kalerkantho


আজকে আমরাও

বিজ্ঞানীর নাম মিজান

যশোরের শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামের ছেলে মিজান। বাবা আক্কাস আলীর মতোই ইঞ্জিনমিস্ত্রি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হয়ে ওঠেন মোটরসাইকেলের মিস্ত্রি। আরো পরে হয়ে যান উদ্ভাবক। উদ্ভাবন করেছেন স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র, জ্বালানিসাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব ‘মিজান গাড়ি’, জ্বালানিবিহীন সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্র, ডিজিটাল কাইচি।গল্পটি বলছেন ফখরে আলম

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



বিজ্ঞানীর নাম মিজান

আবিষ্কারের সনদ হাতে মিজান

শুরুর দিনগুলো

মিজানের বাবা ছিলেন ইঞ্জিনমিস্ত্রি। মিজানরা ছয় ভাই-বোন।

অনেক কষ্ট করে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পেরেছিলেন মিজান। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৮৩ সালে নাভারন বাজারে একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজ খুলে বসেন। বাজারে মুকাইল মিয়ার ছিল পুরনো লোহা-লক্কড়ের ব্যবসা। তাঁর কাছ থেকে অপ্রয়োজনীয় লোহা নিয়ে এসে কারিকুরি করতেন। এভাবে ১৯৯২ সালের দিকে একটি ডিজেল ইঞ্জিন আবিষ্কার করেন মিজান। এটি আবিষ্কারের পর থেকেই তাঁর মাথায় ভূত চাপে। লোহা-লক্কড়ের সঙ্গেই কাটে দিন-রাত।

স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র

আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রটি পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়। মিজান বললেন, ‘২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনে আগুন লেগে শতাধিক গার্মেন্টকর্মী মারা যান।

বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। আমি আগুন নেভানোর যন্ত্র আবিষ্কারে মন দিই। একটি ওয়াটার পাম্প, একটি অ্যালার্ম হর্ন, একটি সিগন্যাল লাইট আছে যন্ত্রটিতে। এটি গার্মেন্টের দেয়ালে লাগানো থাকবে। আগুন লাগার পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে এটি চালু হয়ে আগুন নিভিয়ে দেবে। ’

মিজান গাড়ি

গাড়িটি জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। দামও অনেক কম। এক লিটার পেট্রলে ৩৫-৪০ কিলোমিটার চলে। ধোঁয়া হয় না। চার চাকায় স্টিয়ারিং বলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কম। প্রতিবন্ধীরাও চালাতে পারবে। পাঁচ-ছয়জন যাত্রী ও সমপরিমাণ মালামাল নিয়ে গাড়িটি কাঁচা-পাকা রাস্তায় চলতে পারে। মিজান বলেন, ‘বিদেশ থেকে আমদানি করা ইজিবাইক আর সিএনজি অটোরিকশা দেখে ২০১৫ সালে আমাদের রাস্তায় চলাচলের উপযোগী এই গাড়ি তৈরি করি। গাড়িতে মোটরসাইকেলের ১০০ সিসি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত চারটি গাড়ি তৈরি করেছি। ঝিকরগাছার ইউসুফ নামের এক প্রতিবন্ধী আমার কাছ থেকে কিনে নিয়ে একটি গাড়ি চালাচ্ছেন। বেনাপোলের হাসান নামের এক ব্যক্তি একটি গাড়ি কিনে যাত্রী বহন করছেন। আর দুটি গাড়ি আমার কাছে আছে। গাড়ি তৈরিতে খরচ হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। ’

জ্বালানিবিহীন সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্র

একটি ব্যাটারি, একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার, একটি লোহার ফ্লাইহুইল ও একটি লোহার শ্যাফট দিয়ে মিজান এ বছর তৈরি করেছেন জ্বালানিবিহীন সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্র। কোনো ধরনের জ্বালানি (তেল ইত্যাদি) ছাড়াই যন্ত্রটি ৫ থেকে ১০ বিঘা জমিতে সেচ দিতে পারবে। একই যন্ত্রের সাহায্যে বাল্ব জ্বালানো যাবে। টিভি, ফ্রিজ, ফ্যান সবই চালানো যাবে। মিজান বললেন, ‘যন্ত্রটি তৈরি করতে আমার ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গরিব কৃষকদের কথা মাথায় রেখে যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছি। ’

ডিজিটাল কাইচি

মিজানের এক অভিনব আবিষ্কার ডিজিটাল কাইচি। বললেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুবই ব্যস্ত থাকেন। তাঁর পক্ষে সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রীর ব্যস্ততার কথা মাথায় রেখে আমি ডিজিটাল কাইচি উদ্ভাবন করেছি। প্রধানমন্ত্রী যেখানেই থাকুন না কেন, মোবাইলের মাধ্যমে ডিজিটাল কাইচি দিয়ে ফিতে কাটতে পারবেন। এখন আমার ডিজিটাল কাইচি দিয়ে প্রধান অতিথিরা ফিতে কাটছেন। এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে আড়াই হাজার টাকা। ’

মিজানের পুরস্কার

২০১৫ সালে যশোর বিজ্ঞান মেলায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের জন্য মিজান প্রথম পুরস্কার পান। খুলনার বিভাগীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায়ও তিনি এই যন্ত্র নিয়ে প্রথম হন। জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ২০১৬ সালে স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র আবিষ্কারের কারণে যশোরের ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলায় শ্রেষ্ঠ তরুণ উদ্ভাবকের পুরস্কার অর্জন করেন। মিজান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। গত বছর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। আবিষ্কারের প্রশংসা করেন। তাঁকে সব ধরনের সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছেন কর্মকর্তারা।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুস সাত্তার বললেন, ‘মিজানুর রহমানের আবিষ্কৃত সব যন্ত্রই আমি দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরাও দেখেছেন। আমরা তাঁকে উৎসাহ দিয়েছি। নতুন নতুন উদ্ভাবনের প্রশংসা করেছি। তাঁকে সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ’    

ছবি : ফিরোজ গাজী


মন্তব্য