kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাবুর ছবি

ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটি ছবি করার আগ্রহ হয়েছিল বাবুর ১৯৮৯ সালে। খুঁজে পেতে রসদ বেশি কিছু পেলেন না। সেই থেকে সংগ্রহবাতিক তৈরি হলো। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট অনেক কিছুই আছে তাঁর সংগ্রহে। দেখে এসেছেন সাজ্জাদ হোসেন

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাবুর ছবি

শখের তোলা

দুটি ঘটনা শামসুল আলম বাবুকে সংগ্রহ অভিযানে নামিয়েছে। প্রথম ঘটনাটি ১৯৮৮ সালের।

সেবারের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে হয়েছিল প্রথম কবিতা উৎসব। সামনের সারিতে ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমানসহ আরো অনেক বরেণ্য কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী। ছিলেন পটুয়া কামরুল হাসানও। কোনো একজন কবির খাতা ধার নিয়ে তাতে ছবি আঁকছিলেন। বাবু চেষ্টা করেছিলেন সে ছবিটি ক্যামেরায় ধরতে। কিন্তু ধরা যায়নি। দুঃখের ব্যাপার, উৎসব চলাকালেই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান কামরুল হাসান।

পরে বাবু যখন কামরুল হাসানের পেইন্টিংগুলোর কোনটা কোথায় আছে খুঁজতে গিয়েছিলেন, তখনো হিমশিম খেয়েছেন। অনেকগুলোরই হদিস মিলল না।

 আলমগীর কবির মারা গেলেন

দ্বিতীয় ঘটনাটিও একই বছরের। টিএসসিতে ফটোগ্রাফির ওপর একটি কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন বাবু। একদিন ‘ফিল্ম ও ফটোগ্রাফি’ নামের বিষয়ে পড়াতে এসেছিলেন পরিচালক আলমগীর কবির। সেই থেকেই পরিচয়। ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে। দুঃখের ব্যাপার হলো, পরের বছরের জানুয়ারিতেই ফেরি দুর্ঘটনায় মারা যান আলমগীর কবির। কামরুল হাসানের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন জনাব কবির। ছবিটির জন্য স্থিরচিত্র তুলে দেওয়ার কাজ করছিলেন বাবু। একদিন কিছু ছবি প্রিন্ট করিয়ে তিনি কামরুল হাসানকে দিতে গিয়েছিলেন। ছবিগুলো দেখে শিল্পী খুশি হয়েছিলেন। ওদিকে আলমগীর কবির মারা যাওয়ার পর দেখা গেল তাঁর শুট করা অনেক ফুটেজেরই হদিস নেই। আলমগীর কবিরের একটি বড় লাইব্রেরিও ছিল। চলচ্চিত্রের ওপর প্রচুর বই ছিল সেখানে। সেটিও টিকে থাকেনি তিনি চলে যাওয়ার পর। ঘটনাগুলো মেনে নিতে পারেননি বাবু।

ফিল্ম আর্কাইভে যাতায়াত

কিছুকাল পরে নিজে চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণা করতে থাকেন বাবু। এই কাজ করতে গিয়ে সংগ্রহের নেশা পুরো চড়ে গেল। নিয়মিত যেতে থাকেন বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে। বাবু জানালেন, ‘অনেক ছবি যেমন ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে, আবার অনেক সিনেমাই নেই। প্রতিষ্ঠানটির অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায়। তখন থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২১৪টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু আর্কাইভে মাত্র সোয়া শ ছবির প্রিন্ট আছে। তাহলে ছবিগুলো কি দেখার সুযোগ মিলবে না?’

পাড়া-মহল্লায় স্টুডিও ছিল

আগে বিয়ে হওয়ার পর পরই স্বামী-স্ত্রী চলে যেত স্টুডিওতে। পরিবারের লোকজনও যেত। সবাই সেখানে ছবি তুলত। কিন্তু ইদানীং স্টুডিও বন্ধ হয়ে গেছে। নেগেটিভগুলোও নষ্ট করা হয়েছে। বাবু বললেন, ‘ফটোগ্রাফির ইতিহাস ছিল ওগুলোতে। কিন্তু সেই ইতিহাস আমরা হারিয়ে ফেললাম। আমি কিছু ফিল্ম সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন সময়ে স্টুডিওতে তোলা ১০ হাজার সাদা-কালো ছবির নেগেটিভ আমার কাছে আছে। ’

 

বাবুর সংগ্রহ

বাবুর সংগ্রহের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। পঞ্চাশ, ষাট বা সত্তরের দশকে সিনেমা হলগুলোর সামনে বিক্রি হতো বুকলেট (পুস্তিকা)। তাতে সিনেমাটি সম্পর্কে লেখা থাকত, নায়ক-নায়িকার ছবি থাকত। থাকত চিত্রনাট্যের অংশবিশেষ, গানের কথা, শিল্পীদের নাম। পরিচালক-সম্পাদক-আলোকচিত্রীর কথাও থাকত। প্রায় ১০০ এমন বুকলেট আছে বাবুর সংগ্রহে। দেশের প্রথম চলচ্চিত্র পত্রিকা সিনেমার অনেক কপি আছে তাঁর কাছে। চিত্রালীর স্ক্যানড কপিও নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করেছেন বাবু।

 

আলমগীর কবিরের ফুটেজ

আলমগীর কবিরের অসমাপ্ত ছবিগুলোর ফুটেজ এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিল। কিছু ছিল তাঁর প্রোডিউসার আজিজ মেহেরের হাতে। আগ্রহ দেখে সেগুলো দিয়ে দিলেন বাবুকে। জহির রায়হানকে নিয়ে যে ছবিটি বানাতে শুরু করেছিলেন তার ফুটেজ, কামরুল হাসানকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রের ফুটেজ—সব জমা পড়ল বাবুর ভাণ্ডারে। জহির রায়হানেরও অনেক কিছু সংগ্রহে আছে বাবুর। তাঁর শুট করা রিল, পোস্টার, স্থিরচিত্রসহ আরো অনেক কিছু। ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর পরিকল্পনা ও বাজেট লেখা পাতাগুলো বাবুর কাছে আছে। বাবু বললেন, তখন ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’, ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ এবং ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন্স’ নামে আরো তিনটি সিনেমার পরিকল্পনা করেছিলেন জহির রায়হান। এর মধ্যে প্রথমটি নিজে, দ্বিতীয়টি আলমগীর কবির ও তৃতীয়টি বাবুল চৌধুরী পরিচালনা করেন। ছবিগুলো-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রকম কাগজপত্র আছে আমার কাছে। সে সময় জহির রায়হান, আলমগীর কবির, হাসান ইমাম প্রমুখ মিলে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কেমন হবে তার একটি নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। সেটিও আমার সংগ্রহে আছে। ’

 

সিনেমা এবং সিনেমা

কিছু দুর্লভ সিনেমার প্রিন্ট সংগ্রহ করেছিলেন বাবু। তবে ঘরে রাখতে অসুবিধা বলে দিয়ে দিয়েছেন ফিল্ম আর্কাইভকে। এখনো তিনটি আছে। তিনি ডিজিটাল ফরম্যাটে দেশের প্রায় ১০০ দুষ্প্রাপ্য সিনেমা সংগ্রহে রেখেছেন। তাঁর কাছে বিভিন্ন সিনেমার শুটিং স্টিল আছে প্রায় তিন হাজার। ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তখনকার অনেক পত্রিকার কপি সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর কাছে ১২-১৩ জন ভাষাসৈনিকের ভিডিও সাক্ষাত্কার আছে। বাবু আশা করেন, ভবিষ্যতের গবেষকরা এ থেকে উপকৃত হবে।


মন্তব্য