kalerkantho


জীবন থেকে নেওয়া

বাচ্চু রিপোর্টার

পাঠকদের হাজার হাজার চিঠি পেতেন নিমাই ভট্টাচার্য। গুনে দেখা গেছে ১৩ হাজার। ১৯৬৮ সালে মেমসাহেব প্রকাশ হওয়ার পর পাঠক জানতে চাইল, এর বাচ্চু রিপোর্টার কি আপনি? ইদানীং যশোরে বেড়াতে এলে আবারও তাঁকে প্রশ্নটি করেছিলেন ফখরে আলম। উত্তরে বলেছেন, হ্যাঁ।

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বাচ্চু রিপোর্টার

মা হারা বাচ্চু অবহেলা আর অর্থকষ্টে বড় হয়েছে। কলেজ শেষ করার আগেই জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়েছে। জীবনে নন্দিনী, নীলিমারা এসেছে, তবে থাকেনি বেশি দিন। কাজ পেয়েছে স্থানীয় এক পত্রিকায়, সাব-এডিটর হিসেবে। উদয়াস্ত পরিশ্রম, কিন্তু সুখ ধরা দেয়নি। এর মধ্যে একদিন শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা আসার সময় দেখা পেল কালো মেমসাহেবের। সেই পরিচয়। ছন্দহীন জীবনে কোমল বাতাস। স্বপ্ন দেখতে থাকে বাচ্চু। কিন্তু হঠাৎই আবার ঝড় ওঠে, সব এলোমেলো হয়ে যায়।

মেমসাহেবের এই বাচ্চুর সঙ্গে কিছু মিল তো আছেই নিমাই ভট্টাচার্যের।

যেমন তিনিও মা হারিয়েছেন শৈশবে। যশোরের সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছেন। তারপর দেশভাগের সময় চলে যান কলকাতা। ১৯৫২ সালে বিএ পাস করার পর নামেন কাজের খোঁজে। সাংবাদিকতার কাজ পান। তাঁর প্রথম উপন্যাস ছাপা হয় অমৃত পত্রিকায় ১৯৬৩ সালে। উপন্যাসটি পাঠকপ্রিয় হয়। তার পর থেকে লিখতে লিখতে ১৫০টি উপন্যাস লিখে ফেলেন নিমাই ভট্টাচার্য। মেমসাহেব উপন্যাস চলচ্চিত্র রূপ পায় ১৯৭২ সালে। তাতে বাচ্চু চরিত্রে অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার আর অপর্ণা সেন হয়েছিলেন কালো মেম। অমৃত পত্রিকায় ‘রাজধানীর নেপথ্যে’ ছাপা হওয়ার পর লিখেছেন ‘রিপোর্টার’, ‘পার্লামেন্ট স্ট্রিট’, ‘ডিপ্লোম্যাট’, ‘মিনিবাস’, ‘মাতাল’, ‘ইনকিলাব’, ‘ব্যাচেলর’, ‘কেরানি’, ‘ডার্লিং’, ‘নাচনি’, ‘প্রিয়বরেষু’, ‘পিকাডিলী সার্কাস’, ‘কয়েদী’, ‘জংশন’, প্রবেশ নিষেধ, ‘ম্যাডাম’, ‘ককটেল’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান’ ইত্যাদি।

মেমসাহেব ছবিটি বক্স অফিস হিট করে। তাঁর আরো কিছু উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে। তিনি সমাজের অনেক চরিত্র নিয়ে লিখেছেন। তিনি পাঠককে কাঁদাতে পছন্দ করেন। এমন কথা প্রচলিত আছে যে তাঁর উপন্যাসে চোখের জল থাকবে। থাকবে জীবন-সংগ্রামের ইতিহাস। লেখালেখি শুরুর গল্প বললেন তিনি, ‘‘আমি তখন রিপোর্টার। একদিন দিল্লিতে ‘অমৃত’ পত্রিকার তুষার কান্তি ঘোষের সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে বললেন, তুমি গল্প-উপন্যাস লেখা শুরু করো। তাঁরই উৎসাহে আমি উপন্যাস লেখা শুরু করি। আমার প্রথম উপন্যাস ‘রাজধানীর নেপথ্যে’। উপন্যাসটি ‘অমৃত’-এ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। তুষারবাবুর অনুরোধে পরে আমি ‘রিপোর্টার’ নামের আরেকটি উপন্যাস লিখি। এটিও ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। এরপর ছাপা হয় ‘ভিআইপি’ উপন্যাসটি। ১৯৬৪ সালে রাজধানীর নেপথ্যে উপন্যাসটি বই আকারে বের হয়। বরেণ্য অধ্যাপক, দার্শনিক একসময় ভারতের রাষ্ট্রপতি সর্বোপল্লী রাধাকৃষ্ণনের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন। ’’ নিমাই ভট্টাচার্য আরো বললেন, ‘শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আমার প্রিয় ঔপন্যাসিক। আমেরিকার ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কাছ থেকে আমি প্রেরণা পেয়েছি। বাংলাদেশের কয়েকজন ঔপন্যাসিকের লেখা আমি পড়েছি। হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলনের লেখা ভালো লেগেছে। ’ সাংবাদিকতার জীবন সম্পর্কে বললেন, “১৯৫০ সালে ‘লোকসেবক’ পত্রিকার মাধ্যমে আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। শুরুতে আমার বেতন ছিল ১০ টাকা। এরপর কয়েকটি কাগজে কাজ করেছি। গুরুত্বপূর্ণ অনেক রিপোর্ট লিখেছি। সাংবাদিক হতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়। আর থাকতে হয় দূরদর্শিতা। একজন সৃজনশীল মানুষ ভালো সাংবাদিক হতে পারে। ’ বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘আমার নাড়ি বাংলাদেশেই পোঁতা। বাবা-দাদার ভিটে যশোরের শুরশুনা গ্রামে। ছায়াঢাকা গ্রাম ছিল শুরশুনা। আমাদের বাগান ছিল। পুকুর ছিল। তবে রাস্তাঘাট ছিল খুব খারাপ। আমি আমার বাবা-দাদার সেই শুরশুনা গ্রাম আর সম্মিলনী ইনস্টিটিউটের কথা কোনো দিন ভুলব না। এখানে আমার মায়া জড়িয়ে রয়েছে। তবে আমার জন্ম কিন্তু কলকাতা নারকেলডাঙ্গার রেল কোয়ার্টারে ১৯৩১ সালে। বাবা রেলে চাকরি করতেন। এরপর ১৯৪৪ সালে বঙ্গবাসী কলেজের অধ্যাপক মহিতোষ রায়চৌধুরী যশোরে প্রথম কলেজ গড়ার উদ্যোগ নিলে বাবা সুপারিনটেনডেন্টের দায়িত্ব নেন। কলকাতায় আসার পর লোন অফিসপাড়ায় থাকতাম আমরা। তখন ইংরেজবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ”

মা-বাবার কথা বললেন, ‘মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে আমার মা মারা যান। আমি বাবার কোলেই মানুষ হয়েছি। তবে আমাদের খুব অভাব ছিল। দারিদ্র্য আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। খাবারের কষ্ট ছিল। তবে আমি হারতে চাইনি। ’


মন্তব্য