kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খুঁজে ফেরা

মিসরের হারানো শহর

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে নক্রাটিস শহরটি গ্রিকদের উপহার দিয়েছিল ফারাও আমেসিস। জানিয়ে গেছেন হেরোডটাস। নক্রাটিস একসময় চলে গিয়েছিল জলের তলে। নক্রাটিসে প্রাপ্ত প্রত্নরত্ন নিয়ে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে চলছে এক প্রদর্শনী। জানাচ্ছেন মো. নাভিদ রিজওয়ান

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মিসরের হারানো শহর

হেরোডটাস সূত্র দিয়ে গেছেন

পৃথিবীকে মিসর দিয়েছে পিরামিড, গ্রিস দিয়েছে গণতন্ত্র। পৃথিবী আজও চমকায় ওই দুই সভ্যতায়।

একবিন্দুতে তারা মিলেছিল একসময়।

 

মিসরে গ্রিসের বাসা

খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে গ্রিকরা মিসরীয়দের সঙ্গে ব্যবসা ভালোই পাতিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগও ছিল বলার মতো। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডটাস থেকে গবেষকরা সেকালের মিসরের অনেক কথা জানতে পারছেন। একটি ঘটনা এমন—খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতক। একদল জলদস্যু ঝড়ের কবলে পড়ে নীল নদের বদ্বীপে নামতে বাধ্য হয়েছিল। তারা এসেছিল আনাতোলিয়া (তুরস্কের এশিয়ান অংশ) থেকে। তারা অস্ত্রশস্ত্রে এগিয়ে ছিল অন্যদের থেকে। ফারাও জামোটিকাসকে তখন সদ্যই পদচ্যুত করা হয়েছে। তিনি শান্তি, বিনয় ও মাতৃত্বের দেবী লেটোর সাহায্য প্রার্থনা করছিলেন। লেটো তাঁকে সমুদ্র থেকে আগত ব্রোঞ্জমানবদের সহযোগিতা নিতে বলেন। দস্যুরা ব্রোঞ্জের বর্ম তৈরি করতে পারত। ফারাও দস্যুদের আহ্বান জানান তাঁকে ক্ষমতায় ফিরতে সাহায্য করতে। একপর্যায়ে দস্যুদলের সহায়তায় ক্ষমতায় ফেরেন জামোটিকাস। বিনিময়ে তিনি দস্যুদের এখনকার পোর্ট সাইদের কাছে দুই খণ্ড জমি উপহার দেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ওই জমিগুলো এখনো খুঁজে ফিরছেন। আরেকটি ঘটনা বলেছেন হেরোডটাস। সেটি খ্রিস্টপূর্ব ৫৭০ অব্দের। ফারাও আপ্রিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল আমেসিস। আমেসিসকে দমন করতে গিয়ে আপ্রিস পরাজিত হয়েছিলেন। আমেসিসকে সাহায্য করেছিল গ্রিক সৈন্যরা। তিনি তাদের মেম্ফিসে নিজের পাহারাদার রেখেছিলেন। আমেসিসের প্রতি গ্রিকদের পক্ষপাতিত্ব ছিল। বিনিময়ে আমেসিস গ্রিকদের একটি শহর দিয়েছিলেন। নাম নক্রাটিস। শহরটি প্রত্নতাত্ত্বিকরা খুঁজে পেয়েছেন।

 

শহর নক্রাটিস

শহরটির প্রতিষ্ঠা খ্রিস্টপূর্ব ৬২৫ অব্দে। গ্রিকরা উপহার পান খ্রিস্টপূর্ব ৫৭০ অব্দে। শহরটিতে গ্রিক আর মিসরীয়দের সঙ্গে ফিনিশীয়রাও বসবাস করত। নক্রাটিস ছিল গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। প্রায় ১৬ হাজার মানুষ ছিল শহরটিতে। হেরা, অ্যাপোলো, আফ্রোদিতির অনেক মন্দির ছিল এখানে, তবে বেশি ছিল মিসরীয় দেবতা আমুন রায়ের। এমন মন্দিরও ছিল, যার সামনের পথের দুই ধারে ছিল স্ফিংসের মূর্তি।

নক্রাটিসের মিসরীয়দের কাছেই গ্রিকরা পেডিমেন্ট (ভবনের ওপর তিন কোনা কাঠামো) ও স্তম্ভ বানানো শেখে। আগের গ্রিক মন্দিরগুলো সাধারণ দেয়ালঘেরা হতো। মূর্তি থাকত বেদির ওপর। গ্রিকরা বসতি গড়ত মন্দিরের আশপাশে ভবন গড়ে। কোনো কোনো বাড়ির উচ্চতা ছয়তলা সমানও ছিল। বাড়ির ছাদে কবুতরের জন্য তাঁরা ছোট ছোট ঘর বানিয়ে দিত। এমন বাড়ির নমুনা এখনকার ইয়েমেনে এখনো দেখা যায়।

 

জাহাজ ভিড়ত নক্রাটিসে

গ্রিকরা তো বটেই, জাহাজ ভেড়াত নক্রাটিসে ফিনিশীয়রা, সাইপ্রিয়টরা, লেভান্তিয়রাও। নক্রাটিসে আসার পথে জাহাজগুলো প্রায় চল্লিশ মাইল নদীপথ পাড়ি দিত। হেরাক্লিওন নামের ছোট্ট বন্দর পড়ত মাঝে। হেরাক্লিওন থেকে কিছু মূর্তি খুঁজে পেয়েছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা বেশ কিছুকাল আগেই। মিসরীয়রা শস্য, প্যাপিরাস, সুগন্ধি, লিনেন দিত আর গ্রিকরা দিত রৌপ্য, কাঠ বা জলপাইয়ের তেল।

নক্রাটিসে উৎসব

বেশ কিছু সংস্কৃতির মানুষের একত্র বাস ছিল নক্রাটিসে।   উৎসবাদিতে সবাই অংশ নিত। নক্রাটিসে উৎসব তাই লেগে থাকত সারা বছর। একটি উৎসব ছিল নেশাতুর হওয়ার। গবেষকরা একে বলছেন ফেস্টিভাল অব ড্রাঙ্কেননেস। মন্দিরেই বসত বড় আসর। বাড়ি বাড়িও আসর বসত। হেরোডটাসের নথি থেকে জানা গেছে, নক্রাটিসে তখন সুন্দরীদের ভিড় ছিল। রদপি যেমন একজন।

 

 

 

সুন্দরী রদপি

অনেক গালগল্প এ সুন্দরীকে ঘিরে। অনেকে বলেন, রদপি নামক চরিত্রটি নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা আছে ইতিহাসজুড়ে। অনেকে বলেন, সিন্ডারেলা চরিত্রটি তৈরি করা হয়েছে রদপির মতো করে। ভূগোলবিদ স্ত্রাবোও (জন্ম, খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ বা ৬৪ অব্দ) এক গ্রেকো-মিসরীয় মেয়ের কথা বলেছেন। তাঁরও প্রায় দেড় শ বছর আগে ক্লডিয়াস নামের এক রোমান লেখক রদপির কথা বলেছেন। ক্লডিয়াসের গল্পটি এমন—একদিন রদপি গোসল করছিলেন, এমন সময় একটি ইগল তাঁর একপাটি জুতো নিয়ে যায়। একসময় জুতোটি ছেড়ে দেয় ইগল এবং তা গিয়ে পড়ে রাজার কোলে। সে রাজার নাম ছিল জামোটিকাস। রাজা ওই জুতোর মালিককে খুঁজে বেড়ান এবং একসময় পেয়েও যান নক্রেটিসে। এরপর রাজা তাঁকে বিয়ে করেন।

হেরোডটাসের রদপি কাহিনী আরেকটু আলাদা। তাঁর রদপি অতিসুন্দরী এক নারী। সুশিক্ষিতা। আইসোপ নামে এক সঙ্গী ছিল তাঁর। গল্প বলায় আইসোপের জুড়ি ছিল না। লাডমন নামের এক ব্যক্তির দাস ছিল তাঁরা। আমেসিসের শাসনামলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মিসরে। ক্যারাক্সাস নামের এক ধনী ব্যক্তি তাঁর প্রেমে পড়ে যান। মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রদপিকে মুক্ত করেন। একসময় রদপিও অনেক টাকার মালিক হন।

নক্রাটিসের পতন

নক্রাটিসের মানে হচ্ছে জাহাজের প্রণয়িনী। যুদ্ধের কারণে এ শহরের পতন হয়নি। আলেকজান্দ্রিয়া শহর পত্তনের পর থেকে এর আবেদন কমতে থাকে। নক্রাটিস থেকে আলেকজান্দ্রিয়ার দূরত্ব ৩০০ মাইল। গবেষকরা মনে করেন, আলেকজান্দ্রিয়াই নক্রাটিসের জৌলুস কেড়ে নেয়। অষ্টম শতকে শহরটি প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। নক্রাটিসের বেশ কিছু অংশ চলে যায় জলের তলে।

 

নক্রাটিস খোঁজা

শুরু হয় ১৭ শতকের শুরুতেই। কিন্তু গল্পই জমছিল শুধু। শেষে ১৮৮৪ সালে উইলিয়াম ম্যাথিউ ফ্লান্ডার্স পেট্রি নামের এক ইজিপ্টলজিস্ট নক্রাটিসের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করেন।   ১৮৮৩ সালে তিনি যখন মিসরের উদ্দেশে রওনা হন, তখন তাঁর বয়স ছিল ত্রিশ। নক্রাটিসের অনেকটাই তত দিনে চাষবাসের কারণে অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল। ম্যাথিউয়ের মনে সন্দেহ জাগে কালো মাটিতে খণ্ড খণ্ড লাল ছড়িয়ে থাকতে দেখে। একপর্যায়ে মূর্তির নাক-কানও পাওয়া গিয়েছিল। পরে আরো অনেকেই আসেন নক্রাটিসের খোঁজে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল বাদে নক্রাটিসে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ভিড় সব সময় ছিল। নক্রাটিসের সহবন্দর হেরাক্লিওন খুঁজে পাওয়া গেছে ২০০০ সালে।

 

ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রদর্শনী

প্রদর্শনী শুরু হয়েছে মে মাসে। নাম ইজিপ্টস লস্ট ওয়ার্ল্ডস। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে থাকছে দেব-দেবীর মূর্তি, মাটির পাত্র ইত্যাদি। ২৭ নভেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত প্রদর্শনী চলবে।


মন্তব্য