাশে কালো মেঘের দঙ্গল ভিড় করে এলো পড়ন্ত বিকেলে। মেঘবালিকা এই জবরজংদের কোলে তুলে নিলে কী যে দশা হবে ভাবতে পারছি না। আমি আপনা প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলাম।


মন্তব্য