kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রকৃতি সুন্দর

টাঙ্গুয়ার হিজল-করচ

শামস শামীম   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



টাঙ্গুয়ার হিজল-করচ

হিজল বিছানো বনপথ দিয়া

রাঙায়ে চরণ আসিবে গো প্রিয়া

কবি কাজী নজরুল ইসলাম আরেক গানে বলেছেন, ‘পিছল পথে কুড়িয়ে এলাম হিজল ফুলের মালা কী করি এ মালা নিয়ে বল চিকন কালা। ’ গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানেও হিজল আছে

হাওরে পানি নাইরে যেথা

নাইরে তাজা মাছ

বিলের বুকে ডানা মেলা

নাইরে হিজল গাছ বন্ধু

 

হিজলের লম্বাটে ডাঁটায় হালকা গোলাপি ফুল ধরে।

অনেক সাহিত্যিকই হিজলের ঘ্রাণে বিভোর হয়েছেন। জলের গাছ করচও কিন্তু সাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছে। সুনামগঞ্জের প্রায় সাড়ে তিন শ ছোট-বড় হাওরের সবগুলোতেই হিজল-করচের বাগ দেখতে পাওয়া যায়।

টাঙ্গুয়ার হাওরে আছে দেশের অন্যতম বড় হিজল-করচের বাগান। ধুলোপড়া নাগরিক চোখকে আরাম দিতে বছর বছর দাঁড়িয়ে আছে। পর্যটকরা আসে শীতে, বর্ষায়ও। টাঙ্গুয়ার হাওর সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট এলাকা। নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিলখ্যাত এ হাওরের জঙ্গল কান্দায় সারি সারি লাখো হিজলের মেলা। সোলেমানপুর থেকে জয়পুর গোলাবাড়ি রনচি পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে হিজল-করচের বাগ।

শীত মওসুমে ভিন্ন রকম সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয় হিজল-করচের বাগ। বিদেশি পাখির আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে তখন গাছগুলো। পাখিগুলোকে ফুলের মতো দেখায় সেসব দিনে। শন শন ডানার উড়াল তখন গীত মনে হয়। কয়েক মাইলজুড়ে শোনা যায় পাখির গান। আর বর্ষা-হেমন্তে হিজল-করচের ছায়া হাওরের জলে ছায়া ফেলে মায়া লাগায়। হিজল-করচের বাগ হাওরের আফাল থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষার দেয়াল হিসেবেও কাজ করে। ভরা বর্ষার উত্তাল হাওরে যখন ঢেউয়ের গর্জন ওঠে, তখন এই হিজলের গাছে নৌকা বাঁধে মত্স্যজীবীরা, ঝাপটা সামলায়।

আশির দশকে জয়নাল আবেদিন নামের এক বৃক্ষপ্রেমিক ইজারাদার সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে প্রায় এক লাখ হিজলের চারা লাগিয়েছিলেন। এই চারাগুলোই এখন ভীষণ সুন্দরে রূপ নিয়েছে। বাদবাকি জাঙ্গাল কান্দায়ও প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া কিছু হিজল-করচের গাছ রয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের কথিত ‘নয় কুড়ি কান্দার ছয় কুড়ি বিল’জুড়েই হিজলের সবুজ হাতছানি দেখতে পাওয়া যায়।

১০ থেকে ১৫ মিটার উচ্চতার জলসহিষ্ণু বৃক্ষ এই হিজল। বাঁচে বহুদিন। সংস্কৃত নাম নিচুল। বাংলায় ‘নদী ক্রান্ত’, ‘জলন্ত’, ‘কার্ম্মক’ ও ‘দীর্ঘ পত্রক’ বলেও ডাকা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে হিজলের ফুল ফোটে। হালকা গোলাপি রঙের ফুল গাছের লম্বাটে ডাঁটায় সারি সারি মালার মতো ফুটে থাকে। হিজলগাছের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণও। বাংলাদেশ ছাড়াও এই গাছ মালয়েশিয়া আর অস্ট্রেলিয়ায় জন্মে। তবে নতুন গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে না টাঙ্গুয়ায়। রক্ষণাবেক্ষণও হচ্ছে না ঠিকমতো। ফলে কমছে হিজলগাছ।

আর করচও বহুবর্ষজীবী গাছ। ঘন ডালপালা হয় এর। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার ও নেপালে জন্মে। করচের তেল বায়োডিজেল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে শোনা যায়। এপ্রিল মাসে করচের ফুল ফোটে। টাঙ্গুয়ার হাওরের হিজল-করচ মনে হয় সখাসখি।

হিজলের ডালপালা মাছের অভয়ারণ্য তৈরিতে ব্যবহূত হয়। মত্স্য আহরণের শুরুতে এই ডালপালা পাতাসহ জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হয়। হিজলের পাতা মাছেরা খুব পছন্দ করে। অতিথি পাখির পরেই টাঙ্গুয়ার হাওরের অন্যতম আকর্ষণ হিজল-করচ।

    

ছবি : আরিফিন বিল্লাহ


মন্তব্য