kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আজ আমরাও

কৃষ্ণা দ্য ক্যাপটেন

মেয়েটা যে এত দূর যাবে জানত কি পাথালিয়া? মাসুম সায়ীদ এ প্রশ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নগদা শিমলা ইউনিয়নে

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কৃষ্ণা দ্য ক্যাপটেন

গাঁয়ের প্রায় শেষ প্রান্তে কৃষ্ণা রানীর বাড়ি। বাঁশঝাড়ে ঘেরা।

একান্নবর্তী পরিবারের সবাই খুব সাধারণ। বাবা বাসুদেব কৃষক। মা নমিতা রানী গৃহিণী। আর দুই কাকা স্বর্ণকার। কোনো রকম চলে তাঁদের সংসার। অনূর্ধ্ব ১৬ জাতীয় দলের অধিনায়ক কৃষ্ণা। জাতীয় দলেরও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ১২ নম্বর জার্সি পরেন।

 

ফুটবলে প্রথম পা

ছোট কাকা নিতাই। একদিন বাড়িতে নিয়ে এলেন একটি ফুটবল। ভাইয়ের সঙ্গে সেই ফুটবল নিয়ে বাড়ির উঠানে মেতে উঠলেন কৃষ্ণা। উঠান থেকে বাহির বাড়ি। সঙ্গে জুটল পাড়াপড়শি জনাকয়েক। সবাই ছেলে, শুধু কৃষ্ণা ছাড়া। মা বকে। তাঁর চিন্তা মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে দুদিন আগে আর পরে। সরাক্ষণ ছেলেদের সঙ্গে বল নিয়ে মেতে থাকলে লোকে কি বলবে? বাবা হাসেন—খেলুক না। ফুটবল পেলেই কেবল তিনি দুরন্ত হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া কৃষ্ণা তো শান্ত আর লক্ষ্মী মেয়েই।

 

কৃষ্ণা গেলেন মাঠে

উঠান ছাড়িয়ে বল গিয়ে গড়াল মাঠে। পাড়াগাঁয়ের পুরনো দিনের স্কুল। সামনে বিশাল মাঠ। স্কুলের ছেলেরা ফুটবল নিয়ে খেলে। কৃষ্ণাও যোগ দেন। মেয়েলি কোনো খেলা তাঁকে টানে না। গাছতলার জটলাও না। অন্য মেয়েরা হাসাহাসি করে। কৃষ্ণা গায়ে মাখেন না। ধীরে ধীরে কমে যায় মায়ের বারণ, স্যারের শাসন। থেমে যায় সহপাঠীদের হাসাহাসিও। বান্ধবীরা কেউ কেউ আবার জড়তা ভেঙে পা ছোঁয়ায় ফুটবলে, তাঁকে দেখেই। বলের সঙ্গে গভীর হতে থাকে কৃষ্ণার সখ্য। আর তার পরই হঠাৎ আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!

 

শিকল ভাঙার গান

২০১২ সালের কথা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হলো ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ’। স্কুলে স্কুলে নির্দেশ গেল দল গঠন করার। আর তাতেই কদর বেড়ে গেল গেছোবালিকাদের। উত্তর পাথালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছায়েম আল মামুনের ওপর দায়িত্ব পড়ল দল গঠনের। কৃষ্ণার সুবাদে বেশ কয়েকজন মেয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেছে আগেই। কৃষ্ণাকে মধ্যমণি করে গড়ে ওঠে তাঁদের দল। প্রথমবারেই বাজিমাত। গোপালপুর উপজেলায় রানারআপ হন কৃষ্ণারা। দল চ্যাম্পিয়ন না হলেও শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের পদক পান কৃষ্ণা। পরপর দুবার। আর এখানেই নজরে পড়েন খেলোয়াড় তৈরির কারিগর গোলাম রায়হানের। তিনি গোপালপুর উপজেলা সদরের সুতি ভিএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক। তাঁর একান্ত ইচ্ছা আর প্রধান শিক্ষকের আগ্রহে কৃষ্ণার বাবাও রাজি হন প্রাইমারির পর মেয়েকে সেখানে ভর্তি করাতে। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব আট কিলোমিটারের ওপর। স্কুলের ক্লাস শুরু হয় সাড়ে ১০টায়। কিন্তু ফুটবলের প্র্যাকটিস শুরু হয় সাত-সকালে। বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার হেঁটে তারপর সিএনজি কিংবা ভ্যানে করে স্কুলে যান কৃষ্ণা। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় তুচ্ছ হয়ে যায় পথের কষ্ট। সহজাত প্রতিভা তো ছিলই, তার পরও কৃষ্ণার দৃঢ়তা, কষ্টসহিষ্ণুতা আর কোচ রায়হানের নিবিড় তত্ত্বাবধানে অল্প দিনেই চৌকস খেলোয়াড়ে পরিণত হন কৃষ্ণা। পায়ে লাগে বুট, গায়ে জার্সি। সুতি ভিএম স্কুল সারা দেশের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়। একবার নয়, পরপর তিনবার। আর এই কৃতিত্বে অগ্রণী ভূমিকা কৃষ্ণা রানীর। ‘দুই পা সমানে চলে তাঁর। তবে বাঁ পায়ের শট বেশি জোরালো। প্রতিপক্ষের সীমানা তিনি দাপিয়ে বেড়ান। খুবই ট্যালেন্ট একজন ফুটবলার’—গর্বের সঙ্গেই বললেন প্রথম গুরু রায়হান।  

সীমানা পেরিয়ে

২০১৩ সালে শুরু হয় আন্তজেলা কেএফসি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। জেলা দলে ডাক পড়ে কৃষ্ণার। দায়িত্ব পড়ে আক্রমণ ভাগে। রাজশাহী জোনে টাঙ্গাইল জেলার হয়ে ২১ গোল করেন স্ট্রাইকার কৃষ্ণা। জাতীয় পর্যায়ে টাঙ্গাইল জেলা চতুর্থ হয়।   জেএফএ টুর্নামেন্টে টাঙ্গাইলের হয়ে রাজশাহী জোনে প্রথমে রানারআপ, পরেরবার চ্যাম্পিয়ন হয়। এসব টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা উপহার দেয়ার সুবাদে অনূর্ধ্ব-১৪তে ডাক পড়ে জাতীয় দলে। ২০১৪ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত সাফ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপে কৃষ্ণা  আফগানিস্তানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন। তাঁর নেতৃত্বেই ২০১৫ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ গার্লস রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপে স্বাগতিক নেপালকে ১-০ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়। আর এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনস অনূর্ধ্ব-১৬ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই পর্বে তো বিশ্বকেই চমকে দিলেন। বাঁ পায়ের শট বেশি জোরালো বলে জাতীয় দলে কৃষ্ণার স্থান হয় লেফ্ট উইংয়ে। উইঙ্গার হলেও গোল পেতে কষ্ট হয় না তাঁর।

 

দেশটাকে ভালোবেসে

ইউনিয়ন থেকে উপজেলা। উপজেলা থেকে জেলা। জেলা থেকে জাতীয় পর্যায়। তারপর আন্তর্জাতিক অঙ্গন। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। সুষম খাবার, জার্সি-ট্রাউজারস, সকস-বুট—কোনোটাই পাননি চাহিদামতো। আজও সাধারণ বুট পায়ে গলিয়েই দলের ভার নিয়ে মাঠে নামেন কৃষ্ণা। বলছিলেন, ‘প্রতিটি ম্যাচই আমার কাছে সমান। আমরা জিতলে দেশ খুশিতে নাচে। আমরা গোল করলে মানুষের মুখে হাসি ফোটে। না জিতে উপায় আছে?’

 

 ছবি : মীর ফরিদ ও লেখক


মন্তব্য