kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পুড়ে যাওয়া দিনগুলো

টাম্পাকোর আগুনে পুড়েছে স্বপ্নও। মো. তানভীর হাসান রোহান ক্যামেরায় আগুন লাগা দিনগুলো ধরেছেন আর হাতড়ে বেড়িয়েছেন স্বপ্নগুলো। ছয় দিনের আটটি অভিজ্ঞতা বলেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ককে।

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পুড়ে যাওয়া দিনগুলো

মো. তানভীর হাসান রোহান

ঢাকায়ই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পেশায় গাড়ি ব্যবসায়ী।

আলোকচিত্র ধারণ তাঁর শখ। জীবনের আকস্মিক মুহূর্তের ছবি ধরতে পছন্দ করেন। বেড়াতে পছন্দ করেন এবং নতুনদের সঙ্গে পরিচিত হতে ভালোবাসেন। প্রিজম থেকে তিনি বেসিক ফটোগ্রাফির কোর্স করেছেন। আলোকচিত্রে প্রায় ১০০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এবারের সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস (জাতীয় পর্যায়)।

 

 

ছবি পরিচিতি

১১ সেপ্টেম্বর। সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছিলাম টাম্পাকো। কারখানার পেছন দিকের কিছু ছবি তুলে ফায়ার সার্ভিসের একজন সদস্যের কাছে জানতে চাইলাম, ‘কারখানার ভেতরে যাওয়ার কোনো রাস্তা আছে কি না?’ তিনি বললেন, ‘সামনের দিকে একটা অ্যান্ট্রান্স আছে। কিন্তু সেটা খুব রিস্কি। আমি তবু সামনের দিকে গেলাম। দেখি ধ্বংসস্তূপ। তার মধ্যে একটা প্রাইভেট কার আর দুটি সাইকেলও আছে। আশপাশে আরো কিছু পোড়া টায়ার দেখলাম। বুঝলাম এটা ছিল কারখানার পার্কিংপ্লেস। দূরের শ্রমিকরা এখানে সাইকেল রেখে কাজে লাগত। সেদিনও দুজন শ্রমিক হয়তো সাইকেল স্ট্যান্ড করে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। সাইকেল দুটি তবু এক রকম আছে, কিন্তু মানুষগুলো?

 

১০ সেপ্টেম্বর : আগুন লাগার দিন

প্রতিবছর ঈদের সময় মানুষের বাড়ি ফেরার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করি। বাসস্টেশন, রেলস্টেশন বা লঞ্চঘাটে  ক্যামেরা হাতে ছুটে যাই। ১০ তারিখ সকালেও বিমানবন্দর রেলস্টেশনে গিয়েছিলাম ছবি তুলতে। তখন সকাল ১০টা হবে। ঘরমুখী মানুষ ফ্রেমবন্দি করছিলাম। একসময় টঙ্গীর দিক থেকে একটি ট্রেন এসে থামল। এক ভদ্রলোক ট্রেন থেকে নেমে কাছে এসে বলল, ‘ভাই, টঙ্গী যান। ওখানে আগুন জ্বলতাছে। ’ আমি তখনো ভয়াবহতা আঁচ করতে পারিনি। তবু গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম। কিন্তু রাস্তায় বিকট জট। গাড়ি এগোতেই পারছিল না। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। কোনোমতে জসীমউদ্দীনে গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে ফেললাম। ক্লায়েন্টের সঙ্গে দুপুরে মিটিং ছিল। তাই টাম্পাকো যাওয়া হয়নি।

 

১১ সেপ্টেম্বর (দ্বিতীয় দিন)

অপেক্ষা

পেছনের অংশে ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ দেখি পাশের ভবনের দেয়াল ঘেঁষে তিনজন বয়স্ক নারী জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন। চোখে-মুখে রাজ্যের হতাশা। দুজনের মাথায় হাত। একজন হাত দুটি রেখেছেন থুতনিতে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনাদের পরিচিত কেউ কি কারখানায় কাজ করত?’ একজন কেবল মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। অন্যরা বুঝি সে শক্তিটুকুও হারিয়েছেন!

 

 

১২ সেপ্টেম্বর (তৃতীয় দিন)

অবাক ছবি

ঈদের ঠিক আগের দিন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই পৌঁছে যাই টাম্পাকো। দুদিনে টাম্পাকোর চারপাশে হাঁটুপানি জমেছে। পানি আর কাদায় প্যান্ট ভিজে একাকার। সামনের দিক থেকে বিল্ডিংয়ের কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুলতে থাকি। একটা ছবি তুলতে গিয়ে অবাক হলাম। দোতলার ভাঙা দেয়ালের একটি অংশ দিয়ে ভেতরটা দেখা যাচ্ছিল। এক কামরায় একটি খাট অক্ষত ছিল। খাটের ওপরে তোশক, বিছানা-চাদর, বালিশও ছিল ঠিকঠাক। বালিশের ওপরের অংশের দেয়ালে একটা ছবি টানানো। তাতে দুজন মানুষ আছে। কিন্তু ধোঁয়া আর ধুলাবালিতে অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

 

১৩ সেপ্টেম্বর (ঈদের দিন)

তাদের বুঝি ঈদ নেই

দুপুরে রওনা দিয়েছিলাম। রাস্তাঘাট ছিল ফাঁকা। পৌঁছে দেখি, আগের দিনগুলোর মতোই আছে টাম্পাকো। পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিরলস উদ্ধার তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। সন্ধ্যা নামার পর দোতলায় একটা কক্ষে দেখলাম আগুন তখনো জ্বলছে। উদ্ধারকর্মীরা বুঝি ভুলেই গেছেন আজ ঈদ। একজনের সঙ্গে কথা বললাম। নামটি ঠিক মনে নেই। বললেন, ‘আগের ঈদেও বাড়ি যেতে পারিনি। এবার সব ঠিকঠাক করে রেখেছিলাম। মেয়েকে বলেও রেখেছিলাম, ঈদের আগের দিনই চলে আসব। এখন দ্যাখেন পরিস্থিতি। কিভাবে যাই?’

 

 

১৫ সেপ্টেম্বর (ষষ্ঠ দিন)

সেই দিয়েছে সকল শূন্য করে

পারিবারিক ব্যস্ততায় ১৪ সেপ্টেম্বর যেতে পারিনি। ১৫ তারিখ দুপুরবেলা চলে গিয়েছিলাম। টঙ্গী ব্রিজের ওপর থেকে ছবি তুলছিলাম। তখন পেছনের অংশের আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। দেখলাম, নিখোঁজদের স্বজনরা ভিড় করছে। দায়িত্বশীল কাউকে দেখামাত্র কথা বলতে ছুটে যাচ্ছে। ব্রিজ থেকে নিচে নামলাম। একজনকে দেখলাম হাতে স্বজনের ছবি নিয়ে উদ্ভ্রান্ত। যার হাতে এই ছবি, তার নাম আবু তাহের। বড় ছেলে রিয়াদ ও তার স্ত্রী-সন্তান, আরো কিছু আত্মীয়স্বজন মিলে আবু তাহের এসেছেন ছেলের সন্ধানে। নিখোঁজ ছেলের নাম মুরাদ। বয়স ২২ বছর। টাম্পাকোয় হেলপার হিসেবে কর্মরত ছিল। রাতের শিফটে ডিউটি করত। আগুন লাগার দিনেও কারখানার মধ্যেই ছিল মুরাদ। রিয়াদের স্ত্রী জানালেন, চাকরিটা পেয়েছিল মুরাদের বড় ভাই রিয়াদ। কিন্তু রিয়াদ চাকরি করবে না দেখে ছোট ভাইকে দিয়ে দেয়! যত দূর জানি, এখন পর্যন্ত (২৬ সেপ্টেম্বর) মুরাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

 

১৫ সেপ্টেম্বও (ষষ্ঠ দিন, বিকেল) কেউ কি আছেন?

ভেতর থেকে ধ্বংসস্তূপ অপসারণ করছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। হঠাৎ একজন মানুষের দিকে চোখ পড়ল। গায়ে ফুল হাতা টি-শার্ট। ঘেমে ভিজে গেছেন। পরনে গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কাত হয়ে উঁকি মেরে কী যেন খুঁজছেন তিনি। ভেতরে আর কোনো লাশ আছে কি না সম্ভবত সেটাই খুঁজছিলেন। জানতে পেরেছিলাম, লোকটি সিটি করপোরেশনের কর্মী।

 

 

 

১৬ সেপ্টেম্বর (সপ্তম দিন)

বই-খাতা ভিজে যাচ্ছে

টাম্পাকোর পেছনের অংশে বস্তির মতো অনেক টিনশেড। অগ্নিকাণ্ডে সেই বাড়িগুলোর বাসিন্দারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেদিন গিয়ে শারমিন আক্তার নামে একজনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানালেন, ‘সবাই ঘুমাচ্ছিল। বিস্ফোরণের শব্দে আমরা উঠে পড়ি। সবাই মিলে ঘরের বাইরে চলে যাই। দেখি টাম্পাকোতে আগুন জ্বলছে। কারখানার দেয়াল ভেঙে ঘরের ওপর পড়ায় আমাদের ১৫টির মতো ঘর ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তারপর থেকে বিপদের মধ্যেই আছি। খাওয়ার পানি নেই, ওদিকে আগুন নেভানোর পানিতে বাচ্চাদের বই-খাতাও ভিজে যাচ্ছে। ’

 

একনজরে টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেড

♦   টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার উড়াল সড়কের নিচে রেলগেটের পূর্ব পাশ থেকেই বিসিক শিল্পনগরীর শুরু। সেখানে ২ নম্বর প্লটে প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর টাম্পাকো প্যাকেজিং কারখানা। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কারখানাটির মালিক সিলেটের গোলাপগঞ্জের সৈয়দ মকবুল হোসেন (লেচু মিয়া)। মকবুল হোসেন ১৯৭৫ সালে সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে শিল্পোদ্যোক্তা হন। ১৯৮৬ ও ২০০১ সালে তিনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হন।

♦   কারখানাটিতে মূলত ফয়েল পেপারের পাশাপাশি চানাচুর, বিস্কুট, চিপস, দুধ, সিগারেটসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নানা ধরনের প্যাকেটও তৈরি করা হতো। দেশে এ ধরনের কারখানার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়।

♦   দেশি-বিদেশি মোট ৩১টি গ্রাহক প্রতিষ্ঠান আছে টাম্পাকোর।

♦   ১০ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৫টায় বিস্ফোরণ ঘটে। আগুন লেগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় টাম্পাকোর দুটি ভবন। ঈদের আগে দিনটি ছিল কারখানায় শেষ কর্মদিবস।

♦   তিন শিফটে কাজ হতো কারখানায়। টাম্পাকোর মালিক ১০ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁর মোট শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫০। তবে দুর্ঘটনার মুহূর্তে ‘কমবেশি’ ৭০-৭৫ জন কর্মরত ছিলেন।

♦   ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৩৯ জন। বেশির ভাগের মৃত্যু হয়েছে অগ্নিদগ্ধ হয়ে। আগুনে কারখানার কাঠামো ভেঙে পড়ায় নিচে চাপা পড়েও কয়েকজন নিহত হন।

♦   নিহত ৩৯ জনের মধ্যে একজন রিকশাচালক, দুজন পথচারী ও পাশের বাড়ির একটি শিশুও রয়েছে।

♦   ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস, গাজীপুর জেলা প্রশাসন, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিনটি পৃথক কমিটি কাজ করছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এটুকুই শুধু বলেছেন, বিস্ফোরণের কারণ বয়লার বা গ্যাস নয়, ‘সম্ভবত রাসায়নিক’।


মন্তব্য