kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শীতল পাটিতে বাংলাদেশ

কখনো পাঠশালার পথ মাড়াননি। তবু মানচিত্র দেখে দেখে শীতল পাটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলাদেশ, লিখেছেন বিভিন্ন স্থানের নাম। তিনি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার দোয়াখাঁ গ্রামের মাহমুদা খাতুন। তাঁর শীতল পাটি দেখতে গিয়েছিলেন ইসলাম জাভেদ, ছবি তুলেছেন আবদুর রহিম

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শীতল পাটিতে বাংলাদেশ

‘মুই পড়া জানি না। ফুড়িরে (মেয়েকে) কইলাম মানচিত্র ধইরা সামনে খাড়া তাখ; ওলা-উ (এভাবেই) মানচিত্র আঁখছি।

’ এভাবেই দেখে দেখে শীতল পাটিতে বাংলাদেশের মানচিত্র তৈরি করেছেন মাহমুদা খাতুন। ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে শীতল পাটি তৈরি করা শিখেছেন। সে সময় তাঁর স্কুলে যাওয়া হতো না। তাই বাড়ির পাশের মুত্রাগাছের ছাল থেকে বেত বের করে শীতল পাটি তৈরি শুরু করেন। গতানুগতিকের বাইরে নতুন কিছু করার চিন্তা সব সময় তাঁর মনকে নাড়া দিত। তিনি বলেন, ‘পয়লা পয়লা ফুল, পাখি আঁকছি, বিয়ার পর আমার মেয়ে তখন হুরু (ছোট), আখতা মনে ওইল দেশের মানচিত্র আঁখতাম। ’ সেই চিন্তার ধারাবাহিকতায় শীতল পাটিতে বাংলাদেশের মানচিত্র তৈরি করেন এই বৃদ্ধা। এটি বেশ সময়সাপেক্ষ ও পরিশ্রমের কাজ। ধৈর্য ধরে রাখতে হয়। পাটিতে বাংলাদেশের মানচিত্রটি তৈরি করতে লেগেছে দুই মাসের মতো।

পাটিতে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকতে তাকে সাহায্য করেছেন মেয়ে আছিয়া বেগম। তবে আছিয়া বেগম পাটি তৈরি করতে জানেন না। মানচিত্রে বিভিন্ন জেলা, ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন প্রদেশের নাম, বঙ্গোপসাগর এবং বার্মার (বর্তমানে মিয়ানমার) নাম রয়েছে। মাহমুদা খাতুনের এই প্রতিভা শুধু আত্মীয়স্বজনের মাঝেই সীমাবদ্ধ। প্রচারে বিশ্বাসী নন তিনি। শখ করে বানিয়েছেন, তারপর অনেককে উপহার দিয়েছেন। বিক্রির উদ্দেশে এ কাজ করেননি। অনেক আত্মীয় তাঁর এই শিল্পকর্ম ব্রিটেন পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। ফলে ব্রিটেনের অনেক বাঙালির ড্রইং রুমে শোভা পাচ্ছে মাহমুদা খাতুনের বোনা পাটি। মানচিত্র দিয়ে তৈরি পাটিটি তাঁর প্রিয় নাতনি ফৌজিয়া ইসলাম তারিকাকে উৎসর্গ করেছেন। পাটিতে লেখা আছে সেটি।

মাহমুদা খাতুনের জন্ম বিয়ানীবাজার উপজেলায় আরেঙ্গাবাদ গ্রামে। বাবা আনফর আলী, মা সয়দা বিবি। বিয়ে হয় একই উপজেলার মাথিউরা ইউনিয়নের দোয়াখাঁ গ্রামের সাহেব বাড়িতে। মাহমুদা খাতুনের স্বামী ওয়ারিছ আলী কয়েক বছর আগে মারা যান। মৃত্যুর পর সংসারে নেমে এসেছিল অভাব-অনটন। এখন মাহমুদা খাতুনের সংসার বলতে একমাত্র মেয়ে, মেয়ের জামাই, নাতি ও নাতনি। শখের বশে পাটি তৈরি করলেও এই শিল্পকর্মে মেয়ে-জামাই আবদুর রাজ্জাকও অনুপ্রেরণা দেন। মাহমুদা খাতুনের নাতি শরিফুল ইসলাম বলেন, নানি একক চেষ্টায় কাজটি করেছেন।

দেশের মানচিত্র ছাড়াও শীতল পাটিতে হরেক শিল্পকর্ম এঁকেছেন মাহমুদা খাতুন। সেগুলোতে রয়েছে ফুল, প্রাকৃতিক দৃশ্য, বিভিন্ন আলপনা। তিনি শিখেছেন মায়ের কাছ থেকে। তাঁর এই শিল্পকর্মের উত্তরসূরি কে? আক্ষেপ করে বলেন, ‘মেয়েরে শিখাইবার চেষ্টা করেছি, পারিনি। ’


মন্তব্য