kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এক পাতা প্রেম

টাকা পাখির ডাকে

শামসুল আলম নাদিমের সংগ্রহ শুরু সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে। তারপর ডাকটিকিট হয়ে পরে ব্যাংক নোট। একসময় পাখির ছবিসংবলিত নোটের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হন। গড়ে তুলেছেন মজার সংগ্রহ। জানাচ্ছেন সানজাদুল ইসলাম সাফা। ছবি তুলেছেন আজিম রানা

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



টাকা পাখির ডাকে

নাদিমের মাছ ধরার শখ ছিল। ১৯৭৩ সালে তাঁর বয়স ছিল পাঁচ।

থাকত বেইলি রোডে। বাসার পেছনে পুকুর ছিল। অনেকেই মাছ ধরত। নাদিম দেখত বসে বসে। নাদিমরা ১৯৭৪ সালে সেগুনবাগিচায় চলে যায়। তখন সে প্রথম শ্রেণির ছাত্র। সেগুনবাগিচার বাসার সামনের পুকুরে মাছ ধরত। ফাইজার ওষুধ কম্পানি কাছেই ছিল। বিদেশিরা অনেক আসত-যেত। নাদিম দেয়াল টপকে গিয়ে সিগারেটের প্যাকেট কুড়াত। আসাদ তাঁর খালাত ভাই। নিজের দুই বোন। সবাই ডাকটিকিট জমাত। নাদিম সেগুলো অনেকবারই দেখেছে। নিজেরও আগ্রহ হলো। বাবার কাছে যেসব চিঠি আসত, সেগুলোর ডাকটিকিট তুলে নিত। সিগারেটের প্যাকেট কুড়াতে গিয়ে ফাইজার কম্পানির ঝুড়িতেও অনেক চিঠি পড়ে থাকতে দেখে। বেশির ভাগই বিদেশি। এভাবেই তাঁর ডাকটিকিট সংগ্রহ শুরু। প্রথমে টেনে তুলতে গিয়ে অনেকগুলো নষ্ট হয়ে যেত। তারপর অন্যদের কাছ থেকে পানিতে ভিজিয়ে ডাকটিকিট তোলা শিখলেন। ফাইজারে চিঠি বেশি আসত জার্মানি থেকে। আসত ইউরোপের অন্য দেশগুলো থেকেও। নাদিমের বাবার কাছে ভারত থেকেও চিঠি আসত। আত্মীয়স্বজনদের কাছে বেশি চিঠি আসত আমেরিকা থেকে। নাদিম সব সময় খেয়াল রাখত কার কাছে কোথা থেকে চিঠি আসে।

 

নেশা যেমন খেলাও

স্কুলের বন্ধুরাও ডাকটিকিট জমাত। একজন অন্যেরটা সুযোগ পেলে হাতিয়ে নিত। এটা যেন খেলা ছিল। নাদিম ও তাঁর বন্ধুরা তখন বই পড়ত, খেলত আর সংগ্রহ করত। ১৯৭৬ সালে বড় বোনের বিয়ে হলে সব ডাকটিকিট নাদিমকে দিয়ে যান। তখন খাতায় টিকিট লাগানোর উপায় ছিল ভাত নইলে গাছের আঠা। অনেক ডাকটিকিটই নষ্ট হয়ে যায় একসময়। পরে খোঁজ করলেন, কোথায় কিনতে পাওয়া যায়? জিপিওর খোঁজ পেলেন। ১৯৮০ সালে তাঁর পরিবার শ্যামলী চলে আসে। তখন তিনি ক্লাস সিক্সে। ডাকটিকিটের খোঁজে কাগজপত্র ঘাঁটতেন বলে ক্লিনার বিহারি চাচা খুব বকা দিতেন। পরে তিনি নিজেই নাদিমের জন্য খামগুলো আলাদা করে রাখতেন। নাদিম চার আনা বকশিশও দিত।

১৯৮৪ সালে বোন তাঁকে একটি অ্যালবাম উপহার দেন। সেটিতে জমাতে শুরু করেন নাদিম। ১৯৮৩-৮৪ সালে নাদিম স্ট্যাম্প কিনতেন জিপিও ছাড়াও তেজগাঁও পলিটেকনিক গার্লস স্কুলের পাশের সালাম স্ট্যাম্প সেন্টার থেকে। ঈদ, জন্মদিনে বড়দের কাছ থেকে পাওয়া টাকা জমা রাখতেন স্ট্যাম্পের জন্য। ১৯৮৫ সালে এসএসসি পর্যন্ত এভাবেই চলেছে।

 

 

টাকায় ধরল তাঁকে

কলেজবেলায় হাতখরচ পেতেন। টাকা জমানোর সেই শুরু। আত্মীয়রা তত দিনে জেনে গেছে, নাদিম ডাকটিকিটের পাশাপাশি ব্যাংক নোটও জমায়। বিদেশ থেকে কেউ এলে তাঁকে টাকা উপহার দিত। নেশাটা তাতে বেড়ে গেল। মা নূর নাহার বেগমের কাছে অনেকগুলো পুরনো বাংলাদেশি নোট ছিল। সেগুলো নিজের করে নিলেন নাদিম। ঈদে নতুন টাকা পেলেও কিছু তুলে রাখতেন। ছাপানোর সাল, ডিজাইন, স্বাক্ষর, নিরাপত্তা মার্ক, কাগজ ইত্যাদি আমলে নিয়ে আলাদা আলাদা করে সাজিয়ে রাখতে থাকেন। তাঁর কাছে ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ প্রকাশিত এক টাকা, পাঁচ টাকা, ১০ টাকা ও ১০০ টাকার নোট আছে। নোটগুলো এক বছর পরেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল।  

 

পাখিওয়ালা টাকা

পাখি তাঁকে পেয়েছিল ছোটবেলায়ই। পাখি পুষতেন। খালা ও বোন এক জন্মদিনে দুটি টিয়া ও কয়েকটি মুনিয়া পাখি দিয়েছিলেন। নিজেও কিনেছিলেন কিছু। সেগুলোর অনেকই উড়ে গিয়েছিল। পরে আর পাখি কেনেননি। বরং পাখিওয়ালা ব্যাংক নোটের প্রেমে পড়েছিলেন। নিজের সংগ্রহের অন্য কিছু ব্যাংক নোটের মাধ্যমে পাখির নোট অদল-বদল করেছেন। এখন তাঁর কাছে ৮০টি দেশের প্রায় ৫০০ পাখিওয়ালা ব্যাংক নোট আছে। চড়ুই, চিল, ইগল, পেঁচা, মাছরাঙা, বক, ময়ূর ছাড়াও অনেক দুর্লভ পাখির ছবিওয়ালা নোট তিনি সংগ্রহ করেছেন। বললেন, বাংলাদেশের কিছু নোটে পাখি আছে। খুব সুন্দর একটা টাকার নোট আছে। আমরা বলি ‘ময়নার মা’। সেটিতে এক মহিলা ধান ভানছে। কাহাইলের নিচে মুরগি ও তার বাচ্চা আছে। দুই টাকার নোটে আছে দোয়েল। ১০ টাকার নোটেও ছোট করে দোয়েল পাখি ডান দিকে আছে। এ ছাড়া একটি ৫০ টাকার কমলা রঙের নোট ছাপানো হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। সেটির মধ্যে ময়ূরের ছবি আছে। বাংলাদেশের এক, দুই, ১০ ও ৫০ টাকা—এই চারটি নোটেই পাখি আছে।


মন্তব্য