kalerkantho


দূর যাত্রী

কুইন অব দ্য ডেজার্ট

বিশ শতকের শুরুতে কোনো পশ্চিমা নারীর মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ ছিল বিরাট ঘটনা। গারট্রুড বেল সে দুঃসাধ্য কাজটি করেছিলেন। তবে পর্যটক হয়ে নয়, গবেষক হিসেবে। তাঁকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সেটি যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেয়েছে গেল মার্চ মাসে। লিখেছেন এস এম জিয়াউল হক শোভন

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



কুইন অব দ্য ডেজার্ট

মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণের বিভিন্ন সময়ে গারট্রুড বেল

গারট্রুড মার্গারেট লুথিয়ান বেল (১৮৬৮-১৯২৬) ছিলেন ব্রিটিশ ট্রাভেলার। তিনি ঐতিহাসিকও বটে। সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া ও আরবের আরো অনেক অংশে বেড়িয়ে তিনি মানচিত্র তৈরি করেন। আরব সংস্কৃতি নিয়ে করেছেন গবেষণা। আরব বেদুইনদের বিষয়ে অগাধ জ্ঞান ও যোগাযোগের কারণে তিনি ইংরেজ প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে ১৯২৫ সালে তিনি ইংল্যান্ড ফিরে আসেন। ১৯২৬ সালে অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি সেবনে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনী নিয়ে ওয়ার্নার হেরজগ নির্মাণ করেছেন কুইন অব দ্য ডেজার্ট। ছবিটি ২ ঘণ্টা ৮ মিনিটের। গারট্রুডের চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিকোল কিডম্যান।

১৮৯২ : পারস্য

অক্সফোর্ড থেকে ইতিহাস বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করে বেল চলে যান তত্কালীন পারস্যের তেহরানে। তাঁর চাচা স্যার ফ্রাংক লাসসেলেসের কাছে। ফ্রাংক তখন তেহরানে ব্রিটিশ সরকারের রাষ্ট্রদূত। এই ভ্রমণ নিয়ে গারট্রুড একটি বই লিখেছিলেন, যা পার্সিয়ান পিকচারস নামে ছাপা হয় ১৮৯৪ সালে। পরবর্তী এক দশক তিনি অনেক জায়গা ঘুরে বেড়ান। গবেষণা করেন প্রত্নবস্তু ও ভাষা নিয়ে। তিনি আরবি, ফার্সি, ফ্রেঞ্চ, জর্মান, ইতালিয়ান ও টার্কিশ ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন।

১৮৯৯ : মধ্য এশিয়া

বেল মধ্য এশিয়ায় যান ১৮৯৯ সালে। সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন ভ্রমণ করেন। ১৯০০ সালের ১৩ এপ্রিল বেল যান নবী মুসা মরুভূমিতে, সেখানে ক্যাম্প করে দুই রাত থাকেন। ৩০ এপ্রিল পৌঁছেন দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ার শহর ডারায়। বেল দ্রুজ পর্বতের ব্যাপারে আগে থেকেই রোমাঞ্চিত ছিলেন। দক্ষিণ সিরিয়ার এ পর্বতের ধারে-কাছে দ্রুজ ধর্মের লোকদের বসতি। ২ মে তাঁরা পৌঁছেন বোসরাহ নামক গ্রামে। ভুট্টাক্ষেতের মাঝখান দিয়ে জেবেল দ্রুজ পর্বতের পূর্ব পাশ দিয়ে গ্রামে প্রবেশ করেন  বেল। গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে পরিচিত হন। ৩ মে পৌঁছেন জেবেল দ্রুজে। আরব বেদুইন শেখরা তাঁকে স্বাগত জানান এবং আপ্যায়িত করেন। মে মাসের ১৪ তারিখে পৌঁছেন দামাস্কাসে। তিনি নভেম্বরে পৌঁছেন জেরুজালেম। ওখানকার জার্মান রাষ্ট্রদূত এবং তাঁর স্ত্রী বেলকে সাহায্য করেন।

১৯০১ : আল্পস

১৯০৪ সালের মধ্যে বেল বেশ কয়েকটি পর্বতচূড়ায় আরোহণ করেন। তার মধ্যে সর্বোচ্চ আলপাইন চূড়া মঁ ব্লাও ছিল। এ ছাড়া তিনি বার্নেস আল্পসে চড়ার ১০টি পথ খুঁজে বের করেন। বার্নেস ওবারল্যান্ডের আট হাজার ৬৩৫ ফুট উঁচু একটি চূড়ার নাম রাখা হয় তাঁর নামে—গারট্রুডস্প্রিটজ। কারণ ১৯০১ সালে গাইড উলরিখ এবং হেনরিখকে নিয়ে তিনিই এই পর্বতে প্রথম আরোহণ করেন।

১৯০৫ : বৈরুত

১১ জানুয়ারি বেল পৌঁছেন বৈরুত। স্থানীয় বাজার দেখে মুগ্ধ হন তিনি। ২০ জানুয়ারি ডুমের নামক স্থানে ক্যাম্প করেন। ২৫ জানুয়ারি পৌঁছেন হাইফা। এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি জর্দান ব্রিজে পৌঁছেন। শেষে আবার যান দামাস্কাস।

১৯০৭ : মিসর

পহেলা জানুয়ারি বেল কায়রো পৌঁছেন। মিসরের প্রত্নসম্পদ নিয়ে গবেষণা করেন। তারপর বেরিয়ে পড়েন অটোমান সাম্রাজ্য ঘুরে দেখতে।

১৯১০-১৯১১ : দামাস্কাস হয়ে বাগদাদ

১৯১১ সালের ১৬ জানুয়ারি বেল বৈরুত পৌঁছেন। এরপর ১৮ তারিখ যান দামাস্কাস। কয়েক দিন সেখানে অবস্থান করেন। এই সময় অনেক স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা এবং পুরনো বন্ধুর সাহচর্য পান তিনি। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ১০ ফেব্রুয়ারি পৌঁছেন ব্যাবিলন। কিছু গবেষণা সেরে ১৮ ফেব্রুয়ারি পৌঁছেন বাগদাদ।

১৯১৩ : হায়েল যাত্রা

নভেম্বরের ২০ তারিখে আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে রওনা দিয়ে ২৭ তারিখ দামাস্কাস পৌঁছেন বেল। তাঁর নিত্যসহচর ফাত্তু ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এখানে। ২৪ ডিসেম্বর যাত্রাপথে বুরকা পৌঁছেন তাঁরা। অনেক বাধাবিপত্তির পর হায়েল (মধ্য সৌদি আরবের একটি স্থান, সৌদ পরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী রশিদের বাসস্থান) অভিযান শেষ করে ১৪ জানুয়ারি ১৯১৪ আম্মান ফিরে যান। রাজনৈতিক দিক থেকে বেলের হায়েল যাত্রা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে বেদুইন নেতা রশিদ ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ইবন সৌদের ক্ষমতা সম্পর্কে তথ্য আহরণের জন্য।

বিভিন্ন যাত্রায় গারট্রুড অনেক চিঠি লিখেছেন। বেশির ভাগ ছোট আকারের। কোনোটি বাবা স্যার হিউ বেলকে, কোনোটি বা বোন ফ্লোরেন্স বেলকে। হায়েল যাত্রাপথের কয়েকটি চিঠি :

আলেক্সান্দ্রিয়া, ২০ নভেম্বর, ১৯১৩ (ফ্লোরেন্সকে লেখা)

আলেক্সান্দ্রিয়া অনেক বড় জায়গা নয়, তবে এটা আমাকে প্রাচীন প্রাচ্যের অনুভব দিচ্ছে। গতকাল জাদুঘরে দেখতে গিয়েছিলাম।

দামাস্কাস, ২৭ নভেম্বর, ১৯১৩ (ফ্লোরেন্সকে লেখা)

গতকাল মুহাম্মদ আল বাসামের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি সকালের অনেকটা সময় আমার সঙ্গে কাটিয়েছেন। তিনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। বাসাম ভালো উট চেনেন এবং সস্তায় ব্যবস্থা করে দিতে পারছেন। অনেক বেদুইন দলকেও তিনি ভালো বোঝেন, যারা বংশপরম্পরায় যুদ্ধে লিপ্ত।

দামাস্কাস, ২৯ নভেম্বর, ১৯১৩ (স্যার হিউ বেলকে লেখা)

আমি আজ তোমাকে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি এই বলে যে ন্যাশনাল ব্যাংক যেন আমার নামে ৪০০ পাউন্ড এখানকার অটোমান ব্যাংককে দিয়ে দেয়। আমি সোজা ব্যাংককে টেলিগ্রাম করতে পারতাম; কিন্তু ভেবেছি, তারা দ্বিধায় পড়ে যাবে। যা হোক, আশা করি তুমি ব্যাপারটি ভালোভাবে সামলে নেবে। খুশির খবর হচ্ছে, মরুভূমি এখন শান্ত এবং আশা করছি, আমার হায়েল যেতে তেমন বেগ পেতে হবে না। উপরন্তু আজ আমি গাইড হিসেবে একজন সঠিক লোক খুঁজে পেয়েছি। এ যাত্রায় আমার ১৭টি উট লাগছে। বাশাম বলেছেন, আমার খাবার বাবদ খরচ হবে ৫০ পাউন্ড, জামাকাপড়ের জন্য লাগবে আরো কিছু। বাশাম বলেছেন, আমার নিজের কাছে ৮০ পাউন্ড রাখা ভালো। একটি বণিক দলকে দিতে হবে আরো ২০০ পাউন্ড। সব মিলিয়ে খরচ গিয়ে দাঁড়াবে ৬০০ পাউন্ড। আমি তোমাকে অনেক কিছু এখনই খুলে বলতে পারছি না। কিন্তু জানি যে তুমি আমাকে সাহায্য করবে, কারণ তুমি একজন দয়ালু বাবা।

দামাস্কাস, ৫ ডিসেম্বর, ১৯১৩ (ফ্লোরেন্সকে লেখা)

মনে হয় না ১২ তারিখের আগে আমি এখানকার তাঁবু গোটাতে পারব। অনেক কিছু কেনাকাটা বাকি। আজকের দিনটা ভালো কেটেছে, বিকেলে হাঁটতে গিয়েছিলাম। একটা পাহাড়ে চড়ার পর পুরো দামাস্কাস চলে এলো চোখের ওপর, দেখতে পেয়েছি এর বাগানগুলোও। টকদই খেয়ে চলেছি। এখানে এটাকেই পৃথিবীর সেরা খাবার বলে মনে হচ্ছে। জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, ক্রিসমাসের জন্য কেমন প্রস্তুতি নিচ্ছ। কোথাও কি বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবছ?

দামাস্কাস, ১২ ডিসেম্বর, ১৯১৩ (ফ্লোরেন্সকে লেখা)

আমার আজকেই তাঁবু গোটানোর কথা ছিল; কিন্তু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যায় আটকে গেলাম। ফাত্তুকে ম্যালেরিয়ায় ধরেছে। সম্ভবত আরো দু-চার দিন থাকতে হবে। স্থানীয় বাজারে খাবার খেতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল আমার বৃদ্ধ গাইড মোহামেদ আল মার্দউই। ওখানে একটি অদ্ভুত লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যে সোনা দিয়ে নকশা করা কাপড় পরেছিল। সে খুব ঠাণ্ডা ও নরম গলায় আরবদের সোনালি দিনের গল্প বলেছে। পরে আরো চুপিসারে মধ্য আরবের গুপ্তধনের তথ্য দিতে চেয়েছে। সবশেষে আমরা একসঙ্গে খাবার খেয়েছি।


মন্তব্য