kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তোমায় সালাম

অভিবাসীদের বন্ধু

অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত অভিবাসন আইনজীবী ডেভিড এল বিটেল ছিলেন অভিবাসী বাংলাদেশিদের বন্ধু। ২০ আগস্ট তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া। জানাচ্ছেন মামুন রশীদ

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অভিবাসীদের বন্ধু

অনেক দিন ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে ২০ আগস্ট গ্রিনউইচ হাসপাতালে মারা গেলেন ডেভিড এল বিটেল। ৬৪ বছর বয়সী এই অভিবাসন আইনজীবীর কল্যাণে অনেক বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ (পারমানেন্ট রেসিডেন্সি) পেয়েছেন।

অভিবাসনসংক্রান্ত যেকোনো জটিল বিষয় নিয়ে তাঁর কাছেই ছুটে যেতেন বাংলাদেশিরা। অস্ট্রেলিয়ার ডিটেনশন সেন্টারে আটক অনেক বাংলাদেশিকে সহযোগিতা করেছেন ডেভিড। তাঁর মাধ্যমে অনেকেই মুক্তি পেয়েছেন ডিটেনশন সেন্টার থেকে।

ডেভিড ছিলেন রিফিউজিদের বন্ধু। রিফিউজিদের পক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল কোর্টে কমপ্লিমেন্টারি প্রটেকশন ভিসার মামলা করে জয়লাভ করেন। ফলে বাংলাদেশিসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের রিফিউজিরাও দ্বিতীয়বার অস্ট্রেলিয়া থাকার সুযোগ পেয়েছেন। কিছুদিন আগে তিনি ফেডারেল কোর্টে পার্টনার ভিসা মামলায়ও জয়লাভ করেন।

বিটেলের ‘পেরিশ প্যাশেনস ইমিগ্রেশন ল-ইয়ারস’ বর্তমানে ইনকরপোরেট কম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এই কম্পানিতে রয়েছেন ছয়জন শেয়ারহোল্ডার ও সাতজন পরিচালক। তাঁদের মধ্যে দুইজন শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালক বাংলাদেশি, যাঁরা ১০ বছরের বেশি সময় ডেভিডের সঙ্গে কাজ করছেন।

অভিবাসনের কাজে অনেকবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। শেষ এসেছিলেন ২০১২ সালে এপ্রিল মাসে। ঢাকায় ছিলেন ২৭ থেকে ২৯ এপ্রিল। আসার কারণও ছিল। সে বছর একটি প্রতিষ্ঠান ডেভিডের নাম ব্যবহার করে ঢাকার বিভিন্ন দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোকজনের সঙ্গে প্রতারণা করছিল। এরা অস্ট্রেলিয়ান অভিবাসন আইন সম্পর্কে নানা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে লোকজনকে ঠকাচ্ছিল। যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন, তাঁদের আইনগত পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতে এসেছিলেন ডেভিড। বাংলাদেশে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। আরেকটি ব্যাপারে তিনি পরামর্শ দিতে এসেছিলেন। ২০১২ সালের জুলাই থেকে দক্ষ জনশক্তির জন্য অস্ট্রেলিয়ায় নতুন অভিবাসন নীতি চালু হয়েছিল। বাংলাদেশে থেকে প্রকৌশলী ও আইটি প্রফেশনালদের এর সুযোগ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের সুযোগ ছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে যাঁরা পড়াশোনা, ব্যবসা অথবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে অস্ট্রেলিয়া যেতে চান, তাঁদের ডেভিড পরামর্শ দিয়েছিলেন।

অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা, ব্যবসা, স্থায়ীভাবে বসবাস ও সব ধরনের মাইগ্রেশন-সংক্রান্ত তথ্য দিতে এ বছর জুন মাসে ডেভিড এল বিটেলের প্রতিনিধিত্বে মালয়েশিয়ায় যায় অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন আইনজীবীদের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে তারা অস্ট্রেলিয়ায় যেতে আগ্রহীদের সঙ্গে অভিবাসন বিষয়ে তথ্য শেয়ার করেন। অস্ট্রেলিয়ায় মাইগ্রেশনের অনেক কিছুই প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানে না। সেখানে মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও সেগুলো জানার সুযোগ পেয়েছিল।

বাংলাদেশে এসে ডেভিড বিটেল শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তখন ছিলেন বিরোধীদলীয় নেত্রী। সেই সাক্ষাতের ছবি ডেভিড নিজের অফিসে বাঁধিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর বন্ধু। তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টির প্রভাবশালী সদস্য। ফলে বাংলাদেশ থেকে কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক অতিথি অস্ট্রেলিয়া সফরে এলে সে দেশের মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাতেও ডেভিডের সাহায্য নেওয়া হতো। বাংলাদেশের ১/১১ সংকটময় মুহূর্তে তিনি সিডনির আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশিদের নানা কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশিদের অনেক অনুষ্ঠানে স্পন্সর করতেন।

১৯৫২ সালে ১ মার্চ মলদোভায় এক ইহুদি পরিবারে ডেভিড এল বিটেলের জন্ম। ১৯৪৯ সাল থেকে তাঁদের পরিবার অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস শুরু করে। ডেভিড আবাসন আইনে একজন বিশেষজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে ১৯৭৬ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস স্টেটের সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্টে কাজ শুরু করেন। শরণার্থী অভিবাসন আইনে তাঁর ছিল বিশেষ দক্ষতা। ১৯৯৫-২০০৫ পর্যন্ত তিনি রিফিউজি কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি ছিলেন। ১৯৯৮ থেকে তিনি রিফিউজি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং রিফিউজি অ্যাডভাইস অ্যান্ড কেসওয়ার্ক সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এ ছাড়া তিনি ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইস অ্যান্ড রাইট সেন্টার এবং দ্য অস্ট্রেলিয়ান ফোরাম অব হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্ট-এর অস্ট্রেলিয়া সেকশনের সেক্রেটারি জেনারেল এবং মাইগ্রেশন ইনস্টিটিউট অব অস্ট্রেলিয়ার সদস্য ছিলেন।


মন্তব্য