kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খাদ্যচক্কর

মহাস্থানের কটকটি

খেতে কটকট শব্দ হয় বলে নাম কটকটি কি না কেউ ঠিক করে বলতে পারেনি। বগুড়ার দইয়ের মতোই মহাস্থানগড়ের এই খাবারটির রয়েছে আলাদা খ্যাতি। খেয়ে এসে জানালেন সামিউল্ল্যাহ সমরাট

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মহাস্থানের কটকটি

চারকোনা বিস্কুট আকৃতির কটকটি শুকনো মিষ্টান্নজাতীয় খাবার। বগুড়া শহর থেকে ১১ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম পাশে বাংলার প্রাচীন রাজধানী পুণ্ড্রবর্ধন বা মহাস্থানগড় বেড়াতে গিয়ে ফেরার পথে কেউ কটকটি নিতে ভুলেন না।

খাবারটির নাম কেন কটকটি রাখা হলো এর ইতিহাস জানা যায়নি। কটকটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়কেজন এবং এই অঞ্চলের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, খাওয়ার সময় কটকট শব্দ হওয়ার কারণেই এই খাবার কটকটি নামেই পরিচিতি পেয়ে যায়। আগে কটকটি বেশ শক্ত ছিল। এখন অনেকটাই নরম করে বানানো হয়। তাই কটকটি খেতে গিয়ে এখন আগের মতো তেমন কটকট শব্দ পাওয়া যায় না।     

উনিশ শতকের শেষের দিকে বগুড়া সদর উপজেলার গোকূল ইউনিয়নের পলাশবাড়ী উত্তরপাড়া গ্রামের জয়নাল আলী মণ্ডল, ভোলা মণ্ডল ও গেদা মণ্ডলের হাতেই কটকটির জন্ম বলে অনেকে জানান। জীবিকার তাগিদে নিজ বাড়িতে একেবারে সাধারণভাবে গমের আটা দিয়ে কটকটি বানিয়ে মহাস্থান, শিবগঞ্জ,  মোকামতলায় বিক্রি করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই সুস্বাদু মিষ্টিজাতীয় খাবারটি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বানানো সহজ হওয়ায় অনেকেই বানাতে শুরু করেন। অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম খাবার হিসেবেও গ্রহণযোগ্যতা পায়। চাহিদা বাড়তে থাকায় অনেক মানুষ কটকটি বানিয়ে বিক্রির পেশা বেছে নেয়। এখনো টিকে আছে সেই ব্যবসা। বেড়েছে পরিসর।

মহাস্থান বাজারে কটকটিকে কেন্দ্র করে প্রায় ৭০-৮০টি দোকান গড়ে উঠেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে লাল মিয়া কটকটি হাউস, হামু মামা কটকটি প্যালেস, আলাউদ্দিন কটকটি ভাণ্ডার, জিন্নাহ কটকটি ভাণ্ডার, ফাতেমা কটকটি প্যালেজ, আল আমীন কটকটি প্যালেস, লায়েব কটকটি ভাণ্ডার, শাহাদত কটকটি ভাণ্ডার, মিলন কটকটি ভাণ্ডার, শাহিন কটকটি ভাণ্ডার, ফাতেমা কটকটি ভাণ্ডার, মনছের কটকটি ভাণ্ডার, আলাউদ্দিন কটকটি ভাণ্ডার। এসব দোকানের কোনোটিতে প্রতিদিন দুই থেকে সাত মণ কটকটি বিক্রি হয়। আকৃতিতে খুব একটা পার্থক্য দেখা না গেলেও স্বাদে একটির সঙ্গে আরেক দোকানের তফাত রয়েছে। অবশ্য উপাদানের ভিন্নতার জন্য যেমন স্বাদে আলাদা, তেমনি দামেও রয়েছে রকমফের। ৮০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় কটকটি। ব্যবসায়ীরা বললেন, শুরুর দিকে নাকি পাঁচ পয়সা-ছয় পয়সা কেজি দরে বিক্রি হতো। এই বাজারের পুরনো কটকটির দোকান নাসির কটকটি ভাণ্ডার। বর্তমান স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম। তিনি জানালেন, ৫৫ বছর আগে তাঁর দাদা এই ব্যবসা শুরু করেন। দোকানের নাম রাখা হয় তাঁর বাবার নামে। গড়ে প্রতিদিন সাত মণ কটকটি বিক্রি হয় এই দোকানে। ব্যবসায় তাঁর সঙ্গে রয়েছে ১০ জন কারিগর।   

বগুড়ার এই ঐতিহাসিক মহাস্থানে প্রতিবছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার মেলা বসে। সারা দেশ থেকে আসে লাখ লাখ মানুষ। ঘরে ফেরা এই মানুষগুলোর সঙ্গে আবশ্যক হিসেবে থাকে কটকটি। মেলার দিন অস্থায়ীভাবেও অনেক কটকটির দোকান বসে। মেলায় বিক্রি হয় কয়েক হাজার মণ কটকটি।

 

কটকটি বানানো

প্রথম দিকে কটকটি বানানো হতো গমের আটা দিয়ে। পরে স্বাদ ও মান বাড়াতে বানানোর পদ্ধতি ও উপকরণে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে ভাজতে তেল ব্যবহার হতো, এখন ঘি-ডালডা ব্যবহার করা হয়। কটকটি তৈরি হয় কয়েক ধাপে। এর প্রধান উপকরণ সিদ্ধ সুগন্ধি চাল। চাল পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। একেবারে নরম হলে সেই চাল ছেঁকে শুকানোর জন্য রেখে দিতে হয় প্রায় পনেরো মিনিট। পানি শুকিয়ে গেলে ঢেঁকি, মেশিন বা অন্য উপায়ে একেবারে মিহি আটায় রূপান্তর করা হয়। এই আটার সঙ্গে মেশাতে হয় বিভিন্ন মসলা, সয়াবিন তেল। ভালোভাবে মিশিয়ে গাঢ় করে খামির করা হয়। এরপর আকৃতির জন্য আগে থেকে তৈরি করে রাখা ছাঁচ দিয়ে কেটে নিতে হয়। কটকটির আকৃতি সাধারণত এক থেকে দেড় বর্গইঞ্চি হয়ে থাকে। তৈরি হয়ে গেল কাঁচা কটকটি। এবারে ভাজার পালা। বড় বড় কড়াইয়ে ভোজ্য তেল, ঘি-ডালডার সংমিশ্রণে ভাজা হয়। লালচে রং ধরা পর্যন্ত চলে ভাজাভাজির পর্ব। ভাজা হয়ে গেলে গুড় বা চিনির ঘন রসে ভাজা কটকটি ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর ঠাণ্ডা হয়ে গেলেই খাওয়ার উপযোগী হয়ে গেল স্বাদের কটকটি।


মন্তব্য