kalerkantho


আবহমান বাংলা

চর জানাজাত ইলিশ আর পালতোলা নৌকা

রুপার মতো চকচক করছে বালুরাশি। রোদ ঠিকরে পড়ছে সেই বালুকণায়। পায়ের তলায় ঢোলকলমি। পাশে বইছে নদী কলকল। জলে পালতোলা নৌকা। ইলিশ ধরছে জেলেরা। মাদারীপুরের শিবপুর উপজেলায় চর জানাজাতে এমন দৃশ্য দেখে ফিরলেন সামিউল্যাহ সমরাট

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চর জানাজাত ইলিশ আর পালতোলা নৌকা

শখের তোলা

মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকূল বাজার থেকে শ্যালো নৌকায় প্রায় দেড় ঘণ্টায় পেরোলাম উত্তাল পদ্মা। সঙ্গী ফারুখ ভাই। এই অঞ্চলে তাঁর অনেক জানাশোনা। আমরা চর জানাজাতের একটি ঘাটে এসে দাঁড়ালাম। মাথার ওপর সূর্য। বাতাস থাকায় রোদ খুব একটা গায়ে লাগছে না।

একটু পরপর ছোট ছোট ঘাট। ঘাটে ছোট-বড় নৌকা। বেশির ভাগ নৌকাই মাছ ধরার। অনেক নৌকায় দুপুরের খাবারের আয়োজন চলছে। নৌকাতে বসানো চুলোয় রান্না হচ্ছে নদীর তাজা মাছ।

এই খাবারের সময়টুকুই শুধু জেলেদের বিশ্রাম। ঘাটে মাছ ধরার নৌকার পাশাপাশি যাত্রী পারাপারও দেখা গেল। যাতায়াত ছাড়াও পণ্য আনা-নেওয়া করা হয়। আমাদের ট্রলারের পাশ দিয়ে মাঝেমধ্যে ঢেউ তুলে অতিক্রম করে যাচ্ছে মালবোঝাই বড় নৌকা।

কিছুদূর এগোনোর পর পেয়ে গেলাম একটা বড় বালিয়াড়ি। ট্রলার থামিয়ে নেমে পড়লাম। কিছু দূরেই সারিবদ্ধ অনেক নারিকেলগাছ। অনেকটাই কুয়াকাটা সৈকতের মতো। বাতাসের বেগ বাড়ছে আর দুলছে গাছগুলো। এই বালিয়াড়ি ছড়িয়ে আছে অনেক দূর পর্যন্ত। আট-নয়জন কিশোর দাপাদাপি করছে দেখে এগিয়ে গেলাম। ওরা নৌকা নিয়ে এসেছে। মাছ ধরার সহযোগী হিসেবে কাজ করে। ইলিশ মাছ কোথায় পাওয়া যাবে—জিজ্ঞেস করতেই বলল, একটু সামনে গেলেই পাবেন। আর পালতোলা নৌকা? সেটাও আর একটু এগিয়ে গেলেই পাওয়া যাবে। আবারও ট্রলারে চড়লাম। মিনিট দশেক পর কিছু নৌকা দেখা গেল, মাছ ধরছে। ফারুখ ভাই বললেন, ‘এগুলোই ইলিশ ধরার নৌকা। ক্যামেরাটা সরিয়ে রাখো। এরা ক্যামেরা দেখলেই কথা বলতে চায় না। ’ কারণ জাটকা ধরা নিয়ে পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়।  

জীবনে ইলিশ মাছ ধরা দেখা হয়নি। কাছাকাছি গেলাম। ভালোই ধরা পড়ছে ইলিশ। নদীতে ফেলে রাখা জাল তুলতেই ঝিলিক দিয়ে ওঠে। অবাক হয়ে দেখছি। মনে পড়ে গেল কুবের মাঝি আর ধনঞ্জয়ের কথা। চর জানাজাতকে কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো কেতুপুর গ্রাম। জ্যান্ত ইলিশ এবার দ্বিতীয়বার দেখলাম। গত বর্ষায় সিলেটের হাকালুকি হাওরে গিয়ে দেখেছিলাম। অন্যান্য মাছের সঙ্গে জেলেদের জালে দুটি ইলিশ উঠে এসেছিল। কিন্তু একসঙ্গে এত জ্যান্ত ইলিশ এই প্রথম। মাছ কেনার লোভ কোনোভাবেই সামলানো গেল না। ফারুখ ভাই যেখানে যান, মাছ পেলেই কেনেন। ইলিশ ছাড়াও বড় আইর নিলাম। সস্তায় পাওয়া গেল। মাছগুলো তাদের কাছেই রাখলাম। ফেরার পথে নেব। ওরা বরফ দিয়ে প্যাকেট করে রাখবে।

পালতোলা নৌকার খোঁজে এগোতে থাকলাম। ভাগ্য প্রসন্নই ছিল। রঙিন পাল তুলে খাল থেকে পদ্মার দিকেই আসছে একটি ছোট নৌকা। নৌকায় দুই জেলে। এরাও মাছ ধরছে। ছবি তোলার তর সইছিল না। কয়েকটি তুললাম। ট্রলারের গতি কমিয়ে এগিয়ে চলেছি। আরো দুটি নৌকা পাওয়া গেল। লাল-সাদা মিশ্রণের পাল অনেক দূর থেকেই চোখে পড়ল।  

নদীর তীরে কিছু দিনের মধ্যেই দেখা দেবে শুভ্র কাশফুল। এর মধ্যে আকাশ কালো হয়ে এলো। বৃষ্টি নামতে পারে। ওদিকে মাছ কেনা আছে। তাই একটু ফেরার তাড়া। পদ্মা পেরিয়ে আসার সময় চোখে পড়ল পদ্মা সেতুর গড়ে উঠার দৃশ্য। হাতে সময় থাকলে ওদিকটাও একটু ঘুরে আসা যেত। ভাগ্যকূল বাজারে ভালো মিষ্টি পাওয়া যায়, ফারুখ ভাই আগেই বলেছিলেন। পালতোলা নৌকা, ইলিশ ধরার ছবি, সস্তায় মাছ, সুস্বাদু মিষ্টি ঝুলিতে ভরে ফিরলাম ঢাকায়।


মন্তব্য