kalerkantho


তারা আছে আগের মতোই

যে দেশে সেলফি নেই

রোমানিয়ার পাহাড়ি গ্রাম ব্রেব। বাপ-দাদারা যেমন থেকেছে, আজও তেমন থাকে ব্রেববাসী। ডেইলি মেইল তাদের নিয়ে একটি লেখা প্রকাশ করেছে—লাইফ ইন দ্য ল্যান্ড অব নো সেলফিজ। লিখেছেন মো. নাভিদ রিজোয়ান

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



যে দেশে সেলফি নেই

ব্রেব, মারামুরেস কাউন্টির একটি গ্রাম। ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্তঘেঁষা রোমানিয়ার এই গ্রামটিতে প্রায় এক শ পরিবারের বাস।

গ্রামে বাঁধানো রাস্তা একটিই। যেতে যেতে চোখে পড়ে পাহাড়ের সারি। হালকা ঘনজঙ্গল পাদদেশে। ব্রেবে শুমারি হয়নি ৮৫ বছর হয়। সে সময় মানুষ ছিল ১৫ শ-র কিছু বেশি। দিনের বেলায় বেশির ভাগ মানুষ ব্যস্ত থাকে খেত-খামারের কাজে, রাতে পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটায়।

পরিবারগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজেদের খাবার নিজেরাই উৎপাদন করে। প্রতিটি বাড়িতে আছে একটি করে সবজি বাগান।

নিজের খেতের কাজে অন্য মানুষ ভাড়া করে আনে না ব্রেবের লোকজন। এই এলাকার পাথুরে জমি আধুনিক চাষের যন্ত্র ব্যবহারের উপযোগী নয়। তাই পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়েই চাষবাস চলে। নারীরা ঘরে তৈরি ঝুড়ি নিয়ে খেতে যায়। ফিরে এসে খড়ের গাদায় গুছিয়ে রাখে। ব্রেবের নারীরা ছোটবেলা থেকেই পুরুষের সমান কাজে অভ্যস্ত—হোক তা ঘরে কিংবা বাইরে।

প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় এখনো বড়সড় পিপা দেখা যায়। এই পিপায় মৌসুমের বাড়তি আপেল জমা রাখা হয় পচানোর জন্য। এ থেকে তৈরি হয় রোমানিয়ার ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ডি ‘টুইকা’। টুইকা রোমানিয়ায় খুব জনপ্রিয়। এতে ২২ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত অ্যালকোহল থাকে। ব্রেবের লোকজন নিজেদের রুটি, মদ, পোশাক সবই নিজেরা তৈরি করে নেয়। বেশির ভাগ বাড়ি পাথর ও কাঠের তৈরি। কিছু টিনের ছাদওয়ালা আর সিমেন্টের তৈরি বাড়িও দেখা যায়। ঐতিহ্য ও দক্ষতা ধরে রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াকে দায়িত্ব বলে মনে করে ব্রেববাসী।

কাঠের দরজা ঠেলেই ঢুকতে হয় বাড়িগুলোতে। অনেক দরজায় ফুল, পাখি ধরনের নকশা দেখা যায়। বাড়িগুলোয় আছে বারান্দা আর বারান্দায় আছে ফুলের টব। বেশির ভাগ বাড়িতে কাঠের পেরেক ব্যবহার করা হয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপের বাড়িগুলো যেমন হতো তেমনই ব্রেবের বাড়িগুলো।

গাঁয়ের চার্চটির নাম চার্চ অব হোলি আর্ক-অ্যাঞ্জেলস। ১৫৩১ সালে তৈরি হয়েছিল। মেঝে ওক গাছের, দেয়ালে ব্যবহৃত হয়েছে স্প্রুস গাছের কাঠ। ব্রেবের মানুষ বিশ্বাস করে, স্প্রুস গাছ দুষ্ট আত্মাকে দূরে রাখে। তাই বাড়ির দরজায়ও ব্রেববাসী স্প্রুসের কাঠ লাগায়। এখানকার লোকজন গাছটিকে বলে, ‘জীবনবৃক্ষ’। চার্চটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ৮ নম্বরে আছে। প্রিন্স চার্লস এই চার্চে দুইবার এসেছিলেন। তিনি এখানে প্রার্থনা করতে পছন্দ করেন।

গাঁয়ের লোকজন হাঁটতেই বেশি পছন্দ করে। ভারী মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য ঘোড়ায় টানা গাড়ি আছে। পুরো গ্রামে শুধু দুটি দোকান। যেসব পণ্য তৈরি সহজ নয় বা সময়সাপেক্ষ সেগুলোই কেবল দোকানগুলোতে পাওয়া যায়। যেমন—ব্যাটারি বা জলপাইয়ের তেল। গরু, ছাগল, শুয়োর, মুরগি ইত্যাদি আছে সব পরিবারেই। মাচাংবাড়ির নিচে থাকে মোরগ-মুরগি বা শুয়োরের ঘর। পরিবারের দুধ বা আমিষের প্রয়োজন এগুলো দিয়েই মেটায় ব্রেববাসী। মিষ্টির মতো দুগ্ধজাত খাবার যে যার বাড়িতেই তৈরি করে। প্রায় সব বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও কাপড় ধোয়ার জন্য এখনো তারা হাত-পা ব্যবহার করে। ব্যবহার করে বাড়ির সঙ্গে থাকা কুয়ার পানি। প্রচণ্ড শীতের সময় তাদের উত্তাপ দেয় সিরামিকের তৈরি চুলোয় জ্বলা কাঠের আগুন।

রবিবার দিনটি সবাই ছুটি নেয়। সবাই সেরা পোশাক পরে ওই দিন। চার্চে প্রার্থনা শেষে সাদা ব্লাউজ, কালো স্কার্ট আর বাহারি ফুল ছাপের স্কার্ফ পরা মেয়েদের খুশিমনে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। ব্রেবের নতুন চার্চের পাশেই আছে কবরস্থান, ক্রসগুলো কাঠের বা টিনের তৈরি। ব্রেবের মানুষেরা আমুদে। বিয়ের মতো অনুষ্ঠানে তারা পুরনো দিনের গান বাজায়। রং-বেরঙের কাপড় পরে আর কাগজের ফুলে সাজানো ঘোড়ায় চড়ে। কাছের বড় শহর বাইয়া মারে থেকে রেলগাড়িতে করে ব্রেবে যাওয়া যায়। সাইকেলও ভাড়া নেয় অনেকে। ব্রেবে যাওয়ার ভালো সময় বসন্তকাল।


মন্তব্য