kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কই মানুষ কই যায়

মুহাজির গ্রাম ফুলতলা

ফুলতলার মানুষগুলো একটু আলাদা। লোকে বলে, ওদের রাগ নেই। গান গেয়ে দিন পার করে। দেশ ভাগে মানুষগুলো দেশান্তরিত হয়। নাম পায় মুহাজির। ফুলতলা গ্রামে এখন মুহাজিররাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। গিয়েছিলেন ইমরান উজ-জামান

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মুহাজির গ্রাম ফুলতলা

টরকির চরের উত্তর পাশে আছে এক প্রাচীন বটবৃক্ষ

আশপাশের গ্রাম টরকী, ভিটিহোগলাকান্দি, চরমশুরা কিংবা বাঘাইকান্দির জোয়ানরা তো বটেই, বুড়োরাও অবসর সময় কাটাতে যান ফুলতলায়। ফুলতলা গ্রামের গেরস্থবাড়ির ডাব, বাতাবি লেবু, পেয়ারা কিংবা শসা নাই হয়ে যায় অনেক রাতে।

তবু ফুলতলাবাসী ঝগড়া বাধায় না। একদিন অবশ্য গোল বেধেছিল, যেদিন ইদ্রিস কানার গোয়াল থেকে ছাগল উধাও হলো। লেবু, শসা সহ্য হয়, তাই বলে ছাগল! দুধ দেয়, আবার মায়াও লাগায়। ইদ্রিস কানা চিত্কার জুড়েছিল, তবে মারামারি লাগায়নি। ইদ্রিস কানাও মুহাজির।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে ভারতের অনেক মুসলমান অভিবাসী হয় পূর্ব পাকিস্তানে। তারা মুহাজির পরিচয় পায়। মুন্সীগঞ্জের টরকীরচরের জমিদার ছিলেন শ্রীনাথ হালদার। চরের উত্তর পাশে বিরাট এক বটগাছ, দক্ষিণে মহাশ্মশান। বটগাছটি এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। শ্মশানটি এখন পাকা। নিয়মিত পূজা-অর্চনা করেন সেথায় সনাতন কর্মকার। তবে জমিদার শ্রীনাথ দেশান্তরিত হয়ে ঠাঁই গেড়েছিলেন ভারতের হুগলিতে। তিনি আছেন কি না, আর থাকলেও কেমন আছেন, জানে না ফুলতলা।   

বিখ্যাত পালাকার কালাই বয়াতির ছেলে জাহেদ আলী বয়াতি। টরকীনিবাসী। তিনি জানালেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরাজ দেশ ভাগ করে দিল। হঠাৎই অনেক মানুষ নিজভূমেই অনিরাপদ বোধ করল। হিন্দু আর মুসলমান আত্মীয় থাকল না আর। ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গা বেধে গেল। অদলবদল করে এপার-ওপার হয়ে গেল মানুষ। সেই নিয়মে হুগলি জেলার ফুলতলার এক হাজার ২০০ মানুষ চলে এলো টরকির চরে। জমিদার শ্রীনাথ দলেবলে চলে গেলেন হুগলিতে। চাঁন মিয়া হাজি, কফিল উদ্দিন, আফিল খাঁ, গনি হাজি, হোসেন আলী প্রমুখ প্রতিষ্ঠা করলেন মুহাজির গ্রাম ফুলতলা।

টরকীর চর নামটি সরকারি কাগজপত্রে থাকল ঠিকই; কিন্তু লোকমুখে ফুলতলা হয়ে গেল মুহাজিরদের গ্রামের নাম। মুহাজিরদের প্রায় সবাই পীরভক্ত। চরের উত্তর পাশে ওই যে প্রাচীন বটবৃক্ষ তার তলায় মাজার বসে গেল। মাজারকে কেন্দ্র করেই কালাই বয়াতি পালাকার হয়ে উঠলেন। তাঁর শিষ্য মালেক সরকারের গানের হাতেখড়িও এই মাজারে। মাজারে শোভা পায় ফুলতলার পীর আব্দুস শকুর মালঙ্গ বাবার ছবি। পাশেই আছে কুষ্টিয়ার বাবা সোলেমান শাহর ছবি। সোলেমান শাহ কিছুকাল এখানে এসে ছিলেন। তিনিই হুগলির ফুলতলার পীর আব্দুস শকুর মালঙ্গ বাবা ও বাংলাদেশের ভক্তদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করতেন। টরকীর চরের আজিজুল হক শাহ চিশতি ছিলেন মাজারের খাদেম। বটগাছের নিচে তিনি একটি চৌচালা ঘর তুলেছিলেন। ঘরটি আছে এখনো। ফুলতলার মুহাজিরদের প্রায় সবার কাছে মালঙ্গ বাবার নামাঙ্কিত একটি ভক্ত-কার্ড আছে। সেটি তারা সযত্নে সংরক্ষণ করে। হুগলির দরগায় যাওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যায়।

ফুলতলা ছায়া-সুনিবিড়। বটতলায় ভিড় জমে বিকেলে। গান হয় গভীর রাত অবধি। মুহাজিরদের অনেকে এখন শিক্ষাদীক্ষায়ও এগিয়ে গেছে। একজন যেমন হোসেন আলী মাস্টার। দশ গ্রামে তাঁর নাম আছে। কোনো কোনো মুহাজির পাড়ি জমাচ্ছে শহরে। যেমন চাঁন মিয়ার দুই মেয়ে সালেহা বেগম ও শহরজান বিবি। ঢাকার বাড্ডায় তাঁরা বাড়ি করেছেন। তবে ওরসের দিন ঠিক চলে আসেন। মন দিয়ে গান শোনেন, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে...

 


মন্তব্য