kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফেসবুক থেকে পাওয়া

অসুস্থ এই মানুষগুলোও তো কারো না কারো বাবা, ছেলে অথবা ভাই

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



অসুস্থ এই মানুষগুলোও তো কারো না কারো বাবা, ছেলে অথবা ভাই

২১ ডিসেম্বর ২০১২। সেদিন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিসান ও নয়নের ভর্তি পরীক্ষা ছিল।

আমিও ওদের সঙ্গে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত পাবনা মানসিক হাসপাতাল ঘুরে দেখা। পরীক্ষা শেষে আমরা হেমায়েতপুরে গেলাম। হাসপাতালের বাইরে বাঁ দিকে একটি ভবন আমাদের চোখে পড়ল। পরে জানতে পারলাম, এখানে অপেক্ষাকৃত সুস্থ মানসিক রোগীরা থাকেন। ভর্তি পরীক্ষা শেষে অনেক শিক্ষার্থী সেদিন হেমায়েতপুরে গিয়েছিল। তাই ভিড়টাও ছিল চোখে পড়ার মতো। আমি সেই ভবনের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। জানালার পাশে একজন মানসিক রোগী এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ভাই, দুটি টাকা দেবেন?’ আমি বললাম, ‘কী করবেন?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘ঝালমুড়ি খাব। ’ আমি বললাম, ‘ মন খারাপ করে আছেন কেন? হাসেন। তাহলে দেব। ’ তিনি হাসতে শুরু করলেন। থামছেনই না। যেন হৃদয়ে তাঁর অজস্র হাসি জমা ছিল। আজ হাসির সুযোগ পেয়েছেন। এ সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। আমি তাঁকে টাকা দিলাম। তাঁর হাসি অবশেষে থামল। তিনি এবার বললেন, ‘আমাদের মধ্যে একজন শিল্পী আছে। ভালো গান গায়। শুনবেন?’ বললাম, ‘কই, ডেকে নিয়ে আসেন। ’ সত্যি একজন শিল্পী এলেন গিটার হাতে। তাঁর নাম বাবু। বহু বছর ধরে পাবনা মানসিক হাসপাতালে আছেন। পাবনার তারিক ভাই বললেন, ‘বাবু ভাই একমাত্র পাগল, যিনি হাসপাতালের বাইরেও ঘুরতে যেতে পারেন। ’ লোকটি সম্পর্কে আমার কৌতূহল বাড়ল। আমি আরো কিছু জানতে চাইলাম। তখনই লক্ষ করলাম বাবু ভাই চমত্কার ইংরেজি বলছেন। আমিও তাঁকে ইংরেজিতে কিছু প্রশ্ন করলাম। তিনি উত্তর দিলেন। জানালেন তিনি কানাডায় পড়াশোনা করেছেন। বাবা একজন সচিব। পাশে একজন বলে উঠলেন, ‘এটা সরকারি পাগলাগারদ। যেনতেন পাগল এহানে থাকবার পারে না। সেই রহম পাগল হওয়া লাগে!’ আমরা তাঁকে একটি গান গাওয়ার জন্য খুব অনুরোধ করলাম। তিনি অনেক টাকা দাবি করলেন। তাই বাবু ভাইয়ের গান আর শোনা হলো না। বাবু ভাইয়ের গান শুনতে ব্যর্থ হয়ে মন যখন খারাপ, তখন ভেতর থেকে একজন আমার দিকে তাকিয়ে চমত্কার উচ্চারণে বললেন, ‘হোয়াট আ স্টাইলিশ ম্যান! ফুললি ব্ল্যাক’ (আমি কালো প্যান্ট, কালো সোয়েটার ও কালো জ্যাকেট পরা ছিলাম)। আশ্চর্য হয়ে লোকটির দিকে তাকালাম। শুরু হলো দুজনের ইংরেজিতে কথোপকথন। তিনি জানালেন যে তিনি একটি এয়ারলাইনসে চাকরি করতেন। ঢাকার নামকরা হোটেলগুলোয় কিভাবে ‘থার্টি ফার্স্ট’ নাইট উদ্যাপন হয় তা-ও তিনি বলে গেলেন। আমাদের কথা শুনতে অনেক মানুষ সেই জানালার পাশে জমা হয়েছিল। আমি যখন অবাক হয়ে ভাবছিলাম এই সুস্থ মানুষটি কেন এখানে আছেন, ঠিক তখনই তিনি কারণ ছাড়াই মেজাজ খারাপ করলেন। বললেন, ‘এই ভাই! দেন তো। আপনারা যে যা পারেন আমাকে দেন। ’ আমরা অনেকেই বেশকিছু টাকা উঠিয়ে তাঁকে দিলাম। কিন্তু তিনি রেগে উঠলেন। কারণ তাঁর ইংরেজি বলার মজুরি খুব কম হয়ে গেছে। পরে অবশ্য যা পেলেন তাই নিলেন। আমি, জিসান, নয়ন ও তারিক ভাই হাসপাতালের মূল গেটের দিকে গেলাম। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা চালালাম। কিন্তু কাজ হচ্ছিল না। গার্ডরা জানালেন, শুক্রবার দর্শনার্থীরা ভেতরে ঢুকতে পারে না। শিক্ষার্থী ও গার্ডদের মধ্যে মারামারি লাগার মতো অবস্থা। আমি সুযোগ বুঝে ভেতরে ঢুকে গেলাম। ভেতরের এক গার্ডের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হলো। জিসান, নয়ন ও তারিক ভাইকে পাবনা মেডিক্যাল কলেজের গেট দিয়ে ঢুকালাম। চারজন এবার গার্ডকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে লাগলাম। আমি ছাড়া বাকি তিনজনই হুজুর। দূর থেকে এক পাগল বলে উঠলেন, ‘ও হুজুর, আপনি কি রাজাকার, না ভালোকার?’ আমি হেসে উঠলাম। একজন জানালার পাশে বসে সুরা ইয়াসিন পড়তে শুরু করলেন। তিন-তিনজন হুজুর দেখে তিনি যেন বেজায় খুশি। আর পাশের ভবন থেকে শুধু এই গানের সুরই শোনা যাচ্ছিল, ‘আমি কেমন করে পত্র লিখি রে...!’ তাঁদের অদ্ভুত আচরণে আমরা বেশ হাসছিলাম। নিচতলার বাঁ পাশে এক ওয়ার্ডের পাশে দাঁড়াতেই একজন আমাকে বললেন, ‘ভাই, একটা কথা বলব?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, বলেন। ’ বললেন, ‘ভাই, আফনারে একেবারে নায়ক বাপ্পারাজের মতো দেহায়। ভাই, আমারে ১০টা টাহা দেবেন?’ ঠিক সেই সময় জানালার পাশে এসে অনেকে দাঁড়ালেন। প্রত্যেকের দাবি ১০ টাকা। কিন্তু সবাইকে ১০ টাকা করে দিতে গেলে পাবনা থেকে রাজশাহী ফেরাটাই কঠিন হয়ে যেত। হাসপাতালের ওয়ার্ডের ছবি তুলছিলাম, এমন সময় একজন আমার সামনে এসে তাঁর চুল শুধু ওপরের দিকে ঠেলছিলেন আর বলছিলেন, ‘ভাই, আমার একটা ছবি তোলেন। ’ অনেকের আরো অনেক আচরণ দেখে যখন হাসছিলাম, ঠিক তখন মধ্যবয়সী একজন উচ্চ স্বরে কেঁদে উঠলেন। খুব আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাকা, কী হয়েছে? কাঁদছেন কেন?’ উত্তরে বললেন, ‘মার কতা মনে অইচে। ’ লোকটির সঙ্গে আমার বাবার একটি মিল খুঁজে পেলাম। হ্যাঁ, তিনি আর আমার বাবা হয়তো একই বয়সী। ঠিক তখনই মনে হলো ‘মানসিকভাবে অসুস্থ এই মানুষগুলোও তো কারো না কারো বাবা, ছেলে, ভাই কিংবা পরিবারের অন্য কোনো আপনজন। আজ যদি আমার বাবা ওয়ার্ডের ভেতর থেকে বাইরে দাঁড়ানো আমার বয়সী একটি ছেলের সঙ্গে আমার দাদির কথা মনে করে কাঁদতেন? ঠিক তখনই অনুভব করলাম আর হাসতে পারছি না। বুক যেন ভারী হয়ে গেছে। চোখ যেন এখনই ভিজে যাবে অশ্রুতে। ওই মধ্যবয়সী ব্যক্তির মতোই হয়তো অন্য সব অসুস্থ ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি আর দুঃখ-কষ্টগুলো গার্ডদের ধমকানিতে, দর্শনার্থীদের হাসিতে কিংবা ওয়ার্ডের অন্য অসুস্থ ব্যক্তির অস্বাভাবিক আচরণে হারিয়ে যায়। এমনকি জন্মদাত্রী মা-ও হয়তো জানতে পারেন না, তাঁরই ছেলে তাঁকে মনে করেই কাঁদছে ‘পাগলাগারদ’ নামক এক জায়গার চার দেয়ালের মধ্যে।

     সায়েক আহমেদ, ইংরেজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য