kalerkantho

25th march banner

সাবাশ বাংলাদেশ
নিভৃত পল্লীতে

ভাস্কর্যে একাত্তর

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম কিসামতডাঙ্গী চওড়া বালাপাড়া। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য প্রদর্শনী করছেন নন্দলাল রায়। এখনো চলছে ভাস্কর্য তৈরির কাজ। ২৬ মার্চ উদ্বোধন হয়ে চলবে এক মাস। সেই খবর জানতে গিয়েছিলেন তোফাজ্জল হোসেন লুতু

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভাস্কর্যে একাত্তর

নন্দলাল রায়

উপজেলা সদর থেকে কিসামতডাঙ্গী চওড়া বালাপাড়া ১৫/১৬ কিলোমিটার। গ্রামের মধ্য দিয়ে চলে গেছে চওড়া সড়ক। সড়ক ঘেঁষে একটি বাড়ির উঠানের কিছু অংশ ও পাশের একটি নিচু জায়গা কাপড় ঘেরা। উঁকি দিতেই দেখা গেল অনেক ভাস্কর্য। কয়েকটি বানানো হয়ে গেছে, কিছু বানানো চলছে। এসব ভাস্কর্যের বিষয় মুক্তিযুদ্ধ। তৈরি করাচ্ছেন এই গ্রামেরই নন্দলাল রায় (৫২)। পুরোটাই নিজের উদ্যোগে। তিনি যে টাকাওয়ালা, এমনও নয়। দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার কবিরাজের তৈরি মহাশংকর তেল বিক্রি করেন নন্দলাল। হাটবাজারে ফেরি করেন। কখনো পাইকারি সরবরাহ দেন। এই আয়ে চলে পরিবার। একান্তই নিজের ভাবনা থেকে গ্রামে করছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য প্রদশর্নী’।

প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে ভাস্কর্য তৈরির কাজ দেখভাল করছিলেন নন্দবাবু। কী করতে হবে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। তাঁর পরিকল্পনায় ভাস্কর্যগুলো তৈরি করছেন সনাতনচন্দ্র পালের (৩৫) নেতৃত্বে শুভচন্দ্র রায়, নিতাইচন্দ্র পাল ও রতনচন্দ্র পাল। এঁদের কারো ভাস্কর্য তৈরির পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তবে কুমারের কাজ করেছেন আগে। দিন চুক্তিতে কাজ করছেন। সনাতন চন্দ্র বলেন, ‘শুধু মজুরির আশায় এখানে কাজ করছি না। নন্দলালদা একটা ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর সহযাত্রী হচ্ছি। ’ চার মাস ধরে চলছে এই কর্মযজ্ঞ। এঁটেল মাটি, বাঁশ, খড় ও সুতলি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে এসব ভাস্কর্য। ইতিমধ্যে শতাধিক ভাস্কর্য আকার পেয়ে গেছে। প্রদর্শনীতে থাকবে ১৬০টি ভাস্কর্য। বাকি ভাস্কর্য তৈরিতে দিনরাত কাজ করছেন চার শিল্পী। সব তৈরি হয়ে গেলে রোদে শুকানোর পর এগুলোতে পড়বে রংতুলির আঁচড়। ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের প্রতিকৃতি, মুক্তিযোদ্ধা, পাকসেনা, রাজাকার-আলবদর বাহিনীর সদস্য, পাকসেনাদের নৃশংসতা ও নির্যাতন, পাকসেনাদের আত্মসমর্পণের মুহূর্তসহ মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক বিষয়। পাশাপাশি স্থান পাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের চার যুগের দশ অবতার ভাস্কর্যও।

নন্দলাল রায় জানান, নতুন প্রজন্মকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানানো তাঁর আয়োজনের উদ্দেশ্য। এ প্রদর্শনীর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে। অর্থ আর জায়গার অভাবে হয়ে ওঠেনি। এবার অনেকটা সাহস করে কাজে নেমে পড়েছেন। শুরুতে চওড়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রদর্শনীর আয়োজনের কথা ভাবছিলেন। ছাত্রদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে বলে এই চিন্তা থেকে সরে আসেন। তা ছাড়া স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। এসব ভাবনা থেকে নিজের জায়গায় তা করবেন বলে মনস্থির করেন।

উঠানের একাংশে ও বাড়ির পাশের নিচু জায়গায় প্রদর্শনীর আয়োজন করছেন তিনি। সব প্রস্তুতি চলছে। নন্দলাল বলেন, নিচু জায়গায় এ আয়োজনে বাড়তি অর্থকড়ি খরচ হচ্ছে। শঙ্কায়ও আছেন। কারণ ভাস্কর্যগুলো এঁটেল মাটির তৈরি। সামান্য বৃষ্টি হলেই ভেস্তে যাবে আয়োজন। আয়োজনের জায়গাটিতে টিন বা ত্রিপলের ছাউনি দিতে পারলে ভালো হতো। এতে ব্যয় বাড়বে কয়েক গুণ, যা জোগানোর সার্মথ্য তাঁর নেই। ইতিমধ্যে নিজের জমানো প্রায় দুই লাখ টাকার মতো ব্যয় করেছেন। এখনো অনেক কাজ বাকি। পুরো কাজ শেষ করতে আরো দুই লাখ টাকা লাগবে বলে অনুমান করেন। জানান, এ কাজে অনেকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন, তবে এখনো কোনো কিছু পাননি।

তাঁর এলাকার বাসিন্দা সৈয়দপুর শহরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত রুকনুজ্জামান বলেন, ‘নন্দলালদার বাড়ির সামনে ও পাশে কয়েক মাস ধরে নানা ভাস্কর্য তৈরির কাজ চলছে। প্রথমে তাঁর বাড়িতে কাপড় দিয়ে ঘেরা দেখে ভেবেছিলাম, কোনো বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান। পরে জানতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য তৈরি হচ্ছে সেখানে। ভাস্কর্যগুলো দেখতে বিভিন্ন বয়সের মানুষ ভিড় করছে। নন্দলালদার এ কাজ এলাকায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ’ উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হক চৌধুরী জানান, নন্দলাল রায় মহান স্বাধীনতা দিবস সামনে রেখে একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। এ আয়োজন প্রমাণ করে স্বাধীনতার প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ও ভালোবাসা, দেশের ব্যাপারে তাঁর চেতনা।

২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করবেন—জানালেন রায়বাবু।

 


মন্তব্য