kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মার্কিন মুলুকে বাংলার কলম্বাসরা

আমেরিকায় বাঙালিরা ইতিহাস লিখছেন প্রায় ১০০ বছর ধরে। এমআইটির বিবেক বাল্ডের ‘বেঙ্গলি হারলেম’ পুরনো সেই অধ্যায়ে নতুন আলো ফেলেছে। গোড়ার দিকের বাঙালিদের একজন ইব্রাহিম চৌধুরী। তাঁর নাতনি এস নাদিয়া বলেছেন নানার কথা

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মার্কিন মুলুকে বাংলার কলম্বাসরা

ম্যানহাটনের বেঙ্গল গার্ডেন রেস্তোরাঁ। আমেরিকার প্রথম ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁটি পরিচালনা করতেন হাবিব উল্লাহ ও তাঁর স্ত্রীর ভিক্টোরিয়া। ছবিটি ১৯৫১ সালে তোলা

শোনো এক ইব্রাহিম চৌধুরীর কথা

এস. নাদিয়া

ইব্রাহিম চৌধুরীই কারণ, আজকে আমি একজন আমেরিকান। তিনি আমার নানির ভাই।

আমার পরিবার তাঁর বরাতেই বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সুযোগ পায়। ১৯২০ সালে মার্কিন মুলুকে তাঁর আগমন ঘটে। মার্কিন মুলুকে তিনি প্রথম বাংলাদেশি, যিনি বাসস্থান বানিয়েছিলেন নিউ ইয়র্ককে। এর সমর্থনে দলিলও আছে। দক্ষিণ এশীয়রা মার্কিন মুলুকে ভিড় জমাতে থাকে মূলত আশির দশকে। ইব্রাহিম চৌধুরী সাহসটি করেছিলেন এর প্রায় অর্ধশতক আগে। এমনকি পশ্চিম তীরে পাঞ্জাবি কৃষকরা এসেছিলেন উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুতে। তবে জাহাজের দক্ষিণ এশীয় কর্মচারীদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রে এসে থাকবেন হয়তো ষোলো শতকেই।

ইব্রাহিম চৌধুরী এমন সময় মার্কিন মুলুকে এসে পৌঁছেছিলেন, যখন অভিবাসন আইন এশীয়দের জন্য মার্কিন দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। ১৮৮২ সালে চীনাদের ঠেকাতে যে আইন তৈরি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আমেরিকা ১৯১৭ সালে অভিবাসন আইন তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল কমিটি অন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাচারালাইজেশনকে ১৯৪৫ সালে একটি চিঠি লিখেছিলেন ইব্রাহিম চৌধুরী। লিখেছিলেন, ‘আমি ব্যবসায়ী বা অধ্যাপকদের জন্য কথা বলছি না, বলছি আমাদের কথা, যারা মাঠে বা কারখানায় কাজ করি, মাথার ঘাম পায়ে ফেলি আমেরিকাকে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করতে। আমরা এখানে বিয়ে করেছি, আমাদের ছেলেমেয়ে হয়েছে। অথচ আমরা নাগরিকসুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমরা এই দেশে আমাদের জীবনের সেরা সময়টা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা ন্যায়বিচার পেতে পারি না?’ (বিবেক বাল্ডের বই থেকে)

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) সহযোগী অধ্যাপক বিবেক বাল্ড অধুনা একটি বই লিখেছেন, যার শিরোনাম, বেঙ্গলি হারলেম অ্যান্ড দ্য লস্ট হিস্টরিজ অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকা। বইটিতে তিনি সেই মানুষদের কথা বলেছেন, যাদের জন্য ইব্রাহিম চৌধুরী ওই পত্র লিখেছিলেন কংগ্রেশনাল কমিটিতে। বাল্ড বলছেন, ১৯১৭ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশীয়বিষয়ক আমেরিকার ইতিহাস সেভাবে জানতে পাই না। অনেকে ভেবে বসে আছেন, কিছুই ঘটেনি সে সময়। আসল সত্য হলো, তখন অনেক কিছু ঘটেছিল। একদল বাংলাদেশি আমেরিকায় এসে লাতিনো ও আফ্রিকান মেয়েদের বিয়ে করেছিল এবং একটি বৈচিত্র্যময় সমাজ গড়ে তুলেছিল। তাদের কেউ কেউ রেস্তোরাঁ খুলে বসেছিল অথবা ছোটখাটো ব্যবসা করত। তারা নিজেদের শক্তিশালী করতে নতুন অভিবাসীদের নানা সহযোগিতা দিত।

ইব্রাহিম চৌধুরী তখন রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ব্রিটিশদের রোষানল থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসেন নিউ ইয়র্ক সিটিতে। তিনি ভারতীয়দের নিয়ে অনেক সমিতি গঠন করেন। তিনি প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন, দি ইন্ডিয়ান সিম্যান’স ক্লাব। বিবেক বাল্ডের বইতে তাঁর ছেলে নূর চৌধুরী বলেছেন, ইব্রাহিম চৌধুরী নাবিকদের অভিবাসন সমস্যা নিরসনে কাজ করতেন। তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে বলে আসতেন, মিয়া, উল্লাহ, উদ্দিন বা আলী নামের যারাই ভর্তি হবে, তাদের সম্পর্কে তাঁকে যেন জানানো হয়।

ইব্রাহিম চৌধুরীর মেয়ে লায়লা চৌধুরী বলেছেন, আমরা এমন একটি বাড়িতে থাকতাম, যার অনেক ঘর ছিল। প্রায় সব সময় বাড়িটিতে দেশ থেকে আসা অনেক রকম লোক থাকত। কারো অসুস্থতার খবর পেলে তিনি ছুটে যেতেন, কেউ মারা গেলে তিনি দাফনের ব্যবস্থা করতেন।

ইব্রাহিম চৌধুরীর সঙ্গে ন্যাশন অব ইসলামের ম্যালকম এক্সের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমেরিকার বিখ্যাত কমেডিয়ান আলাউদ্দিন উল্লাহ বলেছেন, ‘ইব্রাহিম চাচার সঙ্গে ম্যালকম এক্সের একটা ছবি আমি ছোটবেলায় দেখেছি। ’

ইব্রাহিম চৌধুরী নিউ ইয়র্কে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদটির নাম আল মদিনা মস্ক। এখনো বর্তমান। বেঙ্গলি হারলেম প্রকল্পে বাল্ডের সঙ্গে আছেন আলাউদ্দিন উল্লাহও। উল্লাহ টিভিতে ডিশওয়াশার ড্রিমস নামের একটি শো করছেন। বাল্ড একটি ওয়েবসাইট খুলেছেন, যেখানে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা লিখতে পারছে তাদের হারানো দিনের কথা। আমাদের দক্ষিণ এশীয়দের আমেরিকা বাস বিশ-তিরিশ বছরের নয়, বরং শত বছরের। এ কথাটি ভাবতে ভালো লাগে আর বাল্ডের বইটি সে বিষয়ে দলিল।  

এস. নাদিয়া : আমেরিকায় মমসরাইজিং নামের এক সংগঠনের ক্যাম্পেইন ডিরেক্টর। এন্ড্রু গুডম্যান ফাউন্ডেশনে তিনি প্রোগ্রাম পরিচালক ছিলেন। বাংলাদেশ-আমেরিকান ওম্যানস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের তিনি সহপ্রতিষ্ঠাতা। নিয়মিত ব্লগ লেখেন।

 

বিবেক বাল্ড

‘বেঙ্গলি হারলেম অ্যান্ড দ্য লস্ট হিস্টরিজ অব সাউথ এশিয়ান আমেরিকা’ বইয়ের লেখক

 

‘আলাউদ্দিনরাই আজকের দরজা খুলেছে’

বিবেক বাল্ড এমন এক অধ্যায়ে আলো ফেলেছেন, যা নিয়ে এর আগে বেশি কথাবার্তা হয়নি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লোকজন ১৮৮০ সালের দিকে আমেরিকা যায় রেশম আর তুলার ব্যবসা করতে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ জাহাজের ভারতীয় নাবিকরা পৌঁছে আমেরিকা। তারা বসতি গড়ে নিউ অরলিয়েন্স, নিউ ইয়র্কের হারলেম ও নিউ জার্সিতে। তারা বন্ধনে আবদ্ধ হয় আফ্রিকান-আমেরিকান ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। নিউ ইয়র্ক টাইমস তাঁর যে সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে, তার নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো :

আপনি কিভাবে এমন একটি গবেষণাকর্মে উৎসাহী হলেন?

হাবিব উল্লাহর কথা জানতে পারি তাঁর ছেলে আলাউদ্দিন উল্লাহর কাছ থেকে। আলাউদ্দিন ইস্টার্ন হারলেমের অভিনেতা, নাট্যকার, কমেডিয়ান। হাবিব উল্লাহ ছিলেন নোয়াখালীর মানুষ। জাহাজের কর্মচারী ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে আমি যখন একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করছিলাম, তখন আলাউদ্দিন তাঁর বাবার গল্প বলে। আমি অবাক হয়ে শুনেছিলাম। হাবিব ১৯২০-এর দশকে আমেরিকায় আসেন। পূর্ব হারলেমে স্থায়ী হন ১৯৩০-এর দশকে। পুয়ের্তো রিকোর এক নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। হাবিব রেস্তোরাঁয় ডিশওয়াশারের কাজ করতেন। পরে চল্লিশের দশকে নিজে একটি রেস্তোরাঁ খুলে বসেন এবং স্প্যানিশ হারলেমেই দিনযাপন করতে থাকেন। ওই সময়গুলো এশীয় অভিবাসীদের অনুকূল ছিল না। ১৯১৭ সালের অভিবাসন আইনের বিধিনিষেধ ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এশীয় মার্কিন বন্দরগুলোয় এসে হাজির হয়। তারা কারখানায় শ্রমিক হিসেবে বা রেস্তোরাঁয় কর্মচারী হিসেবে কাজ করত।

ভিন্ন জাতিতে বিয়ে করার ব্যাপারটি কি সহজ ছিল?

আসলে ব্যাপারটি প্রয়োজনীয় ছিল। তখন ভারতীয়দের একটা ঠাঁই দরকার ছিল। আফ্রিকান-আমেরিকান মুসলিম মহিলার সঙ্গে বিয়ে হলে তখন অভিবাসীরা নিরাপত্তা পেত। মহিলারা তাদের বিয়ে করত, কারণ তারা জীবিকা আহরণে কঠিন শ্রম দিতেও প্রস্তুত ছিল।

অভিবাসীদের নতুন প্রজন্ম কি তাদের পূর্বপুরুষদের কথা মনে রেখেছে?

১৯৬৫ সালে অভিবাসন আইন শিথিল হওয়ার পর যারা এসেছে তাদের সম্ভ্রান্ত বলা যায়। তারা কেউ প্রকৌশলী, কেউ বা ডাক্তার। আগে যারা এসেছে তাদের বেশির ভাগই অড জব (ট্যাক্সি চালানো, ক্লিনিং ইত্যাদি) করেছে। তবে নতুনরা আসলেই কম বুঝতে পেরেছে, আলাউদ্দিন উল্লাহরাই আজকের সুযোগ-সুবিধাগুলোর দরজা খুলেছে।

কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

নতুন যুগের আমেরিকান-বাংলাদেশিরা সত্যি আপ্লুত। পূর্বপুরুষের খোঁজ পেয়ে তারা বিহ্বল। আরো শুনতে চাইছে। আমাকে স্কুল-কলেজগুলো ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি একটি ওয়েবসাইট (bengaliharlem.com)  করেছি। সেখানে অনেকেই লিখছে।

আপনি একটি প্রামাণ্যচিত্র বানাচ্ছেন...

আলাউদ্দিন উল্লাহরা দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মাঝখানে বড় হয়েছে। ব্যাপারটি যেমন সংঘাতপূর্ণ আবার মিলমিশেরও। আমি জানতে চাইছি, হাবিব উল্লাহ কিভাবে ব্যাপারটিতে মানিয়ে নিয়েছিলেন। নোয়াখালী থেকে আসা একজন মানুষ বিয়ে করে ফেললেন একজন পুয়ের্তো রিকানকে। ছবিটিতে আমি আলাউদ্দিনের পরিবারকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছি ১৯২০-এর দশকে। আশা করি, ২০১৭ সালের শুরুর দিকেই ছবিটি দেখাতে পারব।


মন্তব্য