kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খাদ্য চক্কর

বিরিয়ানি

খেতে ভালো লাগে, খাওয়াতেও ভালো লাগে। অনুষ্ঠানে তো বটেই, বিনা ছুতায়ও খায় অনেকে। ঢাকায় অনেক রকমের বিরিয়ানি মেলে। কিন্তু এলো কোথা থেকে এত স্বাদের খাবারটি? খুঁজতে গিয়েছিলেন মো. নাভিদ রেজোয়ান

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বিরিয়ানি

হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি

অনেক প্রশ্ন, সুরাহা করা মুশকিল। বিরিয়ানি একটি উর্দু শব্দ, জোগান দিয়েছে ফার্সি ভাষা।

মধ্যযুগের ভারতে দরবারি ভাষা ছিল ফার্সি। ফার্সিতে বিরিঞ্জ বলে শব্দ আছে, যার অর্থ ভাত। আরেকটি শব্দ হলো বিরিয়ান, যার অর্থ গোশত ভাজা। তাই সাধারণ ধারণায় বিরিয়ানি পারস্য থেকে এসেছে। অনেকে কিন্তু বলেন, না, উত্তর ভারতেই এর সূচনা। মত আছে মুঘলদের পক্ষেও। তারাই নাকি নিয়ে এসেছিল বিরিয়ানি। ভারতবর্ষে বিভিন্ন ঘরানার বিরিয়ানির চল চালু হয়েছে বহু দিন হয়, যেমন দিল্লি বিরিয়ানি, লক্ষ্নৌ বিরিয়ানি। তেলাঙ্গানা, তামিলনাড়ু বিরিয়ানিও কিন্তু আছে। আর হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানির কথা এখন ঢাকার লোকও জানে। প্রতিভাকরণ নামের একজন গবেষক জোর দিয়েই বলতে চান, দক্ষিণ ভারতই বিরিয়ানি সরবরাহ করেছে সারা ভারতে। আরব বণিকরা পিলাফ (পোলাও) নিয়ে এসেছিল, সেটিই দিনে দিনে বিরিয়ানি হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, পোলাও সে আমলে সেনারাই বেশি খেত।  

গবেষক লিজি কলিংহাম অবশ্য মুঘল হেঁসেলকেই বিরিয়ানির আঁতুড়ঘর বলতে পছন্দ করেন। ক্রিস ধিলোঁ নামের আরেক গবেষক বলছেন, বিরিয়ানি পারস্যের খাবার, আর ভারতে নিয়ে এসেছে মুঘলরা। আইন-ই-আকবরিতে বিরিয়ানি আর পোলাওয়ের মধ্যে কোনো তফাত দেখানো হয়নি। সে যাক, যেখান থেকেই আসুক বিরিয়ানি ভারতবাসীর খাবার তালিকার অন্যতম খাবার।  

এখনকার ইরানেও পোলাও রান্না হয়। পারস্যবাসী রান্নায় খুব মেহনত করে। রান্না পদ্ধতি নিয়েও তারা অনেক ভাবনাচিন্তা করেছে। একটি পদ্ধতি হলো দমে। অল্প আঁচে রান্নার পদ্ধতিটা আমাদের এখানেও দম নামে পরিচিত। তারা তাচিন বা তাহছিন নামে একটি পদ রান্না করে। এতে দধি, খাসি বা মুরগির মাংস, চাল, জাফরান, ডিম ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। কয়েক পরতে চাল, দধি, মাংস দিয়ে বিরিয়ানির মতোই আঁচ বাড়িয়ে-কমিয়ে তৈরি করা হয় এটি।

অটোমান সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছিল বহু দেশে। তাদের বিরাট সৈন্যদল ছিল। খাবার ব্যবস্থাপনায়ও তারা পারদর্শী ছিল। অনেকে বলেন, অটোমানরাই তাচিন তুরস্ক থেকে পারস্যে চালান করে। যুদ্ধের সময় যেহেতু সেনাবাহিনীকে সতর্ক থাকতে হয়, তাই তারা অল্প আঁচে রান্নার কৌশল আবিষ্কার করে যেন দূর থেকে আগুন না দেখা যায়।    

ভারতবর্ষে তাচিন নামের কোনো খাবারের খবর পাওয়া যায় না। তবে পারস্য, তুরস্ক ও আরব থেকে অনেক মানুষ এসেছিল এখানে। তাদের কেউ ছিল নির্মাণশিল্পী, কেউবা রাঁধুনি। মুঘলরাও আমন্ত্রণ জানাত কোনো কোনো দলকে। তুরস্ক আর পারস্য থেকে স্থপতি নিয়ে আসার চল তো ছিলই।

১৭৭৫ সালে অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা মারা যান। তাঁর পুত্র আসাফ-উদ-দৌলা মাত্র ২৬ বছর বয়সে গদিনশীন হন। আসাফের ইচ্ছা হয়েছিল একটি ইমামবাড়া বানানোর। গল্প আছে—একদিন নির্মাণকাজ দেখভাল করতে গিয়ে রান্নার সুঘ্রাণ পান নবাব। তিনি রাঁধুনিকে ডেকে পাঠান এবং নিজের মহলে রান্না করতে বলেন। বলা হয়ে থাকে, তখন ওই রান্নাঘরে তাচিন গোছের কিছু একটা রান্না করছিল।

দমে রান্না পদ্ধতির চল ডেকান মালভূমিতে বহু আগে থেকেই। প্রতিভাকরণের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন আরো অনেক গবেষক। পুনে, আহমেদাবাদ, বেঙ্গালুরু মানে দক্ষিণ ভারতের অনেকটাই ডেকান মালভূমির অন্তর্ভুক্ত। ভারতবর্ষে প্রচলিত বিরিয়ানি কয়েক রকম।

তেহারি : নবাবরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী শাকাহারি হিসাবরক্ষকদের জন্য এই বিশেষ পদটি তৈরি করাতেন। এতে মাংসের বদলে আলু থাকত। কাশ্মীরে তেহারি বেশ জনপ্রিয় খাবার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তেহারি ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক জায়গায়।

বিফ বিরিয়ানি : এতে ভেড়া, ছাগল বা মুরগির বদলে গরুর মাংসের ব্যবহার হয়। ভারতের  কেরালায় এটি বেশ জনপ্রিয়। বিদারের (কর্নাটকের একটি শহর) নবাবরা হায়দ্রাবাদে গেলে সেখানে বিফ বিরিয়ানিও নিয়ে যান।

সিন্ধি বিরিয়ানি : মূলত বাসমতি চালের জন্যই সিন্ধি বিরিয়ানির নাম হয়েছে। অনেক রকম মসলাও ব্যবহৃত হয়। এর ঘ্রাণ পাগল করে দেয়।

হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি : সারা দুনিয়ায়ই এটি মশহুর। বিশেষ করে হায়দ্রাবাদী কাচ্চি বিরিয়ানি। কয়েক ঘণ্টা ধরে মেরিনেট করা মাংস চালের সঙ্গে একবারে মিশিয়ে হালকা আঁচে রান্না করা হয় এ বিরিয়ানি।  

থালাসেরি বিরিয়ানি : কেরালায় এই পাক্কি বিরিয়ানি জনপ্রিয়। পাক্কি বিরিয়ানিতে মাংস আগে থেকেই রান্না করা হয়ে থাকে। পরে চালের সঙ্গে মিশিয়ে আঁচানো হয়। পাত্রের ঢাকনার ওপর জ্বলন্ত কয়লা রাখার চলও আছে এ বিরিয়ানি রান্নার সময়।

কলকাতার বিরিয়ানি : কলকাতায় বিরিয়ানি আসে কিছুটা দেরি করে। অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে ১৮৫৬ সালে কলকাতায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। তিনি সঙ্গে করে বাবুর্চি নিয়ে আসেন। গবেষকরা বলেন, সে থেকে কলকাতায় বিরিয়ানি আসে।


মন্তব্য