kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফিরে দেখা

ওয়ালেস থেকে ওয়াইলার

পঞ্চমবারের মতো নির্মিত হলো বেন-হার। ঢাকায় এখনো নতুন বেন-হার চলছে। এই ছুতোয় বেন-হারের আগের দিনগুলোয় ফিরে গেছেন বুশরা নাজরীন

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ওয়ালেস থেকে ওয়াইলার

বেন-হার (২০১৬) ছবির এস্থার

লিউ ওয়ালেস (১০ এপ্রিল ১৮২৭-১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯০৫) : আমেরিকার ইন্ডিয়ানার ব্রুকভিলে জন্মগ্রহণ করেন। ছবি আঁকতে আর বই পড়তে ভালোবাসতেন।

তবে স্কুলে তিনি ভালো করেননি। আমেরিকান সিভিল ওয়ারে অংশ নিয়েছিলেন। নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৮১ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত চার বছর তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের কনস্টান্টিনোপলে যুক্তরাষ্ট্রের দূত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ তাঁর দায়িত্বের অংশ ছিল। ১৮৪৩ সালে ওয়ালেস তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য ফেয়ার গড লেখা শুরু করেন। বেন-হার তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস। ইন্ডিয়ানার ক্রফোর্ডসভিলে থাকার সময় বইটি লেখা শুরু করেন। শেষ করেন নিউ মেক্সিকোর গভর্নর থাকার সময় সান্তা ফেতে (১৮৭৮)। বেন-হার লেখার আগে তিনি জেরুজালেম যাওয়ার সুযোগ পাননি। জায়গাটির ভূবৈচিত্র্য ও ইতিহাস বোঝার জন্য তিনি ওয়াশিংটনের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে যাওয়া শুরু করেন ১৮৭৩ সালে। বেন-হার প্রকাশ হওয়ার পর প্রথম দিকে বিক্রি ছিল ধীরগতির। সাত মাসে দুই হাজার ৮০০ কপি বিক্রি হয়। তার পরই বিশ্বজুড়ে বইটির বিক্রি বেড়ে যায়। ১৮৮৬ সাল নাগাদ ওয়ালেস বইটির বার্ষিক রয়ালটি পেতেন ১১ হাজার ডলার (এখনকার হিসাবে প্রায় তিন লাখ ডলার)। ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত বইটির চার লাখ কপি বিক্রি হয়।

 

বেন-হার

নামটির সাধারণ অর্থ হারের ছেলে। আরেকটি অর্থ করা হয়, সাদা লিনেনের পুত্র। বেন-হার ছিল সলোমন রাজার ১২ সহকারীর একজন। লিউ ওয়ালেসের বইয়ের শুরুতে তার বয়স ১৭ এবং সে সাদা লিনেনের কাপড় পরে।

 

বেন-হার (চলচ্চিত্র, ১৯৫৯)

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মেট্রো গোল্ডউইন মায়ার। পরিচালক উইলিয়াম ওয়াইলার। বেন-হার চরিত্রটি রূপদান করেছেন চার্লটন হেস্টন। লিউ ওয়ালেসের বইটি অবলম্বনে ১৯০৭ ও ১৯২৫ সালে বেন-হার নামে দুটি নির্বাক ছবিও নির্মিত হয়েছিল। ওয়াইলারের বেন-হার সেকালের সবচেয়ে বেশি বাজেটের ছবি (১৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি)। চরিত্রগুলোর পোশাক তৈরির জন্য কস্টিউম ডিজাইনার এলিজাবেথ হাফেনডার ১০০ জনের একটি দল গড়েছিলেন। ছবির জন্য প্রয়োজনীয় মূর্তি তৈরিতে খেটেছে ২০০ মানুষ। ২০০ উট ও আড়াই হাজার ঘোড়া ব্যবহৃত হয় বেন-হার ছবিতে। ছবির স্পিকিং অ্যাক্টরের সংখ্যা ৩৭৫। ১৪৮ একর জায়গায় ৩০০ সেট ফেলা হয়েছিল। পাত্র-পাত্রীর চুল ও দাড়ি জুড়তে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায় ১৮০ কেজি চুল। এক্সট্রা ছিল প্রায় ১০ হাজার। ছবিটি প্রারম্ভিক মুক্তিতে আয় করে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার। ১২টি একাডেমিক অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয় বেন-হার এবং জেতে ১১টি।

 

বেন-হার : এ টেল অব দ্য ক্রাইস্ট

লিউ ওয়ালেসের লেখা উপন্যাসটি ১৮৮০ সালের ১২ নভেম্বর প্রকাশ করে হারপার অ্যান্ড ব্রাদার্স। বইটিকে উনিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্রিশ্চিয়ান বইয়ের মর্যাদা দেওয়া হয়। আংকেল টমস কেবিনকে (১৮৫২) টপকে এটি আমেরিকায় সর্বকালের সেরা বেস্ট সেলিং উপন্যাস হয়ে যায়। ১৯৩৬ সালে মার্গারেট মিচেলের গন উইথ দ্য উইন্ড প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি সর্বকালের সেরা বেস্ট সেলিং উপন্যাসের তকমা ধরে রাখে। বইটির আটটি অধ্যায়। প্রথম অধ্যায়ে তিনজন পূর্বদেশীয় জ্ঞানী ব্যক্তির শিশু যিশুর জন্য উপহার নিয়ে জেরুজালেমে আগমনের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। ওই অঞ্চলে তখন রোমান রাজা ছিলেন হেরড দ্য গ্রেট। তাঁকে জানানো হয়, বেথলেহেম থেকে একজন রাজা আসছেন। দ্বিতীয় অংশে পাওয়া যায় বেন-হারকে। জুডায়ার এক রাজপুত্র সে। তার বাল্যবন্ধু মেসালা। রোমান শুল্ক সংগ্রাহকের ছেলে। পাঁচ বছর রোমে পড়াশোনা শেষে একজন উদ্ধত রোমান হয়ে মেসালা ফিরে আসে জেরুজালেম। সে বেন-হার ও তার ধর্মকে ব্যঙ্গ করতে থাকে এবং তারা পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয়। ভালেরিয়াস গ্রাটাস রোমের নতুন গভর্নর হয়ে এলে তাঁর শোভাযাত্রা বেন-হারের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে থাকে। তখন ছাদের একটা অংশ ভেঙে নিচে পড়ে। আর বেন-হারকে গ্রেপ্তার করা হয় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে। বেন-হারের পরিবারের সবাইকে আনতোনিয়া দুর্গে বন্দি করা হয় এবং তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। বেন-হারকে একটি রোমান যুদ্ধজাহাজে দাস হিসেবে কাজে লাগানো হয়। তৃতীয় অধ্যায়ের ঘটনাগুলো ঘটে এজিয়ান সাগরে। রোমান নৌযানগুলো প্রায় আক্রান্ত হচ্ছিল গ্রিক জলদস্যু দ্বারা। কিন্টাস আরিয়াসকে নৌবহর দিয়ে পাঠানো হয় দস্যু দমনে। বেন-হার দাস হিসেবে খাটছিল কিন্টাসের নৌবহরে। একপর্যায়ে কিন্টাস বেন-হুরের পূর্ব ইতিহাস জানতে পারেন। বেন-হারদের জাহাজ একপর্যায়ে ডুবে যেতে থাকলে কিন্টাস তার শেকল খুলে দেন। তারা ভাসতে থাকে সমুদ্রে। পরে আরেকটি রোমান জাহাজ এসে তাদের উদ্ধার করে। কিন্টাস বেন-হারকে নিয়ে নেপলসের একটি প্রদেশ মিসেনামে যান। বেন-হারকে নিজের ছেলে বলে গণ্য করেন এবং তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে রোমান নাগরিকের মর্যাদা দেন। চতুর্থ অধ্যায়ে কিন্টাসের মৃত্যু ঘটে। বেন-হার তাঁর সম্পত্তির মালিক হয়। একবার সে এন্টিওক বেড়াতে গেলে তার বাবার প্রধান দাস সিমিওনিডের দেখা পায়। সিমিওনিড তত দিনে অনেক সম্পদের মালিক। মেসালার দেখাও পায় সে এন্টিওকে। বেন-হার মেসালাকে শিক্ষা দিতে চাইছিল। সে শেক ইলডেরিম নামের এক রথ চালকের কাছে প্রশিক্ষণ নেয়। রথ দৌড়ের একপর্যায়ে মেসালার রথ স্টেডিয়ামে বসে থাকা বালথাসার (পূর্বদেশীয় তিন জ্ঞানীর একজন) ও তাঁর কন্যা ইরাসকে ধাক্কা দিতে গেলে বেন-হার গিয়ে রক্ষা করে। মেসালা বেন-হারকে নতুন রূপে দেখতে পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়। ওদিকে বালথাসার বেন-হারকে জানান, খ্রিস্ট ত্রিশে পা রাখছেন এবং শিগগিরই মানুষের মধ্যে নিজেকে তুলে ধরবেন। বেন-হার বালথাসারের মেয়ে ইরাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়। পঞ্চম অধ্যায়ে মেসালাকে পরাজিত করে বেন-হার। ষষ্ঠ অধ্যায়ে বেন-হার মা ও বোনকে খুঁজতে জেরুজালেম যাত্রা করে। তখন ইহুদিরা রোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংঘটিত করছিল। সপ্তম অধ্যায়ে বেন-হার বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, একপর্যায়ে নতুন নবীর সাক্ষাত্প্রার্থী হয়ে জর্দানের পথে রওনা হয়। পথে ইরাস ও বালথাসারকে সঙ্গী পায়। অষ্টম অধ্যায়ে বেন-হার খ্রিস্টের শিষ্য হয়ে ওঠে। যিশুখ্রিস্ট বেন-হারের মা ও বোনকে আরোগ্য দান করেন। যিশু জেরুজালেমে বন্দি হন এবং পরে ক্রুশবিদ্ধ হন। বেন-হার উপলব্ধি করে, খ্রিস্ট আসলে মুক্তির দূত এবং পৃথিবীর নন, তিনি স্বর্গের রাজা। এ অধ্যায়েই বেন-হার সিমিওনিডের মেয়ে এস্থারকে বিয়ে করে এবং নেপলসের মিসেনামে বসবাস করতে থাকে।


মন্তব্য