kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বৈঠকখানা

আজ হবে ভাঙার গান

ভাঙা ও ফেলনা উপকরণ দিয়ে শিল্পী আরহামউল হক চৌধুরী গড়েছেন অনেক শিল্পকর্ম। সেগুলো দিয়ে ঢাকার অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে শুরু হয়েছে ‘কঠিন অনুভব’ নামের প্রদর্শনী। প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ সিআরপির পক্ষাঘাতগ্রস্তদের কাজে লাগবে। বিস্তারিত লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আজ হবে ভাঙার গান

আরহামের আম্মা ভালো পোর্ট্রেট আঁকতেন। আম্মার কাছেই তাঁর হাতেখড়ি।

সেগুনবাগিচায় তাঁদের বাড়িটাও ছিল বেশ বড়। পুরনো জিনিসপত্রে ঠাসা। সেগুলোর সঙ্গেই আরহামের সময় কাটত বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন নৃবিজ্ঞান, তবে শিল্পী পরিচয় দিতেই বেশি ভালোবাসেন। সিআরপিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন ১৬ বছর হয়ে গেল। ‘কঠিন অনুভব’ তাঁর ১৩তম একক প্রদর্শনী। শিল্পকর্মগুলোর উপকরণ তিনি পেয়েছেন সিআরপি থেকেই। সেখানে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য হুইল চেয়ার, স্ট্রেচার, ক্রাচ ইত্যাদি তৈরি করা হয়। তখন যেসব টুকরোটাকরা লোহা, পিতল ফেলনা যায়, সেগুলো দিয়েই তৈরি হয়েছে শিল্পকর্ম। বেঙ্গল গ্যালারিতে ২০০৫ সালে ‘ভস্ম থেকে’ শিরোনামে একই ধরনের ভাস্কর্যের একটি প্রদর্শনী করেছিলেন আরহাম। ‘কঠিন অনুভব’ চলবে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা ও শুক্র-শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা ও বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। রবিবার

সাপ্তাহিক বন্ধ।

 

দ্রষ্টব্য ১ : অন্তরযুদ্ধ

রুশো বলেছিলেন, ‘ম্যান ইজ বর্ন ফ্রি বাট এভরিহয়ার হি ইজ ইন চেইনস। ’ রুশোর কথাটিই এই ভাস্কর্যের প্রেরণা। এতে দেখা যাচ্ছে, একজন মানুষ খাঁচা থেকে বেরোতে চাইছে। ভাঙতে চাইছে বৃত্ত। প্রতিবন্ধীরাও চায় আগের মতো প্রাণোচ্ছ্বল জীবন ফিরে পেতে। কিন্তু প্রতিবন্ধকতাগুলো এমনভাবে তাঁকে ঘিরে ধরে যে আর ফেরা

হয় না।

 

 

দ্রষ্টব্য ২ : ইঁদুর দৌড়

ভাস্কর্যটিতে দেখা যাচ্ছে, অনেক ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। কোনোটার মাথায় টুপি, কোনোটার হাতে ফাইল, কারো হাতে স্যুটকেস, কেউ বা বন্দুক হাতে নিঃশ্বাস ফেলছে টাকাওয়ালার ঘাড়ে। এরা যে যার মতো করে দৌড়াচ্ছে। কাকে ল্যাং মেরে কে আগে যাবে, সে প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু ফলাফল তো শূন্য।   কারণ কিছু দূর বা আরো বেশি দূর যাওয়ার পরই গর্তের মধ্যে পড়তে হবে। শহরগুলোতেও মানুষ উদভ্রান্তের মতো ছুটছে। তাঁরা এটাকে যতই পথ ভাবুক না কেন আসলে কিন্তু ট্রাপ মানে ফাঁদ।

 

দ্রষ্টব্য ৩ : দাঁড়িয়ে আছো

মন ভালো থাক কিংবা খারাপ—সব সময়ই রবীন্দ্রনাথের গান আরহামকে সঙ্গ দেয়। কবির গান, দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে, ভাস্কর্যটির প্রেরণা। এতে দেখা যাচ্ছে, দরজার ওপারে কেউ একজন যেন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার অবয়ব পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। আরহাম বলছিলেন, মানুষ আশায় বাঁচে। কিন্তু সিআরপিতে যারা আসে তারা কিন্তু আশাহীন হয়ে আসে। শুরুর দিকে অনেকে ভাবতেই পারে না, তার আর বাঁচা সম্ভব! বেশির ভাগেরই স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি। তবে একটা সময়ে তাঁরা আশা ফিরে পায়। ভাবতে পারে যে আমার জন্য কেউ না কেউ আছে। ফলে সে হাল ছাড়ে না। লড়ে যায়।

 

দ্রষ্টব্য ৪ : দলছুট

আরহাম বলছিলেন, কাক আমার প্রিয় একটি প্রাণী। বাসার জানালা দিয়ে মাঝেমধ্যেই কাক দেখি। এই ভাস্কর্যটিতে মোট পাঁচটি কাক আছে। একটি খুঁটির ওপর বৈদ্যুতিক তার। সেটির ওপর কাকগুলো বসা। ভালো করে দেখুন, খুঁটির একপাশে আছে দুই জোড়া কাক। আর একটি বসে আছে একা। মানে সে এদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। প্রতিবন্ধীদের মধ্যেও এমন ব্যাপার কাজ করে। তারাও দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে দলছুট হয়েই সিআরপিতে আসে। এটি বানিয়েছি ২০১৪ সালে।


মন্তব্য