kalerkantho


সিরাজুল অপহূত হওয়ার পরে...

যদি একটি ফোন আসে

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



সিরাজুল অপহূত হওয়ার পরে...

এক ছুটিতে বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে সিরাজুল (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)

সিরাজুলের চাচাতো ভাই আবদুল খালেক খান আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের পরিচালক। তিনি বলছিলেন, ১১-১২ দিন ধরে পরিবারটি আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না।

চাচা (সিরাজুলের বাবা) কারো সঙ্গেই কথা বলছেন না। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হাসিখুশি মানুষ তিনি। সমবয়সীদের সঙ্গে গল্প করতে ভালোবাসতেন। বাজার করতেও পছন্দ করতেন। মেয়ে বা ছেলের বউয়ের জন্য এটা-ওটা কিনে এনে চমকে দিতেন। এখন সারাক্ষণ বাড়িতেই থাকছেন। চাচির (সিরাজুলের মা) অবস্থাও ওই রকমই। ব্র্যাক অফিস বা গণমাধ্যমের কোনো কর্মী তাদের বাড়ি গেলে একটা কথাই বলছেন, ছেলেকে সুস্থ শরীরে তোমরা ফিরায়ে দাও।

সিরাজুলের স্ত্রী লতা খুবই চুপচাপ হয়ে পড়েছেন। খাওয়া-দাওয়াও করছেন না ঠিকমতো। রাতের পর রাত জেগে থাকেন স্বামীর একটা খবর পাওয়ার আশায়। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কোনো সময় হাতছাড়া করছেন না মোবাইল ফোনটাকে—যদি একটা ফোন আসে!

পাবনার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণদিয়াড় গ্রামের আলতাফ জোয়ারদারের মেয়ে লতা খাতুন। বয়স ২৬। পাবনা সরকারি মহিলা কলেজে পড়েন। ২০১৪ সালের ১১ এপ্রিল সিরাজুল ওরফে সুমনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁর স্বামী সিরাজুল ইসলাম আফগানিস্তানে কর্মরত আছেন। সেখান থেকে অপহূত হয়েছেন। কে বা কারা এবং কী উদ্দেশ্যে তাঁকে অপহরণ করেছে—জানা যায়নি পরিষ্কার।

দিনটি ১৭ মার্চ

সিরাজুলের কর্মস্থল  আফগানিস্তানের বাগলানে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এরিয়া অ্যাকাউন্ট্যান্ট তিনি। ১৭ মার্চ কুন্দুজ থেকে গাড়ি করে যাচ্ছিলেন বাগলান। পথে গাড়ি থামায় সশস্ত্র কয়েকজন। অপহূত হন সিরাজুল। তারপর থেকে লতা ও সিরাজুলের মা-বাবার সঙ্গী শুধু উত্কণ্ঠা। কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারছে না। দিন দিন উত্কণ্ঠা বাড়ছে কেবল।

লতার কথা

মা-বাবার পছন্দে সিরাজুলের সঙ্গে বিয়ে। বিয়ের আগে কোনো চেনাজানা ছিল না, ছিল না পরিচয়। বিয়ের সময় অল্প দিন তাকে (সিরাজুলকে) কাছে পেয়েছি। ছুটি না থাকায় ১৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টার বাসে সিরাজুল ঢাকায় চলে যায়। পরদিন সন্ধ্যার ফ্লাইটে সে রওনা হয় আফগানিস্তান। যাওয়ার পথে কতবার যে ফোনে কথা হয়েছে! ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টায় তার ফ্লাইট ছিল। প্লেনে যতক্ষণ নেটওয়ার্ক ছিল ততক্ষণই সে কথা বলেছে।

ওই দিনই রাত ২টার দিকে ফোন দিয়ে জানায়, সে দুবাই পৌঁছেছে। ভোরের দিকে সে আফগানিস্তানে পৌঁছে। সেদিনই কাজে যোগ দেয়। ছয় মাস পর আবার সিরাজুল দেশে আসে। সেবার দেশে ছিল ২৮ দিন। বিয়ের পর দুই বছরে মোট তিনবার দেশে আসে। প্রতিবারই গড়ে প্রায় এক মাস করে ছিল।

আরো কথা

সিরাজুল অনেক কেয়ারিং। তাকে আমি কখনো ফোন দিতাম না। সে-ই আমাকে ফোন দিত। আমাকে কখনোই তার ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। সময়ের আগেই সে ফোন দিয়ে দিত। সিরাজুলকে আমি ডাকনামে সুমন বলে ডাকতাম।

সব সময় পরিবারের আর আমার খোঁজখবর রাখত। কাজের ফাঁকে যখনই অবসর পেত ফোন করত। এমনও দিন গেছে ৩০ মিনিটের ভেতরে দুবার ফোন করেছে। সব সময় নামাজ পড়ার কথা বলত। শেষবার যাওয়ার সময় বলেছিল, কোরবানি ঈদের সময় আসব। আমার সঙ্গে তার কথা হতো ভিডিওকলে। হইচই আর আনন্দ ভালোবাসত সে। কাজের প্রতিও খুব মনোযোগী ছিল।

ভয় লাগে না তোমার?

পেপারে পড়েছি, আফগানিস্তানে তালেবান আছে। অনেক রকম সমস্যার খবর পাই পেপার থেকেই। তাকে প্রশ্ন করতাম, ভয় লাগে না তোমার? হেসে বলত, ‘আরে না, আমাদের কোনো টেনশন নেই। ওরা (জঙ্গিরা) আমাদের আশপাশেও আসেনি কোনো দিন। ’ এবারও যাওয়ার সময় বলেছিলাম, আফগানিস্তানে থাকার দরকার নেই। দেশে জয়েন করা যায় না? চিন্তা করে সিরাজুল বলেছিল, ‘এই যাচ্ছি, এরপর ফিরে আর আফগানিস্তানে যাব না। দেখি কী করা যায়। ’ অফিশিয়াল কাজে  মাঝেমধ্যেই ওকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। অডিট ও অন্য অফিসের হিসাব-নিকাশ দেখাটাই ছিল ওর কাজ। তবে কখনো কোথাও একা যেত না। বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশি কলিগরা থাকত। আফগান কলিগরাও থাকত অনেক সময়। সুমন আমাকে এগুলো বলেছে। আফগানদের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন আমাকে বলেছিল, ‘আফগানরা কখনো আমাদের কাজ নিয়ে বিরূপ মনোভাব দেখায় না। তার পরও খুব সতর্ক থাকি। ’ আমার খুব টেনশন হতো। সব সময় এই টেনশনটা কাজ করত। আমার এই টেনশন যে এমনভাবে সত্যি হবে, তা কল্পনায়ও ছিল না।

সেই দুঃসহ দিন

শেষবার সুমন দেশে আসেন ১৪ জানুয়ারি। এক মাস দেশে থেকে ১৪ জানুয়ারি আবার আফগানিস্তান চলে যান।   মার্চের ১৭ তারিখ বিকেল ৪টায় সুমনের সঙ্গে লতার শেষ কথা হয়। তাঁরা কথা বলেছিলেন ভিডিওকলে। ‘সুমন তখন একটা গাড়িতে বসা ছিলেন। বললেন, কুন্দুজ গিয়েছিলাম, বাগলান ফিরছি। কিছুক্ষণ কথা বলার পর জানায়, দীর্ঘক্ষণ বাংলায় কথা বলা সমস্যার কারণ হতে পারে। এখন রাখি। দুই ঘণ্টার মধ্যে আর কোনো কথা হবে না। সন্ধ্যায় অফিসে পৌঁছে ফোন দেব। এরপর দুই ঘণ্টা চলে যায়। তিন ঘণ্টাও যায়। টেনশনে পড়ে যাই। তাকে কখনো আমি ফোন দিতাম না। সে আমাকে কল করত সব সময়। আমি অস্থির হয়ে উঠি, তাকে কল দিই। তার ফোন বন্ধ পাই। বারবার চেষ্টা করে না পেয়ে তার অফিসের নম্বরে ফোন দিই।

সেখানে একজন, নামটা মনে করতে পারছি না, ফোন রিসিভ করে জানালেন, সুমনরা অফিসে ফেরেননি, ফোনেও পাচ্ছি না—সেই ভদ্রলোক জানালেন, হয়তো তাঁরা এখন যেখানে আছেন সেখানে নেটওয়ার্ক নেই, এ জন্য পাচ্ছেন না। তাঁরা অফিসে এলে ফোন দিতে বলব। টেনশন করবেন না। এরপর রাত ৯টার দিকে ব্র্যাক (আফগানিস্তান) অফিসের শহীদুজ্জামান নামের এক ভদ্রলোক ফোন করে জানান, কুন্দুজ থেকে বাগলান আসার পথে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সুমনসহ দুজন বাংলাদেশিকে অপহরণ করেছে।

পরের দিনগুলো

আজ (২৬ মার্চ) পর্যন্ত আমরা সুমনের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। ব্র্যাকের পাবনা অফিস, ঢাকা হেড অফিস এমনকি আফগানিস্তান অফিসের কেউও আমাদের সুমনের কোনো খোঁজ জানাতে পারেননি। এর মধ্যে শুক্রবার (২৫ মার্চ) বিকেলে ব্র্যাকের ঢাকা অফিসের সিনিয়র মিডিয়া ম্যানেজার মাহবুব উল আলম কবীর আর সিনিয়র ম্যানেজার মাইক্রোফিন্যান্স আখতার আলী আমাদের বাসায় দেখা করতে আসেন।

তাঁদের কাছে জানা গেল, বুধবার (২৩ মার্চ) অজ্ঞাতপরিচয় কোনো এক ফোন নম্বর থেকে কে বা কারা ব্র্যাক (আফগানিস্তান) অফিসে ফোন করে বলে, ‘তোমাদের দুজন লোক আমাদের হেফাজতে আছে। পরে তোমাদের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করা হবে। ’ এটুকু বলে তারা ফোনটা রেখে দেয়। কিন্তু ফোনের নম্বর না ওঠায় পরে আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। ঢাকা থেকে আসা ব্র্যাকের ওই দুই অফিসার এর বাইরে আর কোনো খবরই আমাদের দিতে পারেননি। যোগাযোগ করলে সবাই বলে, ‘ধৈর্য ধরেন, আল্লাহ আল্লাহ করেন, অপেক্ষা করেন, টেনশন করবেন না। ’

আমি, আমার পরিবার, আমরা সবাই আর কত ধৈর্য ধরব বলতে পারেন? ব্র্যাকের আফগানিস্তান অফিসের শহীদুজ্জামান নামের এক কর্মকর্তার কাছে প্রতিদিন সংবাদ জানার জন্য ফোন দিই। প্রতিদিনই তিনি আমাকে জানান যে সুমনসহ অপহূত দুই বাংলাদেশি অফিসারকে ফেরত পাওয়ার জন্য আমরা আফগান প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছি। অপহূতদের মুক্তির ব্যাপারে আমরা সবাই সাধ্যমতো চেষ্টা চালাচ্ছি।

একটা খবরের আশায়

গত ১০ দিন একই কথা শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত আর হতাশ হয়ে পড়েছি। আমাদের পরিবারের কারো চোখে ঘুম নেই বললেই চলে। প্রতিটি মুহূর্ত আমরা সুমনের ফিরে আসার প্রতীক্ষা করছি। একটা খবরের আশায় রাত জেগে বসে থাকছি। আমি আমার স্বামীকে সুস্থ ফিরে পেতে চাই। আপনারা একটু সাহায্য করুন।

  ছবি সৌজন্য: সিরাজুল ইসলামের পরিবার


মন্তব্য