kalerkantho


বাংলার দুঃখ

ভাঙনের শব্দ শুনি

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম এখন নদীগর্ভে। হারিয়ে যেতে বসেছে আরো কিছু গ্রাম। বসতির সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে কত ঐতিহ্য আর স্মৃতি! ভাঙনের সেই দুঃখগাথা শোনালেন সামিউল্ল্যাহ সমরাট

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভাঙনের শব্দ শুনি

ঝলমলে চাঁদনি রাত। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে খাঁ-বাড়ির আঙ্গিনায়। সেখানে গোল হয়ে বসেছেন ধলিরকান্দি গ্রামের শ দুয়েক মানুষ। মধ্যমণি হয়ে দোতারা হাতে সুরে সুরে গাজী কালুর কিসসা গেয়ে চলেছেন কাটু মিয়া। খঞ্জনি বাজিয়ে তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছেন আরো দুজন। বছর পাঁচ-সাত আগেও প্রায় নিয়মিত দেখা যেত এই দৃশ্য। এ ছাড়া পাতা খেলা, নৌকাবাইচ, গরুদৌড় হতো। এগুলোর সঙ্গে এখন হারিয়ে যেতে বসেছে সেই অঞ্চলও। ধলিরকান্দি গ্রামের অর্ধেকের বেশি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে। খাঁ-বাড়ির উঠোনটুকু এখনো টিকে থাকলেও ধসে যাওয়ার প্রহর গুনছে। ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে যমুনা। গিলে খাবে যেকোনো মুহূর্তেই। আশপাশের অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। যে কয়েকটি বাড়ি রয়েছে, তার বাসিন্দারাও সরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।

খাঁ-বাড়ির মেয়ে রেজেকা সুলতানা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। এ বছরের বন্যার পানিতে পুরো গ্রাম ডুবে গেলে চলে আসতে হয়েছে বড়ইকান্দি গ্রামে। তিনি জানালেন, ‘নিজের এলাকা ছেড়ে কখনো অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে ভাবিনি। এই নদীভাঙন তো আজকের নয়। ছোটবেলায় এই নদী ছিল অনেক দূরে। আমাদের বিশ্বাস ছিল একটা স্থায়ী ব্যবস্থা হবে। কিন্তু হলো না। চিরদিনের জন্য নিজ গ্রাম ছেড়ে যাওয়া যে কতটা কষ্টের, বলে বোঝানো যাবে না। বাবার কবরটা ওখানেই। জানি না আগামী বছর টিকবে কি না। ’

ভিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেননি কুতুবপুর ইউনিয়নের ধলিরকান্দি গ্রামের কৃষক বাবলু খাঁ। জমিজমা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বাড়িঘর এখনো সরিয়ে নেননি। কিছু দিনের মধ্যে ওটাও যাবে। স্থির করতে পারছেন না কী করবেন।  

এই গ্রামের পাশে বয়রাকান্দি। এর অর্ধেকের বেশি গত কয়েক মাসে বিলীন হয়ে গেছে। বয়রাকান্দি গ্রামের পূর্বপাশে প্রমত্ত যমুনা। এখন পানি কমতে শুরু করেছে। এ গ্রামের মোল্লাবাড়ির কিছু মানুষ অনেক আগেই চলে গেছে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়া, ভুল্লি এলাকায়। এখনো টিকে থাকা কয়েক ঘরের লোকজন দ্রুতই চলে যাবেন বলে ঠিক করেছেন। কথা হলো রশিদ মোল্লা আর বাবলু মোল্লার সঙ্গে। কথার সঙ্গে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস, বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে যেতে হচ্ছে। জমিজমা ব্যবসা সব গেল। যারা চলে গেছে, হয়তো কখনোই আর দেখা হবে না সেই মানুষগুলোর সঙ্গে। ভাবতেই বুক ভেঙে যায়।

এই ইউনিয়নের অন্যতম ব্যবসাকেন্দ্র কুতুবপুর হাট। ইউনিয়ন পরিষদও এখানে। হাটটি ভাঙনের মুখে।

কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের প্রায় পুরোটাই গ্রাস করেছে যমুনা। কর্ণিবাড়ী ফাজিল মাদ্রাসা গড়ে ওঠে ১৯২০ সালে। মাদ্রাসাটি স্থানান্তর করা হয়েছে কুতুবপুর ইউনিয়নের বড়ইকান্দি গ্রামে। কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজামউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠার পর বেশ কয়েকবার জায়গা বদল করে এখন ধলিরকান্দি গ্রামে। নদীর আগ্রাসী আচরণের জন্য স্কুলটি আবারও স্থানান্তর হতে পারে, জানালেন প্রধান শিক্ষক তরিকুল ইসলাম। এই ইউনিয়নের মথুরাপাড়া বাজার আর দেবডাঙ্গা বাজার দুটি ভাঙনের ফলে এখন পাশাপাশি অবস্থান নিয়েছে।

চন্দনবাইশা ইউনিয়নের প্রাচীন নাম নওখিলা। ১৮৭১ সালে নাটোরের দিঘাপতিয়ার জমিদার প্রমদানাথ রায় এখানে একটি জুনিয়র হাইস্কুল (নওখিলা পিএন) ও একটি দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলেন। ব্রিটিশ শাসনামলে এখানে কাচারি বাড়ি স্থাপন করা হয়। ওই সময় খাজনা লেনদেনের জন্য বগুড়ার মধ্যে এখানেই প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৮৮২ সালে নওখিলা পিএন জুনিয়র স্কুলকে হাই স্কুলে উন্নীত করা হয়। বগুড়া জেলার পুরনো পোস্ট অফিসের একটি চন্দনবাইশায়। বাংলায় টেলিফোন যোগাযোগের একেবারে শুরুর দিকে চন্দনবাইশার সঙ্গেই প্রথম কলকাতার টেলিফোন যোগাযোগ হয়েছিল বলে জনশ্রুতি আছে। ১৯৬৪ সালে বগুড়া জেলার দ্বিতীয় ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় চন্দনবাইশায়। সব হারিয়ে এই ইউনিয়নের একটি মাত্র মৌজা টিকে আছে, সেটি হলো ঘুঘুমারী। ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানগুলো জোড়াতালি দিয়ে এই ঘুঘুমারীতেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চন্দনবাইশার অধিকাংশ মানুষ চলে গেছে বগুড়া জেলার শেরপুর আর ধুনটে। ধুনটে চলে যাওয়া উজ্জ্বলকুমার বললেন আক্ষেপের কথা, ‘আমরা ব্যক্তিগতভাবে কী হারিয়েছি সে হিসাব না-হয় বাদই দিলাম। কিন্তু অনেক ইতিহাস আর ঐতিহ্যসমৃদ্ধ চন্দনবাইশা এখন নদীগর্ভে। একে রক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। ’ 

সারিয়াকান্দির হারিয়ে যাওয়া গ্রামের মধ্যে রয়েছে নারাপালা, কাশিয়াহাটা, নান্দিয়ারপাড়া, চিলাপাড়া, শোনপচা। শত বছরের বসতি হারিয়ে এখনো টিকে আছে এই জনপদের অংশ। কাজলা, চালুয়াবাড়ি, কর্ণিবাড়ী, কুতুবপুর, বোহাইল, কামালপুর—এই ইউনিয়নগুলো একেবারে যমুনার তীর ঘেঁষে। কুতুবপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ইমরান আলী ও কর্ণিবাড়ীর চেয়ারম্যান আজহার মণ্ডলের সঙ্গে কথা হলো। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো তাঁদেরও বেশ বিমর্ষ দেখাল। তবু আশার কথা শোনালেন। জানালেন, নভেম্বরেই নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু হবে। এই অঞ্চলের কিছু কিছু জায়গায় গ্রোয়েন তৈরি করায় সেগুলো টিকে গেছে। এমন স্থায়ী পদক্ষেপের আশা নিয়ে রাতে ঘুমোতে যান পূর্ব বগুড়ার এই সংগ্রামী মানুষগুলো। হয়তো বসতি আর সরিয়ে নিতে হবে না। ভাঙনের শব্দে  আতংকিত হতে হবে না।


মন্তব্য